নওগাঁ

কবর থেকে উঠে এসেও ভোট দিয়েছেন ২৫ ব্যক্তি!

নওগাঁ, ০১ জানুয়ারি – চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার খেলনা ইউনিয়নে নানারকম অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনে ভগবানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৯৯.১৬ পারসেন্ট ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। একই কেন্দ্রে ১১ জন ভোটারের অনুপস্থিতি ও ২৫ জন মৃত ব্যক্তির ভোট কাস্টিং দেখানোয় জনমনে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। নির্বাচনে পরাজিত নৌকার প্রার্থী ইতোমধ্যে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় ভোট গণনার দাবি জানিয়েছেন।

জানা গেছে, গত ২৬ ডিসেম্বর খেলনা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে মো. নাজমুল হোসেন, ঘোড়া প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী হিসেবে মো. আব্দুস সালাম, আনারস প্রতীক নিয়ে মো. আলহিল মাহমুদ চৌধুরী এবং লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মো. আবুল হোসেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহিল মাহমুদ চৌধুরী ৩ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীক নিয়ে নাজমুল হোসেন পান ৩ হাজার ৬১৬ ভোট।

এদিকে ভগবানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহিল চৌধুরী পান ৪৫৯ ভোট এবং নৌকার প্রার্থী নাজমুল হোসেন পান ৪২৬ ভোট। এই কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ১ হাজার ৩০২ জন। ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে ১ হাজার ২০৯১ জন। অর্থাৎ ভোট কাস্টিংয়ের হার ৯৯.১৬ পারসেন্ট।

বাতিল ভোট দেখানো হয়েছে ১৭৫। নির্বাচনে ভোট প্রদানের জন্য ১১ জন ভোটার অনুপস্থিতি দেখানো হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ২৫ জন মৃত ব্যক্তির নামে ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। যাদের ভোটার নাম্বার হলো যথাক্রমে- ভগবানপুর গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলী (০০৩), মৃত বুধু সিং (০৫১), মৃত তিলন সিং (০৮৭), মৃত হরিপদ মাহাতো (১০৩), মৃত গোপাল চন্দ্র মাহাতো (১৩০), মৃত ভবেশ চন্দ্র মাহাতো (১৩৪), মৃত নবকৃমার মাহাতো (১৪২), মৃত গৌর সিং (১৪৯), মৃত বিশ্বনাথ সিং (১৫৮), মৃত রিয়াজ উদ্দিন (২২৭), মৃত কছিমদ্দিন (২৩০), মৃত নূর মোহাম্মদ (২৭৯), মৃত গীতা সিং (০৫৪), মৃত শিব বালা মাহাতো (০৬৮), মৃত লক্ষী রাণী মাহাতো (০৯৮), মৃত নিয়তী মাহাতো (০৯৯), মৃত নিবু বালা মাহাতো (১২৮), মৃত পুসনী সিং (১৩৫), মৃত জসবা মাহাতো (১৫৬), মৃত বুধই সিং (১৬৩), মৃত মাজেদা বেগম (১৯৩), মৃত সুফিয়া বেগম (২৬২), মৃত হাছনা বেগম (২৬৭), মৃত বিবিনা খাতুন (২৬৯) ও মৃত জহুরা বেগম (২৬১)।

এছাড়াও বিদেশে অবস্থানরত ৭ জনের নামে ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে। এরা হলেন- জর্ডানে অবস্থানরত ভবগানপুর গ্রামের রেখা বেগম (০১৬), মোছা. ডলি বেগম (০২৯), সৌদি আরবে অবস্থানরত মো. ছয়ফুল আলম (০১২), কুয়েতে অবস্থানরত মনোরঞ্জন সিং (০৮৫), সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত মো. রাহাবুল ইসলাম (২৮৯), জয়নাল আবেদীন (০৭৪), মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত সানাউল।

এদিকে একই কেন্দ্রে মহিলা মেম্বারদের ক্ষেত্রে ভোট কাস্টিং হার দেখানো হয়েছে ৮৬.৮৭ পারসেন্ট। একই কেন্দ্রে চেয়ারম্যান ও মহিলা মেম্বার প্রার্থীর রেজাল্ট শিটে আলাদা আলাদা ভোট কাস্টিংয়ের হার উল্লেখ করায় জনমনে চরম সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান, নৌকার প্রার্থীর লোকজনকে মারধর, নিজ ভোট কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারকে দায়িত্ব প্রদান ইত্যাদি অভিযোগ এনে খেলনা ইউপি নির্বাচনে নৌকার পরাজিত প্রার্থী মো. নাজমুল হোসেন ধামইরহাট উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলন করেন।

সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি ২৬ ডিসেম্বর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভোট পুনর্গণনার জোর দাবি জানান। এ সময় তিনি বলেন, ষড়যন্ত্র করে কৌশলে তাকে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ভগবানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের নৌকা প্রতীকের মনোনীত পোলিং এজেন্ট মো. সোহেল রানা বলেন, কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ভোট শেষ হওয়ার আগেই তার কাছ থেকে কাগজপত্র স্বাক্ষর করে নেন।

কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার আলহাজ জাহাঙ্গীর আলম মেমোরিয়াল কলেজের প্রভাষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সবার সামনে ভোট গণনা করা হয়েছে, কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট হয়েছে।

মৃত ব্যক্তির ভোট কাস্টিং বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা কৌশলে এড়িয়ে যান।

উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কেন্দ্রে সব দায়-দায়িত্ব প্রিসাইডিং অফিসারের। এখানে নির্বাচন কর্মকর্তার কোনো ভূমিকা নেই।

রিটার্নিং কমর্কতা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, প্রিসাইডিং অফিসাররা যেভাবে ফলাফল জমা দিয়েছেন আমরা সেভাবে ঘোষণা করেছি। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। কোনো অভিযোগ থাকলে গেজেট প্রকাশের পর বিধিসম্মতভাবে আপত্তি প্রদানের পরামর্শ প্রদান করেন তিনি।

ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার গণপতি রায় বলেন, এ বিষয়ে তার কিছু বলার নেই।

সূত্র : যুগান্তর
এন এইচ, ০১ জানুয়ারি

Back to top button