জাতীয়

স্যানিটেশন প্রকল্প: সোয়া ১১ লাখ টাকা মাসে পরামর্শক ব্যয়

হামিদ সরকার

ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি – দেশের ১০টি শহরকে সমন্বিত স্যানিটেশনের আওতায় নিয়ে আসছে সরকার। কারণ নগরে বসবাসকারীর মধ্যে প্রায় ৫৫ ভাগ জনগণ বস্তিতে বসবাস করছে। আর এই দশটি অগ্রাধিকার ভিত্তিক শহরে সমন্বিত স্যানিটেশন ও হাইজিন প্রকল্পে পরামর্শক খাতেই মাসে খরচ হবে সোয়া ১১ লাখ টাকা। স্যানিটেশন প্রকল্পের জন্য মাসে এত টাকা পরামর্শক খাতে খরচ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনসহ বিভিন্ন জনের প্রশ্ন। আর প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি কমিউনিটি ল্যাট্রিন বানাতে লাগবে ৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা। প্রকল্পের আওতায় রিকশাভ্যানের জন্য প্রতিটির খরচ ৫০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে বলে স্থানীয় সরকার বিভাগের দেয়া প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে। ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মামুন-আল-রশীদ বলেন, এখানে বাইরে থেকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হবে। আমাদের যে ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক করা হয়েছে সেটার আলোকে এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে এমন কিছু পরামর্শক লাগবেই।

স্থানীয় সরকার বিভাগের দেয়া প্রস্তাবনা একনেকে অনুমোদন পায়। সেই প্রকল্পের প্রেক্ষাপট থেকে জানা গেছে, গত ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ন হয়েছে। ২০১৯ সালের হিসেবে মোট জনসংখ্যায় প্রায় ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ নগরে বসবাসকারী। এর মধ্যে প্রায় ৫৫ ভাগ জনগণ বস্তিতে বসবাস করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য। স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা টেকসই করার ক্ষেত্রে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসডিজি লক্ষ্য ৬ দশমিক ২ অর্জন করার জন্য নিরাপদে পরিচালিত স্যানিটেশন সুবিধা এবং পরিষেবাগুলোর কার্যক্ষম নিশ্চিত করা অপরিহার্য, যা কেবল সম্পূর্ণ স্যানিটেশন পরিষেবার সঠিক পরিচালনার মাধ্যমেই সম্ভব। শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বিশেষত বস্তি এবং অনানুষ্ঠানিক জনবসতিগুলোতে বসবাসরত মহিলা ও শিশুরা অনিরাপদ পানীয় জল ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।

আর ওই প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক সমন্বিত স্যানিটেশন ও হাইজিন (সমন্বিত কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা) শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ৫৫৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৮৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) ঋণ সহায়তা থেকে ৪৭৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে। সমন্বিত স্যানিটেশনের আওতায় আসছে যে ১০টি শহর সেগুলো হলোÑ নরসিংদী, জামালপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, বাগেরহাট ও পটুয়াখালী।

প্রকল্পটি পাঁচ বছর বা ৬০ মাসের। প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে, ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক ২৩৪ জনমাস, ৬৬ জনমাস ব্যক্তি পরামর্শক, ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনা বৃদ্ধি, ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, ১০টি কঠিন বর্জ্য পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা স্থাপনা নির্মাণ, ১০টি মানববর্জ্য পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা স্থাপনা, ৭৭ হাজার ৭৭টি স্ল্যাজ কনটেনমেন্টন স্থাপন, ১৯টি ভস্মীকরণ যন্ত্র স্থাপন, ৩৮ একর ভূমি উন্নয়ন, ৩৭টি ট্রান্সফার স্টেশন, ৬৩টি কমিউনিটি ল্যাট্রিন, ৫১টি ডি সøাজিং ট্রাক, ২৮টি ড্রাম্প, ১১টি রোড সুইপিং ট্রাক, ১২টি ডিজেল জেনারেটর, ১৬টি এক্সাভেটর, বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম, ফার্নিচার ক্রয়, ৩৮৭টি হস্তচালিত ঠেলাগাড়ি, ৩৮৭টি রিকশাভ্যান, ২৫৮টি স্ট্রিট হাইড্রেন্ট এবং ২৫৮টি কমিউনিটি বিন করা হবে।

ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, পাঁচ বছরের এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ৬৬ জনমাস ব্যক্তি পরামর্শক নিয়োগ দেয়া হবে। তাতে খরচ হবে দুই কোটি ৫২ লাখ টাকা। প্রতি মাসে এখানে ব্যয় ৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা। আর ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক ২৩৪ জন মাসে ব্যয় হবে ১৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। প্রতি জন মাসে খরচ ৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। আউট সোর্সিংয়ের ছয়জনের বেতন এক কোটি ৩২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। জনপ্রতি খরচ ২২ লাখ ৮ হাজার টাকা। ৫১টি ডি সøাজিং ট্রাক কিনতে ২২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। প্রতিটির খরচ ৪৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা। ২৮টি ড্রাম্প ট্রাকের জন্য খরচ ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রতিটিতে খরচ ৪৫ লাখ টাকা। ৬৫ লাখ টাকা হিসেবে ১১টি রোড সুইপিং ট্রাক কিনতে ব্যয় সাত কোটি ১৫ লাখ টাকা। তিন কোটি টাকা প্রতিটি হিসেবে ১৯টি ভস্মীকরণ যন্ত্রে খরচ ৫৭ কোটি টাকা। ৫০ লাখ টাকা দরে ১৬টি খনন যন্ত্রের জন্য ব্যয় আট কোটি টাকা। ২০ হাজার টাকা করে ৩৮৭টি হস্তচালিত ঠেলাগাড়ির জন্য ব্যয় ৭৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। প্রতিটি ৫০ হাজার টাকা দরে ৩৮৭টি রিকশাভ্যানের জন্য এক কোটি ৯৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, সরকার নগর স্যানিটেশনকে বিশেষ করে ফেকাল সøাজ ম্যানেজমেন্টকে (এফএসএম) অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১৩ সালে এফএসএমর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো (আইআরএফ) অনুমোদন করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আইআরএফ-এফএসএম দ্রুত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য বিভিন্ন স্তরের স্টেকহোল্ডারদের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই নির্দেশনা মোতাবেক সিটিওয়াইড ইনক্লুসিভ স্যানিটেনে (সিডব্লিউআইএস) আওতায় মানববর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সার্বিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন, বাস্তবায়ন, অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণের সুবিধার্থে বিএমজিএফের আর্থিক সহায়তায় সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে (ডিপিএইচ) একটি এফএসএম সাপোর্ট সেল গঠন করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মামুন-আল-রশীদের সাথে গতকাল সন্ধ্যায় তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ১০টি অগ্রাধিকারভিত্তিক শহরে সমন্বিত স্যানিটেশন ও হাইজিন কার্যক্রম ব্যবস্থার উন্নয়নসহ স্যানিটেশন কভারেজ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। পরামর্শক খাতে ব্যয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, পিইসিতে অবশ্যই এ সব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা জাস্টিভাইট পেয়েছি বলেই দিয়েছি।

কমিউনিটি ল্যাট্রিনের খরচের ব্যাপারে তিনি বলেন, এখানে মহিলা ও পুরুষের আলাদা আলাদা টয়লেট থাকবে। পাশাপাশি অজুখানা ও নামাজেরও ব্যবস্থা থাকবে। আমরা ব্যয় পর্যালোচনা করে দেখেছি বাস্তবসম্মত।
৫০ হাজার টাকা প্রতিটি রিকশাভ্যানের ব্যাপারে তিনি বলেন, এটা আমার কাছেও বেশি লেগেছে। তবে ঢাকা সিটি করপোরেশনের একটি প্রকল্পে ৪০ হাজার টাকা লেড়েছে। আমাদের ভ্যান প্রচলিত ভ্যানের চেয়ে মজবুত হবে। তবে আমি বলেছি প্রকল্প চলমান থাকাকালে আমি খবর নেব কতটা মানসম্পন্ন।

সূত্র : নয়া দিগন্ত
এম এস, ১০ ফেব্রুয়ারি

Back to top button