জানা-অজানা

বহুল ব্যবহৃত পাঁচ আবিস্কারের অজানা তথ্য

একটা সময় ছিলো যখন আমাদের প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগের জন্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। জীবনধারনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি তৎক্ষণাত পাওয়া যেত না। কিন্তু সেসবই এখন শুধুই অতীত। মুহুর্তেই প্রিয়জনের সাথে দেখা করা,কথা বলা, ঘরে বসেই পুরো পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখতে চাইলেই সম্ভব। তবে এসব সম্ভব হলো কি করে?

চলুন জেনে নেয়া যাক তেমনই কিছু আবিস্কার সম্পর্কে-

বেতার:

তার বিহীন যোগাযোগের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে বেতার। বেতার হচ্ছে তরঙ্গ ব্যবহার করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয় বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা রেডিও টেলিস্কোপ। ঊনবিংশ শতাব্দির শেষপ্রান্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী বেতার আবিষ্কার করলেও বেতারের আবিষ্কারক হিসাবে ধরা হয় গুলিয়েলমো মার্কোনিকে। ২৫ এপ্রিল ১৮৭৪ ইতালির বোলগনায় জন্মগ্রহন করেন তিনি। ইতালির এফআরএসএ মার্কুইস এর প্রথম সদস্য, উদ্ভাবক এবং একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারও ছিলেন এই আবিস্কারক। পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন মার্কনি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং ১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্যে দ্য ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফ অ্যান্ড সিগন্যাল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা যা পরবর্তী সময়ে মার্কনি কোম্পানি হয়ে উঠেছিল।

তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য প্রেরণ বা গ্রহণ করা হয়। পূর্বে শুধু রেডিওতে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে বেতার প্রযুক্তির ব্যবহার চলছে সর্বত্র। রেডিও (বেতার), টেলিভিশন (দূরদর্শন), মোবাইল ফোন, ইত্যাদিসহ তারবিহীন যেকোনো যোগাযোগের মূলনীতিই হল বেতার। এই মার্কোনিকে রেডিওর আবিষ্কারক হিসাবে কৃতিত্ব দেওয়া, এবং বেতার টেলিগ্রাফির উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কার্ল ফার্ডিনান্ড ব্রাউনের সাথে ১৯০৯ সালে যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ইতালির রোম শহরে ২০ জুলাই ১৯৩৭ তিনি মারা যান।

টেলিভিশন:

ব্রিটিশবিজ্ঞানী জন বেয়ার্ড। পূর্ণ নাম জন লগি বেয়ার্ড, জন্ম ১৩ আগস্ট ১৮৮৮। ১৯২৬ সালে বিশ্বে প্রথম টেলিভিশন আবিষ্কার করেন তিনি। সাদা কালো ছবি দূরে বৈদ্যুতিক সম্প্রচারেও পাঠাতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে টেলিভিশন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চালু হয় ১৯৪০ সালে। জন বেয়ার্ড একজন স্কটল্যান্ডের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বিশ্বের প্রথম কার্যক্ষম ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল টেলিভিশন আবিস্কারের জন্যে তিনি বিশ্ব বিখ্যাত। ১৪ জুন ১৯৪৬ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে স্কটল্যাণ্ডের হেলেন্স্‌বারায় জন বেয়ার্ড এর একটি প্রতিকৃতি রয়েছে।

টেলিফোন:

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এবং উদ্ভাবক। ৩ মার্চ ১৮৪৭ মার্চ স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বব্যাপী টেলিফোনের অন্যতম আবিস্কারক হিসেবে সবথেকে বেশি পরিচিত তিনি। ১৮৭৬ সালে তাকেই টেলিফোনের প্রথম মার্কিন পেটেন্টের সম্মানে ভূষিত করা হয়। টেলিফোন আবিস্কারের পূর্বে দীর্ঘদিন তিনি শ্রবণ ও কথন সংশ্লিষ্ট গবেষণায় নিযুক্ত ছিলেন। ২ আগস্ট ১৯২২ সালে ৭৫ বছর বয়সে কানাডার নোভা স্কটিয়ায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর আমেরিকার সকল টেলিফোনে এক মিনিটের জন্য অবিরাম রিং বাজানো হয়। কারণ হিসেবে মার্কিন প্রশাসনের জানায় যে মহান ব্যক্তি মানুষে-মানুষে যোগাযোগের এ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন তাকে উপযুক্ত সম্মান দেখানোর জন্যই এমন আয়োজন করা হয়। পরবর্তী জীবনে বেল আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন যার মধ্যে রয়েছে উড়ো নৌকা এবং বিমানচালনবিদ্যা। ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বেল।

মজার একটি বিষয় হলো তার সবথেকে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন যে টেলিফোন, সেটাই ছিলো তার কাছে উটকো ঝামেলা হিসেবে দেখতেন। আর এ কারনে তিনি তার নিজের গবেষণা ও অধ্যয়ন কক্ষে কোন টেলিফোন রাখতেন না। তাকে বোবাদের পিতা তথা দ্য ফাদার অফ দ্য ডিফ নামে ডাকা হতো। তার বাবা, দাদা এবং ভাই সবাই একক অভিনয় ও বক্তৃতার কাজে জড়িত ছিলেন এবং তার মা ও স্ত্রী উভয়েই ছিলেন বোবা। এ কারণেই বোবাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তিনি অনেক গবেষণা করেছেন।

উড়োজাহাজ:

