দক্ষিণ এশিয়া

ভারতে বিধানসভা ভোট, সবার নজর উত্তর প্রদেশে

লক্ষ্ণৌ, ০৯ ফেব্রুয়ারি – ভারতের উত্তর প্রদেশে ১০ ফেব্রুয়ারি সাত ধাপের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। সবার নজর এই নির্বাচনের দিকে। উত্তর প্রদেশের এ নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেছেন বিবিসি-র গীতা পাণ্ডে।

উত্তর প্রদেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আগামী দিনগুলোতে ভারতের পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এর মধ্যে সবার নজর এখন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা ভোটযুদ্ধের দিকে। উত্তর প্রদেশ সাধারণভাবে নামের আদ্যক্ষর ‘ইউপি’ দিয়ে পরিচিত। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য এটি। জনসংখ্যা ২৪ কোটি। উত্তর প্রদেশ একটি দেশ হলে তা জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ হত এবং পাকিস্তান ও ব্রাজিলের চেয়ে বড় হত। ভারতের পার্লামেন্টে সর্বাধিক সংখ্যক এমপি আসেন উত্তর প্রদেশ থেকে, এ সংখ্যা ৮০। এ কারণে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, যে দল উত্তর প্রদেশে জয়ী হয়, তারাই দেশ শাসন করে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুসহ ভারতের বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী উত্তর প্রদেশ রাজ্য থেকেই এসেছেন।

ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমাঞ্চলীয় গুজরাট রাজ্যের মানুষ হলেও তিনি যখন ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রথম প্রার্থী হয়েছিলেন, তখন উত্তর প্রদেশের বারাণসী আসনকেই বেছে নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও মোদী এ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের গত দুটি সাধারণ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল জয়লাভের কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন উত্তর প্রদেশের ভোটাররাই। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটি এ রাজ্যে ৭১টি আসন পেয়েছিল। আর ২০১৯ সালের নির্বাচনে পেয়েছিল ৬২টি আসন।

ভোটের ময়দানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা?

১৯৯০ এর দশকের শেষ দিক থেকে রাজ্যের রাজনীতিতে আঞ্চলিক সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) আধিপত্য দেখা গেছে। দল দুটি পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। আর কোণঠাসা হয়ে পড়েছে কংগ্রেস ও বিজেপি। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদীর জনপ্রিয়তা ও ক্যারিশমার বদৌলতে ২০১৭ সালে রাজ্যের ৪০৩ আসনের বিধানসভায় দলটি ৩১২ আসন পায় এবং প্রায় ৪০ শতাংশ পপুলার ভোট পেয়ে জয়লাভ করে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজেপি বেছে নেয় যোগী আদিত্যনাথকে। হিন্দু সন্ন্যাসী থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া আদিত্যনাথ তার বিভক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত। বিজেপি’র এই কট্টর রাজনীতিবিদ আবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আশা করছেন। আদিত্যনাথকে সাহায্য করতে খোদ নরেন্দ্র মোদী বারবার উত্তর প্রদেশে ছুটে গেছেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ কয়েকবার রাজ্যটি সফরে গিয়ে আয়োজিত সভা-সমাবেশে ভাষণ দিয়ে বিজেপিকে আরেকবার সুযোগ দেওয়ার জন্য তিনি ভোটারদেরকে আহ্বান জানিয়েছেন।

যদিও গত বছর বিতর্কিত কৃষি আইনের জেরে রাজ্যে বিজেপি তার আগের অবস্থান হারিয়েছে। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষক বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেই আইন বাতিল করতে বাধ্যও হয়েছে। তাছাড়া, গতবছর করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় উত্তর প্রদেশ সরকারের ভূমিকা ছিল হতাশাজনক। কোভিডে মারা যাওয়া শত শত মানুষের লাশ রাজ্যের গঙ্গা নদীতে ভেসে উঠতে দেখা গেছে। তারপরও মহামারী চলার সময়ে বিনা মূল্যে রেশন দেওয়ায় রাজ্য সরকার প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব এবং বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে রাজ্যে অসন্তোষ আছে। নির্বাচনী সমাবেশে আদিত্যনাথ (৪৯) দাবি করেছেন, তিনি রাজ্যে অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করেছেন।

আবার হিন্দু ভোট জিততে মুসলিমবিরোধী বক্তব্যও রেখেছেন আদিত্যনাথ। উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে আদিত্যনাথের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে, ৪৮ বছর বয়সী অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন সমাজবাদী পার্টি। অখিলেশ রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। ২০১৭ সালে বিজেপি’র কাছে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি।

