চট্টগ্রাম

জাহাজ-ভাঙা শিল্পে ১৬ বছরে ২২৮ শ্রমিক নিহত

মনির ফয়সাল

চট্টগ্রাম, ২৯ ডিসেম্বর – বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা থামছেই না। যা এ শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শ্রমিকদের নিজেদের গফলতি এবং কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরে নানা দুর্ঘটনায় জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে ছয়জন শ্রমিকের প্রাণহানি হয়েছে।

সাধারণত শীতের শুরুতেই জাহাজ ভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং বছরের অন্য সময়ের তুলনায় শীতে শ্রমিক হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়। এছাড়া গত ১৬ বছরে বিভিন্ন জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ২২৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বছরওয়ারি শ্রমিকদের প্রাণহানির সংখ্যাই এই শিল্পের ঝুঁকির পরিমাণ নির্দেশ করে দেয়।

জানা যায়, চলতি ২০২১ সালে ১২ জন জাহাজ ভাঙা শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৬ জন শ্রমিকের। ২০১৯ সালে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে ২০ জন শ্রমিক এবং গুরুতর আহত হয়েছে ৪০ জন। ২০১৮ সালে ১৭ কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ জন আহত হয়েছে।

২০১৭ সালে ১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৫ সালে ১৬ জন, ২০১৪ সালে ৯ জ, ২০১৩ সালে ১১ জন, ২০১২ সালে ২১ জন , ২০১১ সালে ৭ জন, ২০১০ সালে ১১ জন, ২০০৯ সালে ২৫ জন, ২০০৮ সালে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জন, ২০০৭ সালে ৮ জন, ২০০৬ সালে ১০ জন এবং ২০০৫ সালে মৃত্যু হয়েছে ৮ জন শ্রমিকের।

বছরের পর বছর ধরে ইয়ার্ড দুর্ঘটনার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শ্রমিকরা বেশিরভাগই বিস্ফোরণে কিংবা জাহাজ থেকে বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসার পর মারা যান। এছাড়া কার্বন মনোক্সাইডের মতো বিপজ্জনক পদার্থে শ্বাস ফেলা বা কোনো সুরক্ষা না থাকায় ডিজেজিং উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাগুলো প্রধান কারণ। কর্মক্ষেত্রে হতাহতের অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে স্টিলের মরীচি ও ভারী প্লেট, পাশাপাশি সিলিন্ডার, বয়লার এবং জেনারেটরের বিস্ফোরণ এবং বৈদ্যুতিক শকে মৃত্যু।

এ বিষয়ে ইপসার সিনিয়র প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মুহাম্মদ আলী শাহিন বলেন, আমদানি করা জাহাজগুলোর কাঠামোগত জটিলতার কারণেই জাহাজ ভাঙা একটি জটিল প্রক্রিয়া। তাই বৈজ্ঞানিক উপায়ে জাহাজ ভাঙা সম্পন্ন করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ শিপইয়ার্ডে পরিবেশ সুরক্ষা, সঠিক বর্জ ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের দুর্দশা বাড়িয়ে তুলছে।

তিনি বলেন, আশার কথা হচ্ছে কয়েকজন প্রগতিশীল মালিক এ শিল্পের ভাবমূর্তি পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে একটি ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। বেশ কয়েকজন শিল্প মালিকও সেই পথ অনুসরণ করছেন। জাহাজ-ইয়ার্ডগুলো যদি গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে এবং এখানকার আইনগুলো যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় তাহলে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, জাহাজ ভাঙা বিশ্বে একটি বড় পেশাগত এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পেশায় সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, অগ্রহণযোগ্যভাবে উচ্চমাত্রার প্রাণহানি, আহত এবং কাজের সাথে সম্পর্কিত রোগ। জাহাজগুলোর কাঠামোগত জটিলতার কারণে জাহাজ ভাঙা একটি জটিল প্রক্রিয়া। এছাড়াও পরিবেশ, সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যের অনেকগুলো বিপদ সৃষ্টি করে।

জাহাজ ভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে কমপক্ষে জাহাজ ভাঙা শিল্পের দুই শতাধিক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ পঙ্গু হয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ২০২১ সালে ১২ শ্রমিক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এবং আহত হন ৩০ জনের বেশি শ্রমিক। বছরের পর বছর জাহাজ ভাঙা শিল্পখাতে দুর্ঘটনা এবং শ্রমিকের মৃত্যুর হার ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেলেও এর জন্য দায়ী মালিক বা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বাংলাদেশে বিদ্যমান শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো সুবিধাও জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকরা পাচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালে মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সেক্টরের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি মাসিক ১৬ হাজার টাকা এবং দৈনিক ৬১৫ টাকা ধার্য করা হয়। শ্রম আইনের ১৪৮ ধারা অনুযায়ী এটা বাধ্যতামূলক হলেও মালিকেরা তা মানছে না। জাহাজ ভাঙা শিল্পের মালিকরা এত বেশি প্রভাবশালী যে, তারা একের পর এক অনিয়ম করে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো সাহসও কারো নেই।

বিলস কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাহাজ কাটার আগে বর্জ্য, বিষাক্ত গ্যাস এবং বিস্ফোরকমুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। ভৌগলিক সুবিধার কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ বড় জাহাজ এখানে কাটা হয়। কিন্তু বড় জাহাজ কাটার জন্য যে ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা প্রয়োজন, অধিকাংশ ইয়ার্ডে তা ব্যবহার করা হয় না।

তিনি আরও বলেন, শ্রম আইনের ৯০ (ক) ধারা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক হলেও এখনও কোনো ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকরা কাজ করছে। জাহাজ ভাঙা শ্রমিকদের কর্মস্থান আজ কবরস্থানে পরিণত হয়েছে। যার সর্বশেষ শিকার যমুনা শিপইয়ার্ডের ৪ হতভাগ্য শ্রমিক।

জানা যায়, গত দশ বছরে সরকারের শিল্প মন্ত্রাণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের এবং বিভাগের নানা উন্নয়নমূখী কার্যক্রম এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উন্নয়নে অভূতপূর্ব ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। দেশের শিপইয়ার্ডে শ্রমিক মৃত্যু শূন্যে নিয়ে আসা এবং হংকং কনভেনশনের আলোকে গ্রিন ইয়ার্ড তৈরির মাধ্যমে আধুনিকায়নে নামছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ড মালিকরা।

তবে বাংলাদেশের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা মাত্র ১টি। আধুনিকায়নে গেলেও এখনো অধিকাংশ ইয়ার্ডগুলোতে পরিবেশ দূষণ ও শ্রমিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। জাহাজ ভাঙা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে একটি বড় সমস্যা হলো এই শিল্পের অধিকাংশ শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। যার কারণে এ শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর এর জন্য শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবই প্রধান কারণ।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আল আমিন বলেন, অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগের কারণে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডেগুলোতে শ্রমিক মৃত্যু এবং আহত হওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটছে। মালিকরা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা সরঞ্জাম না দেয়ার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া নিরাপত্তা মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেক শ্রমিক বিষয়টি হালকাভাবে নেয়। তারা ৮ ঘণ্টার চেয়ে বেশি কাজ করে। যা অতিরিক্ত মজুরির আশায়। তখন এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল
এম ইউ/২৯ ডিসেম্বর ২০২১

Back to top button