ইসলাম

মাতৃভাষায় হাদিস চর্চার আগে যা জানা জরুরি

মাহফুয আহমদ

হাদিসে রাসুল (সা.) হচ্ছে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের দ্বিতীয় মৌলিক উৎস। হাদিস ও সুন্নাহর অনুসরণ প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। শিক্ষিতদের জন্য হাদিস অধ্যয়নও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং সৌভাগ্যের বিষয়। রাসুল (সা.)-এর ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী হিসেবে উলামায়ে কেরামের জন্য হাদিস ও সুন্নাহর প্রচার-প্রসার, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও এসবের সংরক্ষণ এক মহান দায়িত্ব। উম্মাহর নির্ভরযোগ্য আলিমরা সর্বযুগে এ গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। আজকাল সাধারণ শিক্ষিত আমাদের অনেক বন্ধু কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন করতে আগ্রহী হচ্ছেন এবং সাধ্যমতো এগুলো থেকে উপকৃত হতে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা তাঁদের ধন্যবাদ জানাই এবং উৎসাহিত করি। তবে প্রত্যেক জ্ঞান ও শাস্ত্রের নিজস্ব কিছু মৌলিক নীতিমালা থাকে, যেগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই বেশি জানেন; এগুলো জানা না থাকলে সাধারণ পাঠকরা অনেক সময় ভুল-ভ্রান্তির শিকার হতে পারেন। এমন কয়েকটি বিষয় নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো—

এক. প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে যে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমেই সহিহ হাদিস সীমাবদ্ধ নয়। বরং অন্যান্য হাদিসগ্রন্থেও প্রচুর সহিহ হাদিস রয়েছে। ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম উভয়েই স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে আমরা সব সহিহ হাদিস আমাদের গ্রন্থে সন্নিবেশিত করিনি কিংবা করতে পারিনি এবং তা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন, ‘আমি এই কিতাবে (সহিহ বুখারিতে) সহিহ হাদিসই উল্লেখ করেছি। তবে এ ছাড়া অনেক সহিহ হাদিস রয়ে গেছে।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা; জাহাবি, ১০/২৮৩, মুআসসাসাতুর রিসালা, বৈরুত, সপ্তম সংস্করণ, ১৪১০ হি.)

এমনিভাবে ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর শায়খ ইমাম আবু জুরআ রাজি ও ইমাম ইবনে ওয়ারা (রহ.)-এর কাছে যখন সহিহ মুসলিম সংকলনের সংবাদ পৌঁছে, তখন তাঁরা মন্তব্য করেছিলেন, ‘এটা আমাদের বিরুদ্ধে বেদয়াতিদের পথ সুগম করবে।’ যখন তাদের সামনে কোনো সহিহ হাদিস পেশ করা হয়, তখন তারা এই বলে প্রত্যাখ্যান করবে যে এটি তো সহিহ মুসলিমে নেই। তখন ইমাম মুসলিম (রহ.) আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘অর্থাৎ আমি তো এ কিতাবে আমার কাছে যারা হাদিস শিখতে আসবে, তাদের স্মরণ রাখার সুবিধার্থে কিছু হাদিস একত্রিত করেছি। আমি তো এ কথা বলিনি যে এ সমষ্টির বাইরের সব হাদিস দুর্বল, বরং এ কথা বলেছি যে এই হাদিসগুলো সহিহ।’ (প্রাগুক্ত, ১২/৫৭১)

এখানে ইমাম আবু জুরআ রাজি ও ইমাম ইবনে ওয়ারা (রহ.)-এর দূরদর্শিতার কথা চিন্তা করুন! তাঁদের কথা আজ আমাদের সমাজের কত নির্মম বাস্তবতা!