এবার বিজেপি’র কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে অখিলেশ কঠোর পরিশ্রম করছেন। তিনি ক্ষমতায় গেলে রাজ্যের ঘরে ঘরে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া, গরিব নারীদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা, কৃষকদের বিনাসুদে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কয়েকটি ছোট আঞ্চলিক দলের সঙ্গে জোট বাঁধার পর আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে অখিলেশের জয়ের সম্ভাবনা বেড়েছে। ওদিকে, দলিত নেত্রী মায়াবতীর নেতৃত্বে বিএসপিও ক্ষমতায় ফিরতে চাইছে, কিন্তু অনেকেই তার পক্ষে বাজি ধরতে রাজি নন। মায়াবতী রাজ্যের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ২০১২ সালে তিনি ক্ষমতা হারান। মায়াবতী তার সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়, কিন্তু ক্ষমতায় থাকাকালে নিজের এবং অন্যান্য দলিত আইকনের মূর্তি নির্মাণের জন্য লাখ লাখ ডলার ব্যয় করে সমালোচিত হয়েছিলেন তিনি। প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় মায়াবতী স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তার এবারের নির্বাচনী প্রচারণাও খুব একটা জমেনি। উত্তর প্রদেশে ভোটের মাঠে রয়েছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসসহ আরও বেশ কয়েকটি ছোট দল। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্ব এবং উদ্যমী প্রচারে কংগ্রেস রাজ্যে মানুষের দৃষ্টি কাড়তে পেরেছে।

উত্তর প্রদেশে ধর্ষণ এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার নারীদের পরিবারের কাছে ছুটে গেছেন প্রিয়াঙ্কা। নির্বাচনী প্রচারে নারী ভোটারদের গুরুত্ব দিয়ে খবরের শিরোনাম হয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। কিন্তু নির্বাচন উপলক্ষে প্রিয়াঙ্কার ব্যক্তিগত তৎপরতা অনেক বেশি থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কংগ্রেসের প্রতি সমর্থনের অভাব দেখা গেছে।

ঝুঁকির বিষয়গুলো কি?

আকার ও সংখ্যার কারণে উত্তর প্রদেশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী যুদ্ধক্ষেত্র। আর ভোটের ময়দানে থাকা দলগুলোর জন্য এই নির্বাচনকে ‘জীবন-মরণের’ লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৮৯ সাল থেকে রাজ্যে কোনও দলই পরপর দুই মেয়াদে জয়লাভ করেনি। তাই বিজেপি এবং আদিত্যনাথ এই ধারা ভাঙতে সচেষ্ট থাকবেন। তাছাড়া, এই নির্বাচনের ফলকে আদিত্যনাথের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ‘গণভোট’ হিসেবেও দেখা হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর জন্যও এ নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে তার জন্য একটি পরীক্ষা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। আর বিজেপি উত্তর প্রদেশে হেরে গেলে সেটি কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা দল এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীর জনপ্রিয়তা কমার লক্ষণ হিসেবেই দেখা হবে। ওদিকে, নির্বাচনে অখিলেশের জন্য জয় পাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ক্ষমতার বাইরে আরেক মেয়াদ থাকলে নেতা হিসেবে দলে তার অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। আর তিনি নির্বাচনে হারলে ছোট আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তার তৈরি করা জোটের অবসান ঘটতে পারে।

মায়াবতীর জন্যও জয় অপরিহার্য। তিনি রাজনীতিতে গত ১০ বছর নেতৃত্বের জায়গাটিতে ছিলেন না। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিনি এবারও হেরে গেলে হয়ত আর কখনোই ফিরে আসতে পারবেন না। অন্যদিকে, কংগ্রেস এবার আসলে জয়ের জন্য লড়ছে না বলেই অভিমত বিশ্লেষকদের। কংগ্রেস আশা করছে, প্রিয়াঙ্কার কঠোর পরিশ্রম দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার মতো করে দলকে প্রস্তুত করে তুলবে।

ভোট ও ভোটার:

রাজ্য বিধানসভার ৪০৩ আসন দখলের জন্য হাজারো প্রতিযোগী নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫১টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন ১৫ কোটির বেশি ভোটার। সাত ধাপে এক মাসের বেশি সময় ধরে ভোট হবে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর হাজারো সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।

কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও উত্তর প্রদেশ ভারতের স্বল্পোন্নত রাজ্যগুলোর অন্যতম হয়ে আছে। দেশটির সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গরিব মানুষ এ রাজ্যে বাস করে। সম্প্রতি প্রকাশিত দারিদ্র্যের একটি সূচক অনুযায়ী, রাজ্যের জনসংখ্যার ৩৭ দশমিক ৭৯ শতাংশই গরিব। ৪৪ শতাংশের বেশি মানুষ পুষ্টিবঞ্চিত। লাখো মানুষের বাড়িতে টয়লেট নেই। নির্বাচনে মানুষের নিজেদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর একমাত্র উপায় হল ভোট। নির্বাচনের সময় ভোটাররা দল বেঁধে তাদের এই অধিকার প্রয়োগ করতে আসেন। কিন্তু প্রায়শই তারা ক্ষমতায় যারা থাকে তাদের বিরুদ্ধেই রায় দেন।

ভোট গ্রহণের তারিখ:

*১০ ফেব্রুয়ারি: ৫৮ আসনে নির্বাচন

*১৪ ফেব্রুয়ারি: ৫৫ আসনে নির্বাচন

*২০ ফেব্রুয়ারি: ৫৯ আসনে নির্বাচন

*২৩ ফেব্রুয়ারি: ৫৯ আসনে নির্বাচন

*২৭ ফেব্রুয়ারি: ৬১ আসনে নির্বাচন

*৩ মার্চ: ৫৭ আসনে নির্বাচন

*৭ মার্চ: ৫৪ আসনে নির্বাচন

উত্তর প্রদেশ রাজ্যে ভোট গণনা হবে ১০ মার্চ।

সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর
এন এইচ, ০৯ ফেব্রুয়ারি

Back to top button