জাতীয়

ইউপি নির্বাচনে ৩ জেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩ জন নিহত

ঢাকা, ২৭ ডিসেম্বর – চতুর্থ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের ওপর পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা হামলা চালিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি ছুঁড়েছে। এ সব ঘটনায় ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী ও সিলেট জেলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩ জন নিহত হয়েছেন।

এ ছাড়া টাঙ্গাইল ও মুন্সিগঞ্জে নির্বাচনের ফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ৮-১০ জন গুলিবিদ্ধি হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও

সদর উপজেলার রাজাগাঁও ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ আসাননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুলিশের গুলিতে ১ জন মারা গেছেন।

নিহত হামিদুল ইসলাম (৬৫) ওই ইউনিয়নের দক্ষিণ আসাননগরের বাসিন্দা ছিলেন।

রুহিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চিত্ত রঞ্জন রায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, রাজাগাঁও ইউপি নির্বাচনের ভোট গণনা শেষে ফলাফলে দেখা যায় ১ ওয়ার্ডে সদস্য পদে টিউবওয়েল প্রতীকের প্রার্থী মাসুদ রানা বিজয়ী হন এবং ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী শাহ আলম পরাজিত হন।

এক পর্যায়ে নির্বাচনী কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে কেন্দ্র থেকে বাইরে আসার সময় পরাজিত ফুটবল প্রতীকের সমর্থকরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি ছোঁড়ে।

ওসি চিত্ত রঞ্জন জানান, পুলিশের গুলিতে হামিদুল ইসলাম ও শাহীনুর গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক হামিদুরকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত হামিদুল ইসলামের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে এবং এ ব্যাপারে থানায় একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান ওসি।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. রকিবুল আলম ডেইলি স্টারকে জানান, পিঠে গুলিবিদ্ধ শাহীনুর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

পটুয়াখালী

ইউপি নির্বাচনের ফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চর মোন্তাজ ইউনিয়নের নয়ার চর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ জন মারা গেছেন।

পটুয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘চর মোন্তাজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ একজনের মরদেহ পাওয়া গেছে। তবে কীভাবে তিনি নিহত হয়েছেন তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

সূত্র জানায়, ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে সদস্য প্রার্থী মো. আলমগীর হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করেন প্রিজাইডিং অফিসার মো. আজমল হোসাইন। কিন্তু এ ফলাফল মেনে নেননি পরাজিত সদস্য প্রার্থী মো. জিয়াউর রহমান। তিনি প্রিজাইডিং অফিসারকে আবার ভোট গণনার জন্য চাপ দেন।

কিন্তু প্রিজাইডিং অফিসার আবার ভোট গণনা করতে অস্বীকার করলে তিনিসহ সেখানে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবরুদ্ধ করে জিয়াউর রহমানের সমর্থকরা। এ সময় তারা ইট-পাটকেল ও লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালায়।

পরে অতিরিক্ত পুলিশ, র‍্যাব ও স্ট্রাইকিং ফোর্স ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সিলেট

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশ-র‌্যাবের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত হয়েছেন।

রোববার রাত ৮টার দিকে ফুলবাড়ী ইউনিয়নের বইটিকর বাজারে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নিহত আব্দুস সালাম (৪৫) উপজেলার লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়নের রামপা দক্ষিণভাগ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

গোলাপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউপি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম কবির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, রোববার দিবাগত রাত ৮টার দিকে ফুলবাড়ি ইউনিয়নে ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও র‌্যাব ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ শুরু হয়।

তিনি বলেন, ‘সংঘর্ষের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও র‌্যাব ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে ওই ব্যক্তি নিহত হন। তবে কার গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।’

মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং ওই এলাকার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক আছে বলে জানান তিনি।

টাঙ্গাইল

ইউপি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ২ ইউনিয়নে এবং সদর উপজেলার ১ ইউনিয়নে কেন্দ্র অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় অন্তত ৫ জন আহত হয়েছেন।

সূত্র জানায়, ভূঞাপুরের ফলদা ইউনিয়নের রামসুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার জন্য বিকেল থেকে ২ জন ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাচন কর্মকর্তা এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আটকে রাখে দুই স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা।

পুলিশ ও র‍্যাবের চেষ্টায় প্রায় ৪ ঘণ্টা পর রাত ৮টার দিকে তাদের উদ্ধার করা হয়। সে সময় পুলিশকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে হয়।

এদিকে, উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের চরচন্দসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ গুলি বর্ষণ করলে ৫ জন আহত হয়।

এ সব ঘটনার বিষয়ে জানতে ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল ওহাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘অনেক বাধা ও হাজারো উত্তেজিত জনতার অবরোধের মধ্যে ফলদা ইউনিয়নের ওই কেন্দ্র থেকে ম্যাজিস্ট্রেটসহ অবরুদ্ধদের নিরাপদে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।’

এদিকে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের নন্দবালা বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনায় ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশসহ কয়েকজন আহত হয়েছে।

কেন্দ্রে কর্তব্যরত পুলিশের উপপরিদর্শক মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, ‘দুই পরাজিত মেম্বার প্রার্থীদের সমর্থকরা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে কেন্দ্র ঘেরাও করে রাখে এবং পরে হামলা চালায়।’

এ সময় ইট পাটকেল নিক্ষেপ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরুদ্ধদের উদ্ধার করে বলে জানান তিনি।

মুন্সিগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার জৈনসার ইউনিয়নে ইউপি নির্বাচনে ফলাফল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের ছোঁড়া গুলিতে ১ কিশোরসহ ৩ জন আহত হয়েছেন।

রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে জৈনসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সামনে এ ঘটনা ঘটেছে।

আহতরা হলেন-জৈনসারের কাঁঠালতলী এলাকার জামির (১৪), একই এলাকার জাহাঙ্গীর (৩০) ও খিলগাঁও এলাকার রাসেল (৩০)।

আহতদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

মুন্সিগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (সিরাজদিখান সার্কেল) রাশেদুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে জানান, জৈনসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গণনা চলছিল। সে সময় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের সমর্থকরা ব্যালট ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ব্যালট বাক্স উপজেলা অফিসে নেওয়ার পথে উত্তেজিত সমর্থকরা সড়কে বেরিকেড দিয়ে বাধা দেয়।

‘এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছিল। পুরো ঘটনা তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।

সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সিহাব আল মশিউর জানান, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ৩ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের একজনের বুকে, একজনে উরুতে এবং একজনের গলার একপাশে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ছিল।

প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ৩ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার
এন এইচ, ২৭ ডিসেম্বর

Back to top button