জাতীয়

এখনও অজানা ভুয়া নবাবের আসল পরিচয়

ঢাকা, ০২ নভেম্বর- তার ফেসবুক আইডি ‘নওয়াব আলী হাসান আসকারি’ নামে। পরিচিতি হিসেবে তার ব্যাপারে লেখা রয়েছে- ‘মুঘল প্রিন্স আওরঙ্গজেব’, ‘পাবলিক ফিগার ইউনাইটেড ন্যাশন্স অ্যান্ড স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’। বসবাসের ঠিকানা আমস্টারডাম, নেদারল্যান্ডস।

গতকাল রোববার পর্যন্ত ১৪ হাজারের বেশি মানুষ ফেসবুকে তার ‘বন্ধুর’ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। নিজের ফেসবুক আইডির নিচে নবাব আসকারির একটি উক্তিও আছে। তা হলো- ‘পাহাড় পর্বত আকাশ কেন লক্ষ্যের সীমা হবে? আকাশের ওপারেও নিশ্চয়ই কিছু আছে, আমার লক্ষ্য সেটাই।’ মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু থেকে দেশের অনেক গুণীজন আর প্রভাবশালী ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসংখ্য ছবি আসকারির ফেসবুকে রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই পরিচিতি বহন করে আসা আসকারি আসলে একজন মহাপ্রতারক। রিজেন্টের মোহাম্মদ সাহেদের মতোই আসকারির প্রতারণারও নতুন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে। তবে নবাব সলিমুল্লাহর নাতি পরিচয়ধারী এই প্রতারকের প্রকৃত নাম-ঠিকানা এখনও জানতে পারেনি পুলিশ।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে আসকারি শুধু স্বীকার করছেন- তিনি একজন বিহারি। পুরান ঢাকায় তার জন্ম। নবাব পরিবারের সদস্য না হয়েও নবাব পরিচয় দিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। নবাবি এস্টেটের সম্পদ দখল করতে ভুল তথ্য দিয়ে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টও তৈরি করেছেন তিনি। সম্পত্তির মোতাওয়াল্লি হওয়ার জন্য এরই মধ্যে পাঁচটি ‘মিস কেস’ (অন্যের জমি অবৈধভাবে দখলের জন্য মামলা) করেছেন আসকারি।

গত বুধবার রাজধানীর মিরপুর থেকে আসকারিকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ইকোনমিক ক্রাইম ও হিউম্যান ট্রাফিক টিম। গ্রেপ্তার করা হয় তার পাঁচ সহযোগীকেও। এরপর তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

বিষয়টি তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, নবাব আলী হাসান আসকারি নামে প্রথমে জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়েছেন এই ভুয়া নবাব। পরে একই নামে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরি করেন। পাসপোর্ট ও এনআইডিতে আসকারি তার স্থায়ী ঠিকানা দেখান- ‘আহসান মঞ্জিল’। এনআইডিতে অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে লেখা রয়েছে- ১০৭ এ, ৭ নম্বর সেক্টর উত্তরা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আসকারি দাবি করেছেন, ২০০৭ সালে উত্তরার ওই ঠিকানায় তার বাবা আমানুল্লাহ আসকারি মারা যান। যদিও এর স্বপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ দেখাতে পারেননি তিনি।

দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, এই ভুয়া নবাব তার স্ত্রীর নাম-পরিচয়ও বদলে দিয়েছেন। ২০০৮ সালে চুয়াডাঙ্গার মেরিনা আক্তার নামে এক নারীকে বিয়ে করেন তিনি। তবে ২০১৭ সালে তিনি নাম বদলে সাহেদা হেনা আসকারি হিসেবে জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়েছেন। এ ছাড়া এএসসি ও এইচএসসির সনদেও মেরিনা তার নাম পাল্টে ফেলেন। বোর্ডের কাছে আবেদন করে নতুনভাবে সকল সনদ সংগ্রহ করেছিলেন মেরিনা।

জানা গেছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কীভাবে বোর্ড পরিবর্তিত নামে মেরিনাকে সনদ দিয়েছে, সে বিষয়টি জানতে পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষা বোর্ডে চিঠি দেওয়া হবে। এ ছাড়া কীভাবে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে আসল নবাব পরিচয়ে আলী হাসান আসকারি এনআইডি, পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন পেলেন সে ব্যাপারেও একাধিক সংস্থা অনুসন্ধান শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া মোটা অঙ্কের লেনদেনের ভেতর দিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন ভুয়া নবাব।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৯ সালে নবাবি এস্টেট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। তাতে বলা হয়, কামরুল হাসান হৃদয় নামে এক প্রতারক ভুয়া ও জাল নথিপত্র দিয়ে নবাবের অনেক সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। পুলিশের ধারণা, তাদের হাতে গ্রেপ্তার আলী হাসান আসকারি প্রতারক কামরুল হাসান হৃদয় হতে পারেন। যদিও পুলিশি রিমান্ডে আসকারি দাবি করেন, তিনি কামরুল হাসান নন।

