জাতীয়

শুভাঢ্যা খাল: হাতিরঝিলের আদলে সাজাতে ১৩শ কোটি টাকার প্রকল্প

এম. আশিক নূর

ঢাকা, ২২ জানুয়ারি – ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শুভাঢ্যা খাল। ময়লা-আবর্জনায় দূষণ আর কতিপয় লোকের দখলে প্রায় বিলীন হতে চলেছে এটি। এক সময় খালটি দিয়ে চলাচল করত ছোট-বড় নৌযান। আর এর স্বচ্ছ পানি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করত দুপাড়ের মানুষ। এখন আর সেই অবস্থায় নেই খালটি। পুনরায় উদ্ধার করে খালটির ঐতিহ্য ও গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছেন স্থানীয় সাংসদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। খালটিকে হাতিরঝিলের আদলে রূপ দিতে প্রায় ১৩শ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। এর আগে একাধিকবার খালটি দখলমুক্ত এবং ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হলেও স্থানীয়রা এখন নিয়মিত বর্জ্য-আবর্জনা ফেলছেন। আর দুষ্ট চক্রের দখলের কবলে মৃতপ্রায় শুভাঢ্যা খাল। সচেতন মহল মনে করেন, প্রথমে এলাকার ময়লা ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু সমাধান প্রয়োজন, তা না হলে নতুন করে খালটিকে রক্ষায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বাধা হয়ে দাঁড়াবে এসব ময়লা-আবর্জনা।

খালের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা শুভাঢ্যার কৈবর্ত্যপাড়া এলাকার পঞ্চায়েত কমিটির সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউনুছ সর্দার জানান, ময়লা সংগ্রহকারীরা স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রতিমাসে নির্ধারিত ফি নিলেও নিয়মিত ময়লা নিতে আসে না। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে গৃহস্থালি ময়লা-আবর্জনা খালে ফেলছে মানুষ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু সমাধান ছাড়া খালটি সংস্কার করলেও তা আবার ভরাট হয়ে যাবে। কেরানীগঞ্জ উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ২৫ কিলোমিটার

দৈর্ঘ্য ও ৪০ ফুট প্রস্থের খালটি রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদী থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। দখলের কবলে পড়ে খালটির প্রস্থ এখন কোথাও কোথাও ১০ ফুটে পরিণত হয়েছে। কালীগঞ্জ জোড়া ব্রিজ থেকে কৈবর্ত্যপাড়া পর্যন্ত খালের জায়গা দখল করে অনেকেই বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন।

আগানগর ও শুভাঢ্যা খালপাড়ের একাধিক বাসিন্দা জানান, শুভাঢ্যা খালের নামে কয়েক বছর পর পর বরাদ্দ এনে লোক দেখানো কিছু কাজ করা হয়। বর্ষা মৌসুমে যখন খালে পানি থাকে, তখন খাল উদ্ধারে বিভিন্ন মহল এগিয়ে আসে। অথচ শুকনো মৌসুমে খালের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।

খালটির প্রবেশমুখ আগানগর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায়। সেখানে দেশের সর্ববৃহৎ তৈরি পোশাকপল্লী। কয়েক হাজার দোকান, কারখানার ঝুট ও আবর্জনা প্রতিনিয়ত খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে খালের মুখটি ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। বর্ষা মৌসুমে বুড়িগঙ্গায় ভরা পানি থাকলেও তা খালে প্রবেশ করতে পারে না। খালটির কিছু জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি মার্কেটের অংশ। এ ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালীরা আগানগর, আমবাগিচা বেগুনবাড়ী ও গোলামবাজার এলাকায় খালের তীর ঘেঁষে অবৈধভাবে টং ও পাকা দোকান বসিয়ে ভাড়া দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

