শিক্ষা

ফেল করেও রাবিতে ভর্তি হলো ৭১ শিক্ষার্থী!

রাজশাহী, ১৯ জানুয়ারি – রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ২০২০-২১ স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে প্রথম বর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেও পোষ্য কোটায় ভর্তি হয়েছেন ৭১ শিক্ষার্থী। কোটা নীতিমালা পরিবর্তন করে পাশ নম্বর ৪০ থেকে কমিয়ে ৩০ করা হয়েছে। এতে সুবিধা নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মালী, কর্মকর্তা ও অধ্যাপকরাও। এর আগে গত বছর ৬ ডিসেম্বর রাবি উপাচার্য প্রফেসর ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপুর সভাপতিত্বে ভর্তি পরীক্ষা উপকমিটির সভায় পোষ্য কোটায় পাশ নম্বর কমিয়ে আনা হয়। গত বছরও ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও পোষ্য কোটায় ভর্তি হন ৪৬ শিক্ষার্থী।

জানা গেছে, এ বছর এ ইউনিটে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন সর্বশেষ ৬১.৮৫ নম্বর ও প্রতিবন্ধী কোটায় সর্বশেষ ৪৬.৮৫ নম্বর পেয়ে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় সর্বশেষ ৫৯.৮০ নম্বর পেয়ে ভর্তি হয়েছেন। অন্যদিকে পোষ্য কোটায় অকৃতকার্য হয়েও ভর্তি হয়েছেন ৩০ নম্বর পেয়ে। এ বৈষম্য সুবিধা নিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ অধ্যাপকসহ ৯ শিক্ষক। অথচ প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধা ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটায় কোনো যোগ্যতা শিথিল করা হয়নি।

রাবির ইতিহাসে প্রথম টোয়াস সদস্য ড. অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, শিক্ষকদের সন্তানের জন্য পোষ্য কোটা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। কোটা অর্থ হচ্ছে- কোনো ঐতিহাসিক জাতিগত কারণে ও সামাজিক বিচারের অভাবে পিছিয়ে পড়াদের সামঞ্জস্য করতে কিছুদিনের জন্য সুযোগ দেওয়া। সেই বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানের কোটা আসে না। তাতে আবার ফেল করা শিক্ষার্থীকে পাশ নম্বর কমিয়ে ভর্তি করা সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো দৃষ্টান্ত তৈরি করবে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি নিচের দিকে নামাবে।

পাশ নম্বর কমিয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীকে ভর্তি করার এমন প্রক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে রাবির একাধিক গবেষক বলেন, এমন সিদ্ধান্ত বাজে সংস্কৃতি তৈরি করবে। শুধু তাই নয়, এত কম মার্ক নিয়ে যে শিক্ষার্থী ভর্তি হবে অন্যদিকে একজন মেধার ভিত্তিতে দ্বিগুণ নম্বর পেয়ে ভর্তি হবে-দুজন কখনোই সমান হবে না। তাতে আবার অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হচ্ছে। বরঞ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তানের কোনো কোটা রাখাই উচিত নয়। আজ ভর্তিকৃত এসব শিক্ষার্থী ৫ বছর পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলে ধরনা দেবেন। এ কারণেই ফ্যাকাল্টিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে পারেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও দেখা দেয় নানা প্রশ্ন।

বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন একরামুল হামিদ বলেন, যে শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় ৪০ নম্বর পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে কী আশা করা যায়! আর এভাবে ভর্তি করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষারই কী দরকার! এতে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বাড়বে। এরা আবার রেজাল্টের শেষ দিকে অবস্থান থাকলে তদবির করে পারিবারিক কোটায় শিক্ষক হওয়ার জন্য লড়াই করবে। সুতরাং এ সংকীর্ণতা থেকে প্রথমত শিক্ষকদেরই বেরিয়ে আসা উচিত।

কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুল আলীম জানান, প্রতিবছর পোষ্য ও মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য কিছু আসন বরাদ্দ থাকে। তবে এবার পোষ্য কোটায় বেশ কিছু আসন ফাঁকা ছিল। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা ৩০ নম্বর পেয়েছেন তাদের ভর্তি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে ভর্তি বিষয়ে কোটা সংক্রান্ত সুবিধার সুস্পষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। তবে কমিটিকে ক্ষমতা দিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদালয়ের সব ভর্তি কার্যক্রম অধ্যাদেশের ৪৬ ধারা অনুযায়ী ভর্তি কমিটি নির্ধারিত কার্যপ্রণালী অনুযায়ী তৈরি করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ ধারাকে কাজে লাগিয়েই রাবিতে ভর্তি পরীক্ষায় কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. গোলাম সাব্বির সাত্তারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. সুলতান-উল ইসলাম বলেন, আমরা এ প্রথাগত অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। তবে একসঙ্গে সব অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়। এটা আমাদের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাই এ বছর বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বন্ধ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্র : যুগান্তর
এন এইচ, ১৯ জানুয়ারি

Back to top button