আইন-আদালত

৬ বছরেও বেসিকের মামলার তদন্ত শেষ করতে দুদক ‘ব্যর্থ’: হাইকোর্ট

ঢাকা, ২১ জানুয়ারি – আলোচিত বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর করা একটি মামলার তদন্তকাজ দীর্ঘ ছয় বছরেও শেষ করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ‘ব্যর্থ হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

ওই মামলার আসামি বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার তৎকালীন ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর জামিন বিষয়ে দেওয়া রায়ে এ মন্তব্য করেন আদালত।

গত বছরের ১৪ মার্চ ওই রায় দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। সম্প্রতি রায়টি প্রকাশ করা হয়েছে।

নথিপত্র ও আইনি দিক পর্যালোচনা করে আদালত বলেছেন, বলতে দ্বিধা নেই যে, কমিশন ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে মামলার তদন্ত পরিচালনা করছে। এ কারণে বিগত ছয় বছরেও মামলার তদন্তকাজ সমাপ্ত করতে পারেনি, অর্থাৎ তদন্ত কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় অন্তত ৫৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে এটিও একটি।

গত মার্চের রায়ের দিন আদালতে আসামিপক্ষের শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও আইনজীবী মো.সগির হোসেন। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

রায়ের অনুলিপি হাতে পেয়েছেন জানিয়ে আইনজীবী সগীর হোসেন বলেন, বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। অপর চারটিতে জামিন আবেদনে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২০১৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পল্টন থানার করা মামলার মোট আসামি ৬ জন। বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখা থেকে বেআইনিভাবে ৪৮ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ আনা হয় মামলায়। আসামি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী শান্তিনগর শাখার প্রধান ছিলেন।

প্রায় ১১ মাস আগের ওই রায়ে উচ্চ আদালত বলেন, এটা বাস্তবতা যে, এই মামলায় ২০১৫ সালে এজাহার হলেও অদ্যাবধি অর্থাৎ প্রায় ছয় বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও কমিশন মামলার তদন্তকাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

কমিশনের হলফনামায় বলা হয়, কমিশন ‘ফলো দ্যা মানি’ অর্থাৎ টাকার গতিপথ শনাক্ত করতে পারেনি বলে তদন্তকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কমিশন মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) এর নির্দেশনা অনুসরণ করছে বলে দাবি করছে। আত্মসাৎ করা টাকার গতিপথ শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত কমিশনের পক্ষে মামলার তদন্তকাজ সমাপ্ত করা সম্ভব নয়।

রায়ে আদালত বলেন, আদালত ক্ষোভ, হতাশা ও দুঃখের সাথে বলতে বাধ্য হচ্ছে যে, কমিশনের এহেন বক্তব্য আদালতের কাছে বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে।

আদালত বলেন, সরকারি কর্মচারী অথবা ব্যাংকার হিসেবে আসামিদের দ্বারা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং অপরাধমূলক অসদাচরণ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটিই এ মামলার তদন্তের মূল বিষয়বস্তু হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে আদালতের সুচিন্তিত অভিমত হলো- উপরোক্ত অপরাধ প্রমাণে আত্মসাৎ করা অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা আদৌ কোনো অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক শর্ত হতে পারে না। আর এ মামলাটি অর্থপাচারের অধীনে নয় যে, অর্থের গতিপথ নির্ধারণ অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক।

দণ্ডবিধির ৪০৫ অনুযায়ী অভিযুক্তরা তাদের কাছে জিম্মাকৃত কিংবা কর্তৃত্ব বা অধীনে থাকা সম্পত্তির/অর্থের ক্ষেত্রে বিশ্বাসভঙ্গ হয়েছে কি না, এটাই মুখ্য বিবেচ্য বিষয়।

তদন্তকাজে কমিশন ভুল পথ অনুসরণ করছে উল্লেক করে দুদকের দায়িত্ব সম্পর্কে হাইকোর্ট ওই রায়ে বলেন, কমিশনের দায়িত্ব দুর্নীতি চিহ্নিত করা এবং অপরাধীদের আইন ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। আত্মসাৎ করা সম্পদ বা অর্থ উদ্ধার কমিশনের মুখ্য কাজ নয়।

রায়ে আরও বলা হয়, বর্তমান মামলার তদন্তকাজ দীর্ঘ দিনেও সমাপ্ত না হওয়ার কারণে এরইমধ্যে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অনেক আসামি হাইকোর্ট বিভাগ থেকে জামিন পেয়েছেন, যেখানে আপিল বিভাগ কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। অবস্থা বিবেচনায় বর্তমান আসামিকে (মোহাম্মদ আলী চৌধুরী) জামিন দেওয়া সমীচীন মনে করা হচ্ছে। তাকে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগে বারণ করা হলো।

আসামি অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের সুবিধা অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আদালত আইনের নির্ধারিত নিয়মে জামিন বাতিল করতে পারবেন বলেও রায়ে উল্লেখ করেন আদালত।

সূত্র : জাগো নিউজ
এন এইচ, ২১ জানুয়ারি

Back to top button

This will close in 20 seconds