জাতীয়

সংলাপে অংশ নেওয়া দলের সঙ্গেও ঐক্য চায় বিএনপি

নজরুল ইসলাম

ঢাকা, ০৬ জানুয়ারি – রাষ্ট্রপতির চলমান সংলাপে কোন রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে, নেবে বা নেয়নি এই মুহূর্তে তা আমলে নিতে চাচ্ছে না বিএনপি। দলটির লক্ষ্য চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে চলমান আন্দোলনের পাশাপাশি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুটিকে কীভাবে সবার কমন দাবিতে পরিণত করা যায়। আর তা নিয়েই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দ্রুতই আলোচনায় বসবে বিএনপি। এমন অবস্থায় সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর সঙ্গেও ঐক্য গড়তে চায় দলটি। কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবির ফয়সালা হওয়ার পর আমাদের মূল দাবি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন শুরু করা। এ দাবিতে ডান ও বামপন্থি সব রাজনৈতিক দলের বৃহৎ ঐক্য গড়ে তুলতে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করব। এরই মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কয়েকটি দল এবং ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে তাদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে বলেও জানান তিনি।

যদিও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই গত কয়েক বছর ধরেই রাজপথে আন্দোলন গড়তে ভেতরে ভেতরে ঐক্য গড়ার চেষ্টা করে আসছে বিএনপি। দলটি মনে করে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে সেই চেষ্টায় অনেকটা তারা সফলও হয়েছিলেন। তবে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলাসহ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কৌশলের কাছে দলটি মার খায়। এর পরিণতি ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় বলেন, ‘নবম, দশম ও একাদশ- এই তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনই কৌশলে বৈতরণী পার করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিটি কেন্দ্রে ৪০ হাজার ব্যালট রিজার্ভ রাখা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কর্মকর্তাসহ দশ হাজার ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্সই যায়নি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন আগের রাতে হয়েছে। দিনের ভোট রাতে কেটেছে- এটা কে বুঝবে? কেউই তো ভাবে নাই।’

দলটির নেতাদের ভাষ্য, এবার পরিস্থিতি বুঝে এগোতে চান তারা। কারণ গণতান্ত্রিক পন্থায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে সরকার পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হচ্ছে ভোট। যেহেতু বিগত নির্বাচন তিনটিতে ভোটাধিকারের প্রতিফলন জনগণ দেখতে পায়নি, এবার তারা সেই ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে চান।

বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা বলেন, সম্প্রতি র‌্যাব ও র‌্যাবের সাবেক ও প্রধান কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ ছাড়াও সরকারের পদ হারানো প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে কানাডায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। তাদের ভাষ্য, সরকার বেশ চাপের মধ্যেই রয়েছে। একটা সময় সবাই মনে করত শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে আছেন, তত দিন আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকবে। চলমান পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের চিন্তার পরিবর্তন এসেছে। বিএনপি বিশ্বাস করে, আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা আগের তিনটি নির্বাচনের মতো হবে না। এসব নেতা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজপথে নামা গেলে আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা সম্ভব।

এ চিন্তা থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি আদায়ে সব পক্ষকে একসূত্রে গাঁথতে চায় বিএনপি। এক্ষেত্রে পুরনো জোটকাঠামো প্রয়োজনে ভেঙে দিতেও রাজি বলে দলটির নীতিনির্ধারকরা জানান। এমন প্রেক্ষাপটে ২০-দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টকে ভিন্ন কোনো কৌশলে আন্দোলনে সম্পৃক্ত রাখার কথাই বেশি ভাবা হচ্ছে।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জানান, বৃহৎ ঐক্যে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী বাধা হয়ে দাঁড়ালে সেখানেও কৌশলের আশ্রয় অবলম্বনের কথা ভাবছে বিএনপি। দূরে ঠেলে না দিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে কৌশলে তাদের সঙ্গে পথ চলবে দলটি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, একটি জোটবদ্ধ বৃহৎ আন্দোলন এখন সময়ের দাবি। তবে তার মানে এই নয় যে, সবাইকে একমঞ্চে আসতে হবে। আলাদা থেকেও যুগপৎ আন্দোলন করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুবউল্লাহ মনে করেন, ‘মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ আছে। কিন্তু কেউ অত্যাচারের মধ্যে পড়তে চায় না। বিরোধী দলের চ্যালেঞ্জ হলো, যে বরফ জমেছে, সেটা কীভাবে ভাঙা যাবে।

