অপরাধ

আলিশা মার্টের প্রতারণা: গ্রাহকের ৭০০ কোটি টাকার কী হবে

সাজ্জাদ মাহমুদ খান

ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি – ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিশা মার্টের টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে গত ১৬ নভেম্বর থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফেসবুক লাইভ করছেন চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম শিকদার। যদিও গত ৭০ দিনে অন্তত ৪০ বার আশ্বাস দিয়েও কোনো গ্রাহককেই তিনি টাকা দেননি বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। ডিসকাউন্টের প্রলোভনে ফেলে সাত হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া প্রায় ৭০০ কোটি টাকা এখনো রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাছে। তবে বারবার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারায় এখন আর প্রতিষ্ঠানটির আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না কেউ। উল্টো উত্তেজিত গ্রাহকরা গত বৃহস্পতিবার মঞ্জুর আলম শিকদারকে বনানীর অফিসে আটকে রাখলে পুলিশ গিয়ে রাতে তাকে উদ্ধার করে। ধারদেনা আর জীবনের সব সঞ্চয় বিক্রি করে বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত না পেয়ে আলিশা মার্টের অনেক গ্রাহকই এখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ঢাকা ছেড়ে যেতেও বাধ্য হয়েছেন কেউ কেউ। বিনিয়োগ করা টাকা কবে পাবেন, আদৌ পাবেন কিনা তা নিয়ে এখনো ঘোর অন্ধকারে আছেন প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগকারীরা।

আলিশা মার্টের গ্রাহকদের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে ৭ হাজার গ্রাহকের ৭০০ কোটি টাকা পাওনা আছে। গত দুমাসের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের মালিক টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে আসছেন। কিন্তু কাউকেই টাকা দেননি। এমন না যে, তাদের টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। ইচ্ছা করেই তারা ফেরত দিচ্ছে না। ইভ্যালিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মালিক গ্রেপ্তার হওয়ায় গ্রাহকরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না, তাই বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা কোনো মামলা করছেন না। কিন্তু দেওয়ালে তো পিঠ ঠেকে গেছে। আর কতদিন সহ্য করব? আগামী সপ্তাহে ঢাকার বাইরের গ্রাহকদেরও আসার জন্য বলা হবে। তার পর একযোগে আন্দোলনে নামব।’

তৌহিদ আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বৃহস্পতিবার দুপুরে চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন। তিনি কোনো টাকা-পয়সা কাউকে দেননি। বিকালে চলে যেতে চাইলে গ্রাহকরা আটকায়। এর পর চেয়ারম্যানের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা গ্রাহকদের ওপর হামলা করে। বেদম মারধরে তিনজন গুরুতর আহতও হন। পরে রাত ৯টার দিকে পুলিশ এসে অফিস থেকে চেয়ারম্যানকে নিয়ে যায়।’

ই-কমার্সের পাশাপাশি তিন হাজার প্রতিষ্ঠান থেকে ডিসকাউন্টের নামে আলিশা কার্ড বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আলিশা হোল্ডিংস লিমিটেড। প্রতিটির জন্য এককালীন ৭ হাজার ৯৮০ টাকা করে নেওয়া সেই কার্ড এখন কাজ করছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও কার্ডটিকে অবৈধ বলে চিঠি দিয়েছে। ফলে যারা আলিশা কার্ড কিনেছিলেন বিপাকে পড়েছেন তারা। টাকাও ফেরত পাচ্ছেন না।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিশা মার্টের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং, গ্রাহক প্রতারণা ও অফারের কার্ড বিক্রির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কিছু প্রতারণার অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তারা আলিশা কার্ডের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আলিশা কার্ড বিক্রির বৈধতার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও আলোচনা হয়। পরে তারা (আলিশা মার্ট) কার্ড বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে।’

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, প্রায় তিন হাজার প্রতিষ্ঠান থেকে মূল্য ছাড়ের কার্ড বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে আলিশা মার্ট। প্রতিটি কার্ডের জন্য তারা এককালীন ৭ হাজার ৯৮০ টাকা করে নিয়েছে। এ টাকা আর ফেরত পাবেন না গ্রাহক। কারণ কার্ডটি ব্যবহার করে এক বছরে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে মূল্য ছাড়ে পণ্য কিনতে পারবেন বলে বলা হয়েছিল। তারা কত কোটি টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়েছে এবং টাকাগুলো কোথায় গেছে সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

আলিশা কার্ডের একজন ক্রেতা জানান, আলিশা কার্ড হোল্ডাররা দেশজুড়ে ৯০টি ক্যাটাগরি এবং তিন হাজারের বেশি পার্টনারের কাছ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত আকর্ষণীয় মূল ছাড় পাবেন বলে বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে তিনি কার্ড কেনেন। এককালীন দিতে হয়েছে ৭ হাজার ৯৮০ টাকা। কার্ডের বিনিময়ে কোনো পণ্য পাবেন না। এক বছর কেবল ডিসকাউন্টের জন্য কার্ডটি ব্যবহার করতে পারতেন। তবে যেভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল তার কোনো সেবাই পাননি তিনি। আকাশ আলম নামে এক শিক্ষার্থী বললেন, ‘ধার আর টিউশনির টাকা আলিশা মার্টে বিনিয়োগ করেছিলাম, যাতে কিছু লাভ পেলে চাকরি ফরম কেনাসহ হাত খরচের টাকাটা উঠে আসে। এখন সব হারিয়েছি। ধারের টাকা দিতে পারছি না। টাকা না থাকা মেসের ভাড়াও দিতে পারছি না। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি। টাকা না পেলে এখন ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

আলিশা মার্টে প্রায় দুই লাখ বিনিয়োগ করেছেন আয়মানুর রহমান নামে এক তরুণ। ধারদেনা করে টাকা দেওয়ার পরও দীর্ঘ ছয় মাস ধরে কোনো টাকা কিংবা মালামাল ফেরত পাননি। আয়মানুর রহমান জানান, তাকে ডিসেম্বরের শুরুতে টাকা ফেরতের এসএমএস দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো কোনো এসএমএস পাননি। স্বজনদের কাছ থেকে টাকা এনে বিনিয়োগ করায় তারা টাকা চাইতে বাসায় আসে। বাবা-মা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। মাসখানেক আগে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। আয়মানুর বললেন, ‘টাকা না পেলে এখন আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার।’

গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে আলিশা মার্টের চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম শিকদারের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়ায় যায়। প্রতিষ্ঠানের পাবলিক রিলেশন কর্মকর্তা তানজিরুলের নম্বরে ফোন দিলে তিনিও রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশ্য না করা শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আলিশা মার্টের কাছে গ্রাহকদের পাওনা ৪০০ কোটি টাকার কাছাকাছি।’ তবে গ্রাহকদের সেই টাকা কবে এবং কীভাবে দেওয়া হবে সে ব্যাপারে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গত ১ ডিসেম্বর আলিশা মার্ট তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি তখন জানায়, তাদের কার্যালয়ে কতিপয় লোক এসে কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তোলেন এবং বলপ্রয়োগের চেষ্টা করেন। এ কারণে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। বন্ধ হওয়ার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে আলিশা মার্ট উল্লেখ করেছিল, প্রতিষ্ঠানটির অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। এ ছাড়া তারা প্রতি মাসে আট লাখ ক্রয়াদেশ পেয়ে থাকে।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ২৯ জানুয়ারি

Back to top button