জাতীয়

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি যুদ্ধ আ’লীগ-স্বতন্ত্রে

হামিদ সরকার

ঢাকা, ০২ ফেব্রুয়ারি – চলমান স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ-ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরই লড়াই হচ্ছে। বিজয়ের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে হয়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের। আর পঞ্চম ধাপে এগিয়ে ছিল স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মোট ছয়টি ধাপের নির্বাচনে প্রায় তিন হাজার ৭৭০টির মধ্যে নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান পেয়েছে দুই হাজার তিনটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছে এক হাজার ৬৫৬ জন। আর সদ্য সমাপ্ত ষষ্ঠ ধাপে বিজয়ী চেয়ারম্যানদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে ১১৭ জন এবং বিভিন্ন প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী ৯৫ জন বলে নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য থেকে জানা গেছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউপি নির্বাচনে কাউকে দলীয় প্রতীক না দিয়ে নির্বাচন সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হলে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রার্থী বিজয়ী হবেন। মূলত এখন স্বতন্ত্রের নামে বিদ্রোহীদের সাথেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের লড়াইটা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখা জানায়, সোমবার সারা দেশে ২১৮ ইউপিতে ভোট হওয়ার কথা থাকলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় ২১৬টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ হয়। ষষ্ঠ ধাপে আওয়ামী লীগের ১১৭টি, স্বতন্ত্র প্রার্থী ৯৫টি, জাতীয় পার্টি তিনটি (জাপা) ও জাতীয় পার্টি (জেপি) একটি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছে। মূলত স্বতন্ত্রের নামে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ইসি-সংশ্লিষ্টরা জানান, চলমান ইউপি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে। প্রথম চার ধাপে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও, পঞ্চম ধাপে জয়ে এগিয়ে ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ষষ্ঠ ধাপে আবারো এগিয়ে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করা চেয়ারম্যান প্রার্থীরা।

গত ২১ জুন অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২০৪টি ইউপির মধ্যে ১৪৮টি ইউপিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জয় পান। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পান ৪৯ জন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জয় পেয়েছে এক ইউপিতে, জাতীয় পার্টি (জেপি) ও জাতীয় পার্টি (জাপা) তিনটি করে ইউপিতে জয় পায়। গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ৮৩৪টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছেন ৪৮৬টিতে। আর ৩৩০টিতে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ১০টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা চারটি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয় পান। জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (জেপি), খেলাফত মজলিস ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) একটি করে ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছে।

আর তৃতীয় ধাপে গত ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছেন ৫২৫টিতে। অপর দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছেন ৪৪৬টিতে। এ ছাড়া জাতীয় পার্টি ১৭টি, একটি করে ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) মনোনীত প্রার্থীরা। ২৬ ডিসেম্বর চতুর্থ ধাপে দেশের ৮৩৬টি ইউপিতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ৭৯৬টি ইউপির ফলাফলের তথ্য জানায় ইসি। এতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত ৩৯৬ জন প্রার্থী জয় পান। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী জয় পেয়েছেন ৩৯০ ইউপিতে। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন দুই, জাকের পার্টি এক, জাতীয় পার্টি (জাপা) ছয় এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (জেপি) একজন জয় পান।

আর গত ৫ জানুয়ারি দেশের ৭০৭টি ইউপিতে পঞ্চম ধাপে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ৬৯২টি ইউপিতে বিজয়ীদের মধ্যে স্বতন্ত্র ৩৪৬ জন, আওয়ামী লীগ মনোনীত ৩৩১ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ দুইজন, জাতীয় পার্টি দুইজন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থী রয়েছেন। এখন পর্যন্ত ছয়টি ধাপের ইউপি ভোট সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি সপ্তম ধাপে ১৩৮টি ও ১০ ফেব্রুয়ারি আট ইউপিতে ভোট গ্রহণ করবে ইসি।

মাঠপর্যায়ের ভোটাররা বলছেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের এই বিধি চালু হওয়ার কারণেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিদ্রোহী প্রার্থিতা বেড়েছে। স্বতন্ত্রের নামেই তারা এই নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করছেন। আর এই দলীয় প্রতীকে নির্বাচন দেয়ার কারণেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের এসব উৎসবমুখর পরিবেশের নির্বাচন এখন সহিংস ও সঙ্ঘাতপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউপি নির্বাচনে কাউকে দলীয় প্রতীক না দিয়ে নির্বাচন সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হলে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রার্থী বিজয়ী হবেন। আর তখন প্রশাসনের লোকেরাও সব প্রার্থীর দিকে সমান নজর রাখবেন; কিন্তু এখন যেই প্রার্থী সরকারি দলের প্রতীক পান তার প্রতি প্রশাসনের সুনজর থাকে; এর ফলে এই প্রার্থী অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেন। আর এই প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই সঙ্ঘাত-সহিংসতা বৃদ্ধি পায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, একসময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের এই ইউপি নির্বাচন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষপাতের বাইরে। এখন দলভিত্তিক নির্বাচনের কারণে সঙ্ঘাত-সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়েছে। যেকোনো উপায়ে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন নিতে অসৎ প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক অবক্ষয়ও ঘটছে। তিনি বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ফায়দা হাসিলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন। আবার সরকারি দলের প্রতীকবঞ্চিত নেতারাও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে পেশিশক্তি দেখান। যার অনিবার্য ফল সহিংসতা। তিনি বলেন, আবার স্থানীয় পর্যায়ে এসব নির্বাচনে যে উৎসব-উদ্দীপনা ছিল সেটিও হারিয়ে গেছে।

সূত্র : নয়া দিগন্ত
এন এইচ, ০২ ফেব্রুয়ারি

Back to top button