তবে পুলিশ বলছে, আসকারিকে যে পাঁচ সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে তিনজন আপন ভাই রয়েছে। তারা হলেন- রাশেদ ওরফে রহমত আলী ওরফে রাজা, মো. আহাম্মদ আলী ও বরকত আলী ওরফে রানা। তিন সহোদর দাবি করছেন, কামরুল হাসান হৃদয় নামে তাদের এক ভাই ছিল; যিনি সৌদি আরবে মারা গেছেন। তবে সৌদি আরবে কবে কীভাবে মারা গেছেন, সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন না তারা। পুলিশের ধারণা, গ্রেপ্তার রাজা, আলী ও রানার বড় ভাই ভুয়া নবাব আলী হাসান আসকারি। তিনিই কামরুল হাসান হৃদয়।

পুলিশ জানায়, আসকারির চোখ ছিল ঢাকার নবাবি সম্পত্তির ওপর। শাহবাগের একটি অংশের মোতাওয়াল্লি হওয়ার জন্য ভূমি অফিসে দুটি মিস কেস করেন তিনি। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জেও নবাব এস্টেটের সম্পদ হাতিয়ে নিতে তিনটি মিস কেস করেন। এরই মধ্যে তার প্রতারণার অনেক কাহিনি বেরিয়ে আসছে। সিলেটের বাসিন্দা মো. সাকিবকে বোকা বানিয়ে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন আসকারি। প্রভাবশালীদের ব্যবহার করে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ওই টাকা নিয়েছেন তিনি। তবে কোনো তদবির ছাড়াই ১০৮ কোটি টাকার ওই কাজটি পেয়েছিলেন সাকিব। তবে সাকিব বিশ্বাস করেছিলেন, ‘নবাবের’ তদবিরেই কাজটি পেয়েছিলেন তিনি।

গত ২২ মে আসকারি ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। আহসান মঞ্জিলের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি লেখেন- ‘আহসান মঞ্জিল নবাববাড়ি ঢাকা। নবাব সাহেব বলেছিলেন, এদেশের মানুষগুলো অনেক সাদা মনের, এদেশের জনগণকে দিয়ে কোনো দিন নবাব পরিবারের ক্ষতি হবে না। এদেশের মানুষ তাদের জীবনের চেয়েও বেশি নবাব পরিবারকে ভালোবাসে। এই আহসান মঞ্জিল নবাববাড়িতে লুকিয়ে আছে (আমার) মা, বাবা- দাদা, দাদিসহ সকলের ভালোবাসা ও স্বপ্নের কথা, এখানে এলেই সকলের কথা মনে পড়ে, মন খারাপ হয়ে যায়। আমার নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক, আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।’ ২৫ এপ্রিল আরেকটি ছবিসহ পোস্টে লেখেন, ‘আমেরিকা থেকে আব্বুর পাঠানো এন-৯৫,মাস্ক আজ আইইডিসিআর,বির কাছে প্রদান করলাম।’

১৬ অক্টোবর আরেকটি পোস্টে আসকারি লেখেন, ‘সিলেটে রায়হান হত্যার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। সেইসঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক। ফাঁসির দাবি করছি। সিলেটে শাহজালাল (র.) দরগাহ মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে পুলিশ হেফাজতে মৃত রায়হানের বাসায় যাই। যে শিশুটির কান্নায় সারাদেশ কেঁদেছে সেই বাবুকে কোলে নিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাইনি। শিশুটি জানে না সে পিতৃহারা হয়ে গেছে। সিলেটে আমার সঙ্গে ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর বন্ধু আজাদ ও কাউন্সিলর কামরান ভাই, সিলেট প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহ্‌ দিদার আলম ও ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা রিপন মাহমুদ।’ মূলত তাদের বোকা বানিয়েছেন এই ভুয়া নবাব।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের ইকোনমিক ক্রাইম ও হিউম্যান ট্রাফিক টিমের এডিসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভুয়া নবাবের আসল পরিচয় পাওয়া এখন চ্যালেঞ্জ। তার প্রতারণার নতুন নতুন কাহিনি বেরিয়ে আসছে। আসলে সে ঢাকার নবাবি এস্টেটের সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারা করছিল।’

সূত্রঃ সমকাল
আডি/ ০২ নভেম্বর

Back to top button