এই অবস্থায়, ইসি গঠনে চলমান রাষ্ট্রপতির সংলাপে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। সংলাপ শেষে সমমনা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, অভিন্ন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের উদ্দেশ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে চান তারা। এরই মধ্যে সিপিবি, বাসদ, ইসলামী আন্দোলন, ২০-দলীয় জোটের শরিক এলডিপি রাষ্ট্রপতির সংলাপে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মুসলিম লীগ ও মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিমের কল্যাণ পার্টিও সংলাপে যাবে না বলে বিএনপিকে আশ্বস্ত করেছে।

খালেদা জিয়ার বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানিয়ে আসছে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিএনপি মনে করছে, এখানে এক ধরনের ঐক্য হয়ে আছে। এর সঙ্গে সংলাপে না যাওয়ায় বিএনপির সঙ্গে ওই সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে মানসিক নৈকট্য বলে মনে করছে তারা। পাশাপাশি যারা সংলাপে গিয়েছে এবং যারা যাবে, তাদের অনেকেই নির্দলীয় সরকারের পক্ষে আছে। তবে এ বিষয়ে আরেকটু পরিষ্কার হতে সংলাপ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে বিএনপি। তারপর ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে মাঠে নামবে।

বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সোমবারের সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে মঙ্গলবার গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়, ‘সভায় নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ সম্পর্কে আলোচনা হয়। সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মতবিনিময়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’

এদিকে, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে সুচিকিৎসার দাবিতে ফের ৪০ সাংগঠনিক জেলায় সমাবেশ ডেকেছে বিএনপি। দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদপর্যাদার নেতারা এ সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, মহানগর সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোকে মহানগরের বাইরে সমাবেশের স্থান নির্ধারণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভাগীয় সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকরা টিমের সদস্য হিসেবে সমাবেশের সমন্বয় করবেন। সংশ্লিষ্ট জেলার জাতীয় নির্বাহী কমিটির নেতারা সমাবেশকে সফল করতে জেলা নেতৃবৃন্দকে সার্বিক সহযোগিতা করবেন। প্রতিটি টিমে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বের একজন প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

এর আগে গত ১৬ ডিসেম্বর ৩২ জেলায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। অনুমতি না পাওয়া, ১৪৪ ধারা জারি থাকা, হাইকমান্ডের দৃষ্টিতে কর্মসূচি সন্তোষজনক না হওয়ায় পুনরায় ৫ জেলায় কর্মসূচি করার কথা বলা হয়। জেলাগুলো হচ্ছে- নওগাঁ, চাঁদপুর, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নারায়ণগঞ্জ। এর মধ্যে ৮ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১২ জানুয়ারির সমাবেশে রাজশাহীতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কুমিল্লা উত্তর ও দক্ষিণে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রংপুরে মির্জা আব্বাস, বরিশাল দক্ষিণে গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, খুলনায় নজরুল ইসলাম খান, চট্টগ্রাম দক্ষিণে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিলেটে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন।

১৫ জানুয়ারি নীলফামারীতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ফেনীতে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নওগাঁয় গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, কুষ্টিয়ায় নজরুল ইসলাম খান, বরগুনায় মেজর (অব) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, শেরপুরে শামসুুজ্জামান দুদু ও বাগেরহাটে রুহুল কবির রিজভী প্রধান অতিথি।

১৭ জানুয়ারি রাঙামাটিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নেত্রকোনায় নজরুল ইসলাম খান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, রাজবাড়ীতে মেজর (অব) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, নড়াইলে নিতাই রায়চৌধুরী, পিরোজপুরে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, চুয়াডাঙ্গায় শামসুজ্জামান দুদু ও কুড়িগ্রামে রুহুল কবির রিজভী টিমপ্রধান ও অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন।

২২ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চাঁদপুরে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরায় মির্জা আব্বাস, ময়মনসিংহ দক্ষিণে গয়েশ্বরচন্দ্র রায়, নাটোরে নজরুল ইসলাম খান, বরিশাল উত্তরে বেগম সেলিমা রহমান, চট্টগ্রাম উত্তরে আব্দুল্লাহ আল নোমান, সৈয়দপুরে শওকত মাহমুদ ও শরিয়তপুরে আমানউল্লাহ আমান টিমপ্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন।

২৪ জানুয়ারি ময়মনসিংহ উত্তরে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ঝালকাঠিতে ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, মাগুরায় অ্যাডভোকেট নিতাই রায়চৌধুরী, মাদারীপুরে মীর মোহাম্মাদ নাছিরউদ্দিন, বান্দরবানে মো. শাহজাহান, মৌলভীবাজারে আবদুুল আউয়াল মিন্টু ও পঞ্চগড়ে আমানউল্লাহ আমানকে প্রধান অতিথি করা হয়েছে।

সূত্র : আমাদের সময়
এম এস, ০৬ জানুয়ারি

Back to top button