রাইট ব্রাদার্স নামে পরিচিত দুই ভাই উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইট। রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের বড় ভাই অরভিল রাইট ১৮৭১ সালের ১৯ আগস্ট এবং উইলবার রাইট ১৮৬৭ সালের ১৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৯৯ সালে তারা দুজনে মিলে একটি উড়োজাহাজের মডেল তৈরি করতে সক্ষম হন। পেশায় দুজনেই ছিলেন মার্কিন প্রকৌশলী। এবং প্রথম উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন তারাই। তারা প্রথম নিয়ন্ত্রিত, শক্তিসম্পন্ন এবং বাতাসের চেয়ে ভারী সুস্থ মানুষ-বহনযোগ্য উড়োজাহাজ তৈরি করেন ১৯০৩ সালের ১৭ ডিসেম্বরে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোয়াইট ডি. আইজেন ১৯৫৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ১৭ ডিসেম্বর দিনটিকে রাইট ব্রাদার্স দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। আমেরিকানরা বেশ আয়োজন করেই এই দিনটি পালন করেন।

উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইটের বাবা তাদের একদিন একটি খেলনা হেলিকপ্টার উপহার দিয়েছিলেন। সেটির নকশা করেছিলেন হেলিকপ্টার উদ্ভাবক ফ্রান্সের আলফোন্স পে। সেটি দেখে দুই ভাই নতুন একটি হেলিকপ্টার তৈরি করে। এ জন্য দুই ভাই সংগ্রহ করেন স্যার জর্জ কেইলি, চানিউট, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং ল্যাংলির এরোনেটিক সংক্রান্ত গবেষণার তথ্যাদি। ১৮৯৬ এবং ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিমান তৈরির ওপর যত প্রকাশনা রয়েছে সেগুলো তারা সংগ্রহ করে মনোযোগ দিয়ে পড়েন। তখনকার সময়ে অনেকেই উড়োজাহাজ তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কেউই পরিপূর্ণ সফলতা পাননি। সেকারনেই রাইট ভাতৃদ্বয় শুরু করেন ক্লান্তিহীন গবেষণা। এরপর ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে উইলবার পাঁচ ফুট উচ্চতার একটি বাক্স ঘুড়িতে পাখা বেঁধে ওড়ার চেষ্টা করেন। পরের বছরই তারা গ্লাইডার তৈরি করেন। এটিকে ওড়ানোর জন্য আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকে নিয়ে আসা হয়। উড্ডয়নটি মাত্র ১২ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র নয় তারা। এরপর ১৯০১ এবং ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে পরপর দুটি পরীক্ষা করেন।

তৃতীয়বারের মতো তারা নিজেদের উদ্ভাবিত যন্ত্র ব্যবহার করে কিছুটা সাফল্য পান। প্রায় ১০০০ বার এটি ওড়ানো হয়। এর নাম দেন ‘Flyer-1’. এরপর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন Flyer-111। এটিতে তারা ১০৫ বার উড্ডয়ন করেন। এ ঘটনা পৃথিবীর সব গণমাধ্যম বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। ব্যস্ততার কারণে তারা দুজনই বিয়ে করেননি। ১৯১২-এর ৩০ মে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে উইলবার এবং ১৯৮৮-এর ৩০ জানুয়ারি ছোট ভাই অরভিল মারা যান।

মোবাইল ফোন:

এটি এমন একটি ডিভাইস যার মাধ্যমে দু’জন একে অপরের মধ্যে বিশাল দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও কথা বলতে পারে। যদি কোনও ব্যক্তি বিশ্বের এক কোণে বসে থাকে এবং অন্য একজন ব্যক্তিও বিশ্বের অন্য কোনায় বসে থাকে তবে ফোনের মাধ্যমে সে একে অপরের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারে। মার্টিন কুপার তাঁর নামে মোবাইল ফোনের পেটেন্ট বা মেধাস্বত্ত্ব করান, ফলে আবিষ্কারক হিসেবে তাঁর নাম ব্যবহৃত হয়। যার ওজন ছিল ২ কিলোগ্রাম বা ৪.৪ পাউন্ড। ফোনটি একবার চার্জ দেওয়ার পরে ৩০ মিনিটের জন্য সংগ্রহ করা যেতো। এই ফোনটি চার্জ করতে ১০ ঘন্টা সময় লাগত। বিশ্বে এই প্রথম ফোনের দাম ছিল ২৭০০ মার্কিন ডলার, অর্থাত বাংলাদেশী টাকায় যা দ্বারায় প্রায় ২লাখ টাকা।

১৯৭৩ সালে এটি আবিস্কার করেন মার্টিন কুপার। তিনি ছিলেন মটোরোলা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। আমেরিকান এই বিজ্ঞানী তার সহকর্মী জন এফ মিশেলের সাথে যৌথভাবে মোবাইল ফোন বা সেলুলার ফোন আবিষ্কার করেন। ১৯৫০ সালে ইলিনয়িস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) থেকে স্নাতক ডিগ্রী লাভ,১৯৫৭ সালে আইআইটি থেকেই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন, ২০০৪ সালে এখান থেকেই সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন তিনি। ১৯৭০-এর দশকে মোটোরোলা কোম্পানীতে কর্মরত অবস্থায় প্রথমবারের মতো হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোন থেকে কথা বলেন। বর্তমানে তিনি ইলিনয়িস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে রয়েছেন।

এন এইচ, ২০ জানুয়ারি

Back to top button