জাতীয়

করোনাপ্রতিরোধী প্রতি টিকায় ব্যয় ৮০০ টাকা

রাশেদ রাব্বি

ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি – দেশের মানুষকে করোনাপ্রতিরোধী টিকা দিতে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে গত সোমবার জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, দেশে এ পর্যন্ত মোট কত টিকা এসেছে। একই সঙ্গে সরকার কী পরিমাণ টিকা সরাসরি কিনেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ভর্তুকি রয়েছে কিনা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, দেশে এ পর্যন্ত টিকা এসেছে ২৫ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩০৯ ডোজ। এর মধ্যে সরাসরি কেনা টিকার পরিমাণ ১০ কোটি ৭০ লাখ ডোজ। যার দাম পড়েছে প্রায় ৮ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভর্তুকিতে কেনা হয়েছে আরও ১০ কোটি ৪৭ লাখ ৩৩ হাজার ৬০০ ডোজ। এর আনুমানিক দামও প্রায় কাছাকাছি।

এ ছাড়া টিকা প্রদানের সিরিঞ্জ, সারাদেশে পরিবহনের জন্য বিশেষ ফ্রিজিং গাড়ি, সংরক্ষণাগার উন্নতকরণ, স্বেচ্ছাসেবকদের দুপুরের খাবার ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ দেশের মানুষদের করোনা থেকে সুরক্ষা দিতে সব খরচ ধরে প্রতি টিকায় সরকারের গড়ে ব্যয় হয়েছে ৮০০ টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভারত থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকার ৩ কোটি ডোজ কেনার চুক্তি হয়েছিল। যাতে প্রতি ডোজের দাম ধরা হয় ৬ ডলার করে। সেই হিসাবে এর মোট দাম পড়ে ১৮ কোটি ডলার বা ১৫৩০ কোটি টাকা। এ ছাড়া চীনের সিনোফার্ম থেকে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডোজ কেনার চুক্তি হয়। এই টিকার প্রতিডোজ কত টাকা করে কেনা হয়েছে, সে বিষয়টি সরকারিভাবে গোপন রাখা হয়েছে।

তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১০ ডলার করে প্রতি ডোজ সিনোফার্মের টিকা কেনার চুক্তি হয়। সেই হিসাবে এর দাম পড়েছে ৬৫৪৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইউনিসেফের সহযোগিতায় সিনোফার্মের ২ কোটি ৯৭ লাখ ২২ হাজার ৮০০ ডোজ এবং সিনোভ্যাকের ৭ কোটি ৫০ লাখ ১০ হাজার ৮০০ ডোজ টিকা কেনা হয়। জানা গেছে, ইউনিসেফের সঙ্গে চুক্তিতে যে টিকা কেনা হয় তাতে কস্ট শেয়ারিং করা হয়েছে। অর্থাৎ এসব টিকা কেনার ক্ষেত্রে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে ভর্র্তুকি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কেনা ও ভর্তুকি মূল্যে পাওয়া ছাড়াও কোভ্যাক্স সুবিধার আওতায় অনেক টিকা এসেছে। সেসব টিকা আনার ক্ষেত্রে বিমান ভাড়া, সেই দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারিংয়ের খরচ, এ ছাড়া সিরিঞ্জ, ডায়ালুট কিনতে হয়েছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে টিকা পাঠানোর জন্য বিশেষ ফ্রিজিং ভ্যান, সংরক্ষণাগার উন্নতকরণ ইত্যাদির জন্য পর্যাপ্ত টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। টিকা দেওয়ার জন্য রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া স্বেচ্ছসেবকদের দেওয়া হয়েছে নাশতা ও দুপুরের খাবার। সব মিলে টিকার পেছনে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এর আগে সংসদে দুই দফায় টিকা কিনতে সরকারের ব্যয় নিয়ে এমপিদের প্রশ্ন এলেও বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি সংসদকে জানিয়েছিলেন, নন ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে টিকা কেনার কারণে অর্থ খরচের হিসাব প্রকাশ করা সমীচীন হবে না। তবে সততা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে টিকা কেনা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যম থেকে দেশে করোনার মোট টিকা এসেছে ২৫ কোটি ৫ লাখ ৫১ হাজার ৩৯০ ডোজ। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯১০ ডোজ, ফাইজার ২ কোটি ৬১ লাখ ২৭ হাজার ২৭০ ডোজ, মর্ডানার ১ কোটি ৫৭ লাখ ৯২ হাজার ৪৬০ ডোজ, সিনোফার্মের ১১ কোটি ৪১ লাখ ৭৮ হাজার ডোজ, সিনোভ্যাকের ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ৪০০ ডোজ এবং জনসন অ্যান্ড জনসনের ৩৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫০ ডোজ টিকা এসেছে।

গত সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত ১০ কোটি মানুষের টিকা প্রথম ডোজ সম্পন্ন হয়েছে। পৌনে সাত কোটি মানুষ পেয়েছেন দুই ডোজ টিকা। বুস্টার ডোজ পেয়েছেন ২৬ লাখ মানুষ। আগামী ২২ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক টিকা পাবেন। সরকার এখন টিকা দেওয়ার মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা মোট সাড়ে ২৭ কোটি টিকা পেয়েছি। এখনো ১০ কোটি টিকা মজুদ আছে। সব দেওয়ার পরও অতিরিক্ত টিকা থেকে যাবে। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবাইকে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।

দেশের টিকা পরিস্থিতি নিয়ে গত ৭ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে দেখা গেছে, ভারতে সেরাম ইনস্টিটিউটের কোভিশিল্ড টিকার তিন কোটি ডোজ কেনার চুক্তি হয়। চীনের সিনোফার্ম ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে চুক্তি হয় ৭ কোটি ৭ লাখ ডোজ টিকা কেনার। প্রতিষ্ঠানটি থেকে আরও ২ কোটি ৯৭ লাখ ২২ হাজার ৮০০ টিকা কেনার চুক্তি হয় ইউনিসেফের মাধ্যমে। এ ছাড়া চীনের সিনোভ্যাকের সঙ্গে ৭ কোটি ৫০ লাখ ১০ হাজার ৮০০ ডোজ টিকা কেনার চুক্তি হয়। এই চুক্তিও হয় ইউনিসেফের সহযোগিতায়। সব মিলিয়ে ২১ কোটি ১৭ লাখ ৩৩ হাজার ৬০০ ডোজ টিকা কেনার চুক্তি হয়েছে।

অন্যদিকে উপহার হিসেবে ভারত থেকে ৩২ লাখ ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীনের পক্ষ থেকে ২১ লাখ ডোজ সিনোফার্ম এবং ১০ লাখ সিনোভ্যাক, বেলজিয়াম থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২ লাখ ৭০ হাজার ডোজ এবং মালদ্বীপ থেকে আরও দুই লাখ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা এসেছে। এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভ্যাক্স সহযোগিতার মাধ্যমে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার ৬২০ ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার, ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ২০০ ডোজ সিনোফার্ম, ৭৩ লাখ ৮১ হাজার ৬০০ ডোজ মর্ডানা, ২ কোটি ৩২ লাখ ৪৬ হাজার ১০০ ডোজ ফাইজারের টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রæতি ছিল। সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার ৫২০ ডোজ টিকার প্রতিশ্রæতি আছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান কোভ্যাক্সের মাধ্যমে এই টিকাগুলো দিচ্ছে।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ১০ ফেব্রুয়ারি

Back to top button