ইসলাম

নববর্ষে মুমিনের ভাবনা কী হওয়া উচিত?

নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়েই নতুন বছরের সূচনা হয়। বছরের সূচনালগ্নে প্রতিটি মানুষই সুন্দর স্বপ্ন আর সম্ভাবনার কথাই চিন্তা করে। আর চিন্তাশীল মুমিন মুসলমানের কামনা ও আশা থাকে অর্জন আর কল্যাণে যেন ভরে উঠে বছরের প্রতিটি দিন। এছাড়া নববর্ষে বছরজুড়ে নববর্ষে মুমিনের ভাবনা কী হওয়া উচিত?

মানুষের জীবনে নতুন বছর কীভাবে আসে? এ বছরের কি কোনো হিসাব আছে? নাকি অন্তহীন মাসের পর মাস অতিহাবিহত হয়। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। মাসের পর মাস অতিবাহিত হতে থাকে বিষয়টি এমন নয়। বরং মাস নির্ধারিত। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে আল্লাহর কাছে মাস গণনায় মাস হচ্ছে বারোটি।’ (সুরা তাওবা : আয়াত: ৩৬)

যেহেতু মাস বারোটি। সেহেতু ১২টি মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আবার তা নতুন করে মাস শুরু হয়। সেটি হোক বাংলা মাস কিংবা ইংরেজি মাস কিংবা আরবি মাস। সব হিসেবেই মাস বারোটি। তাইতো মুমিন মুসলমান মাত্রই প্রতিটি নতুন বছরে আশা ও কামনা করে যে, অর্জন আর কল্যাণে শুরু হবে তাদের নতুন বছর। আর এ অর্জন ও কল্যাণ বছরজুড়ে অব্যাহত থাকবে।

দেশভেদে মানুষ একাধিক বর্ষ হিসাব করে। বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত তিনটি নববর্ষ হিসাব করে। বাংলা ভাষা-ভাষি মানুষ বাংলা নববর্ষ হিসাব করে। দ্বিতীয় মুসলিম বিশ্ব আরবি নববর্ষ হিসাব করে। আবার আছে ইংরেজি নববর্ষের হিসাব। এছাড়াও বিভিন্ন জাতিগত হিসাবেও আছে বর্ষ গণনার প্রচলন।

মুমিন মুসলমান মাত্রই বছরের শেষে কিংবা শুরুতে আল্লাহর কাছে এভাবে প্রার্থনা করে-

‘হে দয়াময় প্রভু! আপনি অতীতের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন; আমাদের ভবিষ্যৎকে সুন্দর ও সহজ করে দিন। অর্জন আর কল্যাণে ভরপুর করে দিন নতুন বছর।’

দুনিয়ার হিসেবে নববর্ষের ভাবনা কী?

নববর্ষ প্রতিটি মানুষের মনে এ কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে- বিগত বছর সে কী হারিয়েছে আর কী পেয়েছে! তার দুনিয়ার অবস্থা বা বৈষয়িক অবস্থায় কি ইতিবাচক নাকি কোনো পরিবর্তন এসেছে? আর নেতিবাচক হলে তা কী কী?

পরকালীন হিসাবে মুমিনের ভাবনাই বা কী?

বিগত বছরজুড়ে মুমিন মুসলমান কি অন্যায়-অপরাধের তুলনায় বেশি ভালো কাজ করেছে? আর ভালো কাজ করে থাকলে সেগুলো কী কী? আবার নতুন বছরে যেন বিগত বছরের তুলনায় আরও বেশি ভালো কাজ করতে পারে সে ব্যাপারে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করাই থাকে মুমিনের চূড়ান্ত ভাবনা। এ ভাবনা থেকেই মুমিন মুসলমান নফল নামাজ ও বিশেষ ইবাদত-বন্দেগিতে নতুন বছর কাটিয়ে দেওয়ার বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এ আয়াতের স্মরণ সবচেয়ে বেশি জরুরি-

کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ؕ وَ اِنَّمَا تُوَفَّوۡنَ اُجُوۡرَکُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ فَمَنۡ زُحۡزِحَ عَنِ النَّارِ وَ اُدۡخِلَ الۡجَنَّۃَ فَقَدۡ فَازَ ؕ وَ مَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ

‘প্রতিটি জীবন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং কেয়ামতের দিন তোমাদের সবাইকে পরিপূর্ণমাত্রায় বিনিময় দেওয়া হবে। যে ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে; অবশ্যই সে ব্যক্তি সফলকাম হবে। কেননা পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৮৫)

মুমিনের ভাবনা ও কামনা থাকবে নতুন বছরে নিজেদের বিগত জীবনের দুর্বলতার জন্য মহান আল্লাহ তাআলার কাছে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা ও আগামী দিনের জন্য কল্যাণ পাওয়ার এই দোয়া করতে থাকা-

‘হে দয়াময় প্রভু! আপনি অতীতের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন; আমাদের ভবিষ্যৎকে সুন্দর ও সহজ করে দিন। অর্জন আর কল্যাণে ভরপুর করে দিন নতুন বছর।’

‘হে আল্লাহ! আমাদের নতুন বছর যেন বিগত বছরের মতো আমলের ক্ষেত্রে দুর্বল না হয় বরং নতুন বছরে আমাদের প্রতিটি কদম, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দিন যেন শুধু আপনার সন্তুষ্টির অর্জনের জন্য হয়।’

মনে রাখতে হবে

মুমিনের প্রতিটি দিনই যেন হয় নতুন বছরের নতুন দিন। কেননা এ কথাটিই বলেছিলেন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু। একবার পারস্যের নববর্ষের দিন ইমাম আজম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির দাদা তার বাবাকে নিয়ে কিছু হাদিয়াসহ হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যান। তখন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন-

‘নওরোজুনা কুল্লা ইয়াওম অর্থাৎ মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ।’

অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব-নিকাশ করবে এবং নব উদ্যমে নতুন করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত থাকবে। আর এটিই হবে মুমিন মুসলমানের চিন্তা ও ভাবনা।

সে কারণেই বছরজুড়ে প্রতিটি দিনকে নতুন বছরের নতুন ভেবে বেশিবেশি আল্লাহর কাছে একটি দোয়াটি করাও জরুরি। তাহলো-

اللَّهُمَّ أَدْخِلْهُ عَلَيْنَا بِالأَمْنِ ، وَالإِيمَانِ ، وَالسَّلامَةِ ، وَالإِسْلامِ ، وَرِضْوَانٍ مِنَ الرَّحْمَنِ ، وَجَوَار مِنَ الشَّيْطَانِ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা আদখিলহু আলাইনা বিল-আমনি, ওয়াল ইমানি, ওয়াস সালামাতি, ওয়াল ইসলামি, ওয়া রিদওয়ানিম মিনার রাহমানি, ওয়া ঝাওয়ারিম মিনাশ শায়ত্বানি।’ (আল-মুঝাম আল আওসাত)

অর্থ : ‘হে আল্লাহ আমাদের ঈমান, ইসলামকে নিরাপদ করুন। আমাদের সুরক্ষা দিন। দয়াময় রহমানের কল্যাণ দান করুন। শয়তানের মোকাবেলায় আমাদের সাহায্য করুন।’

মুমিন মুসলমানের জন্য নববর্ষ পালনের অন্যতম উপায়ও এটি। যার মাধ্যমে মানুষ পাবে দুনিয়া ও পরকালের সফলতা। আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনের সঠিক হিসাব-নিকাশের তাওফিক দান করুন। আমিন।

এন এইচ, ০১ জানুয়ারি

Back to top button

This will close in 20 seconds