কালীগঞ্জ এলাকার ফজলু নামের এক কাপড় ব্যবসায়ী জানান, ইতিপূর্বে কয়েকবার সংস্কার করা হলেও গার্মেন্টসের ঝুট ও ময়লা-আবর্জনায় পুনরায় খালটির মুখ ভরাট হয়ে যায়। এতে বুড়িগঙ্গার পানি খালে প্রবেশ করতে পারে না। তাই প্রথমে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের ঝুট ও ময়লা আর্বজনা ফেলা বন্ধ না করলে সংস্কার কোনো কাজে আসবে না।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুসলিম ঢালী বলেন, পোশাকপল্লীর ব্যবসায়ীদের অনেকবার সতর্ক করা হলেও তারা অনেকটা চুরি করে রাতের আঁধারে খালে ময়লা ফেলে। জানতে পেরেছি সরকার পুনরায় খালটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এবার সংস্কার করা হলে আর যাতে পোশাকপল্লীর কেউ ময়লা-আবর্জনা না ফেলতে পারে, সে বিষয়ে সমিতির পক্ষ থেকে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খালটির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় এমপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সবাইকে সচেতন করেছেন। তবে এতে তেমন কাজ হয়নি। তবু এলাকার মানুষের কথা ও আগামীর জন্য আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন উন্নত এক কেরানীগঞ্জ গড়ার লক্ষ্যে নতুন করে খালটি সংস্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর স্বপ্ন- শুভাঢ্যা খালকে হাতিরঝিলের মতো করে দৃষ্টিনন্দন করা; খালের পানি ব্যবহারযোগ্য করা ও খালের দুপাড়কে বিনোদনের উপযোগী করা।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, কেরানীগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মধ্যে অন্যতম এই শুভাঢ্যা খাল। কারণ এটি বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তার যাত্রা শুরু করে কেরানীগঞ্জের একটি বড় বাণিজ্যিক এলাকা ও একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার পর অবশেষে ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে মিশেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ উপজেলাধীন শুভাঢ্যা থেকে আগানগর পর্যন্ত ‘শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন ও তীর সংরক্ষণমূলক কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকরণ প্রকল্প’ নামক একটি প্রকল্পসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ক্রমাগত জবরদখল, অপব্যবহার এবং কঠিন ও তরল বর্জ্য নিক্ষেপে সম্পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে খালটিকে পুনঃখননের জন্য পুনরায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আরেকটি (শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন এবং খালের উভয় পাড়ের উন্নয়ন ও সুরক্ষা) প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

প্রকল্পে অন্তুর্ভুক্ত রয়েছে- অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে শুভাঢ্যা খাল ও খালের পাড়ের সুরক্ষাকরণ; খাল খনন এবং উন্নয়ন ও সংরক্ষণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ; খালের অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় চালু; স্থানীয় জনগণের জন্য খালের পাড়ে বিনোদনমূলক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিকরণ; খালের পাড়ে হাঁটার রাস্তা ও শহীদ স্মৃতি অঙ্গন নির্মাণ; পাবলিক টয়লেট ও বসার আসন; রাস্তার আলোকসজ্জা ও ড্রেনেজ পাইপলাইন; ওয়াচ টাওয়ার, ভূ-নৈসর্গিক কাজ ও ডাস্টবিন স্থাপনসহ অন্যান্য উন্নয়ন।

এ ব্যাপারে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, খালটি দিয়ে এক সময়ে বুড়িগঙ্গা থেকে কেরানীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী পর্যন্ত যাতায়াত করা যেত। এই খালের সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। যুদ্ধের সময় এই খাল দিয়ে নৌকায় চড়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে আসতেন। স্থানীয় মানুষের নিয়মিত যাতায়াত ছিল খালটি দিয়ে। খালটির আদিরূপ ঠিক রেখে আগের গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হাতিরঝিলের আদলে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রায় তেরোশ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। খালের দুপাড়ের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুনরায় নদীতে পূর্বের ন্যায় নৌযান চলাচলের উপযোগীকরণের কাজ শিগগির শুরু হবে। এ ছাড়া শুভাঢ্যা খাল ছাড়া কেরানীগঞ্জের এরকম অন্য খালগুলোকেও সংস্কার করা হবে বলে জানান তিনি।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ২২ জানুয়ারি

Back to top button