অপরাধ

পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের পাহাড়

চট্টগ্রাম, ০৪ জানুয়ারি – ক্ষমতার জোর খাটিয়ে অর্জিত সম্পদের তথ্য লুকানোর অভিযোগে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া ও সন্দ্বীপ থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বর্তমানে তিনি ট্যুরিস্ট পুলিশ চট্টগ্রাম অঞ্চলে পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।

মঙ্গলবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রতন কুমার দাশ বাদী হয়ে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা) চট্টগ্রাম-২ এ মামলা দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ আরিফ সাদেক।

মামলায় পুলিশ পরিদর্শক শাহজাহানের বিরুদ্ধে দুদকে দেয়া সম্পদ বিবরণীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৪৯ লাখ ৩৯ হাজার ১২৬ টাকা সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। একইসঙ্গে ৭৮ লাখ ১ হাজার ৫২০ টাকার সম্পদ তার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে অর্জন করে তা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রুপান্তরের মাধ্যমে ভোগদখলে রাখার অভিযোগ এনে দুদক আইন ২০০৪ এর ২৬(২), ২৭(১) ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২), ৪(৩) ধারা তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০ সালে চাকরি শুরুর পর থেকে মো. শাহজাহানের নামে সর্বমোট ২ কোটি ৬৪ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ টাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৮৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৮৭ টাকা ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। চাকরি নেয়ার পর থেকে তার বৈধভাবে আয় ৭৮ লাখ ৫২ হাজার ৯৭৬ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে তিনি ব্যয় করেছেন ২৬ লাখ টাকা ১২ হাজার ৪৭৩ টাকা। সবমিলিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে জ্ঞাত আয়বর্হিভূত সম্পদের পরিমাণ মিলেছে ১ কোটি ২৫ লাখ ২৩ হাজার ৮১০ টাকা।

এছাড়া তার স্ত্রী ফেরদৌসী আক্তারের নামে সর্বমোট স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ১৭ লাখ ৭৫ হাজার ৬১৭ টাকা। এর মধ্যে বৈধ আয় ৪৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৫৫ টাকা। পারিবারিক ও অন্যান্য খাতে তিনি ব্যয় করেছেন ১৩ লাখ ২৮ হাজার ৭৩০ টাকা। সবমিলিয়ে তার বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮৩ লাখ ২ হাজার ৬৯২ টাকা জ্ঞাত আয়বর্হিভূত সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে প্রাথমিকভাবে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে লোহাগাড়া থানায় কর্মরত থাকাকালে ওসি শাহজাহানের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুদকের প্রধান কার্যালয় বরাবরে অভিযোগ পাঠান মো. হারুন নামে এক ব্যক্তি। এ অভিযোগের পর দুদক জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ তদন্ত শুরু করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১২ সালের ১২ জুন লোহাগাড়া থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করেন। এরপর থেকে নানা অনিয়ম, গ্রেপ্তার বাণিজ্য, মামলা ও হুমকির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার অভিযোগে সমালোচিত হতে থাকেন এই কর্মকর্তা। সর্বশেষ লোহাগাড়া থানা হেফাজতে থাকা এক ফৌজদারি মামলার আসামিকে সাজা দেওয়ার ঘটনায় তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন এই ওসি। এই ঘটনার পর ওসি শাহজাহানকে থানা থেকে প্রত্যাহার করতে নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ওসি শাহজাহান সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে গিয়ে বদলির আদেশ খারিজের আবেদন করেন। ৫ ফেব্রুয়ারি শাহজাহানের আবেদনটির শুনানির তারিখ নির্ধারণ করে আপিল বিভাগের পূর্নাঙ্গ বেঞ্চে পাঠানো হয়। সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি ওসি শাহজাহানের আবেদন খারিজ করে লোহাগাড়া থানা থেকে প্রত্যাহারের আদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্ট।

এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইন শাখার-১ এর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা স্বাক্ষরিত এক আদেশে মো. শাহজাহানকে লোহাগাড়া থানা থেকে চট্টগ্রাম পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের লাইনে সংযুক্ত থাকার এক মাসের মাথায় মো. শাহজাহান আবারও ওসি হিসেবে নিয়োগ নিয়ে সন্দ্বীপ থানায় যোগ দেন। যোগদানের একদিন পর ২০১৮ সালের ১৮ মার্চ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. খসরুকে হয়রানিসহ তার বাড়িঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে পুলিশের ১৮-২০ জনের একটি দল। এ ঘটনার পর উপজেলা আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ক্ষোভে ফুসে ওঠে। ওসির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশও হয়। এরপর ২০১৯ সালের জুন মাসে ওসি শাহজাহানকে নারায়ণগঞ্জ জেলার ট্যুরিস্ট পুলিশে বদলি করা হয়।

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এন এইচ, ০৪ জানুয়ারি

Back to top button