দুই. এ কথাও আমাদের স্মরণ রাখতে হবে যে কোনো বিষয়ে বাহ্যবিরোধপূর্ণ হাদিস যদি একাধিক হাদিসগ্রন্থে বিবৃত হয়, তাহলে নির্দিষ্ট কোনো গ্রন্থের হাদিসকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। সুতরাং কোনো বিষয়ের একটি হাদিস সহিহ বুখারি কিংবা সহিহ মুসলিমে আছে এবং একই বিষয়ের ভিন্ন একটি হাদিস সুনানে তিরমিজি অথবা অন্য কোনো গ্রন্থে বর্ণিত হয়, তাহলে প্রথম হাদিসটি শুধু সহিহ বুখারি বা সহিহ মুসলিমে হওয়ার কারণেই প্রাধান্য পাবে না। অবশ্য এটি ব্যাপক আলোচিত একটি বিষয়। এ প্রসঙ্গে মুহাদ্দিস আবদুর রশিদ নুমানি (রহ.) তাঁর ‘আত-তাকিবাত আলা সাহিবিদ দিরাসাত’ গ্রন্থে বিস্তারিত ও প্রামাণিক আলোচনা করেছেন। (আল আজওইবাতুল ফাজিলা; আবদুল হাই লখনউভি, টীকা : আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, পৃ. ২০২-২০৪, মাকতাবুল মাতবুআতিল ইসলামিয়্যা, আলেপ্পো, ষষ্ঠ সংস্করণ ২০০৫ ঈ.)

তিন. জয়িফ হাদিস সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করা ঠিক নয় যে তা কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হয় না। বরং মুসলিম উম্মাহর নির্ভরযোগ্য সব হাদিসবিদের মতে, ক্ষেত্রবিশেষে জয়িফ হাদিসও গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য হতে পারে। ফাজাইলে আমালের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসও যে গ্রহণযোগ্য, তা তো শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব মনীষীরই সিদ্ধান্ত। ইমাম নাওয়াওয়ি (রহ.) লেখেন, ‘মুহাদ্দিস ও ফকিহ আলিমরা বলেন, ফাজাইল, তারগিব ও তারহিব তথা ভালো কাজের উৎসাহ এবং মন্দ কাজ থেকে ভীতি প্রদর্শন সংক্রান্ত বিষয়ে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা জায়েজই নয়; বরং মুস্তাহাব। তবে হাদিসের নামে মাউজু বা বানোয়াট কথার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়।’ (আল আজকার; নাওয়াওয়ি, পৃ. ১৩, দারুল কলম আল আরাবি, প্রথম সংস্করণ ২০০২ ঈ.) নাওয়াওয়ি (রহ.) অন্যত্র বলেন, ‘সব আলিম এ বিষয়ে একমত যে ফাজাইলের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা যেতে পারে।’ (আল আরবাঈন; নাওয়াওয়ি, পৃ. ৪) আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ‘ফাজাইলে আমালের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করার সুযোগ রয়েছে।’ (আল হাওয়ি লিল ফাতাওয়া; সুয়ুতি, ২/১৯১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, ১৯৮২ ঈ.)

অবশ্য ফাজাইলে আ’মালের ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করার জন্য নির্ধারিত কিছু শর্ত রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে আল্লামা আবদুল হাই লাখনোবি (রহ.) কর্তৃক রচিত এবং শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)-এর টীকা-টিপ্পনী সংযোজিত ‘আল আজওইবাতুল ফাজিলা’ (পৃ. ৩৬-৫৯) প্রভৃতি গ্রন্থ দেখতে পারেন।

চার. জয়িফ হাদিসের আলোচনা প্রসঙ্গে এখানে আরেকটি কথা লক্ষণীয় যে মুহাদ্দিসদের মতে, ফাজাইলে আমাল ছাড়া আহকামে শারইয়্যাহর বেলায়ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে জয়িফ হাদিস গ্রহণযোগ্য ও আমলযোগ্য। নিচে এ রকম দুটি ক্ষেত্র নিয়ে আলোকপাত করা হলো—

ক. কোনো বিষয়ে সহিহ হাদিস পাওয়া না গেলে সে ক্ষেত্রে নিজ কিয়াস ও যুক্তির চেয়ে জয়িফ হাদিসই অগ্রগণ্য। আর এটা ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) প্রমুখ ইমামের নীতিগত সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া ইমাম আবু দাউদ (রহ.), ইমাম নাসায়ি (রহ.), ইমাম আবু হাতিম (রহ.) প্রমুখ মুহাদ্দিসও একই মত পোষণ করেছেন। আল্লামা ইবনে হাজম জাহিরি (রহ.) বলেন, ‘ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর সব শিষ্য এ ব্যাপারে একমত যে আবু হানিফ (রহ.)-এর মাজহাবে কিয়াস ও রায়ের তুলনায় জয়িফ হাদিসই অগ্রগণ্য।’ (মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা; জাহাবি, পৃ. ২১, মীর মুহাম্মদ কুতুবখানা, আরামবাগ, করাচি)

ইবনে হাজম অন্যত্র লেখেন, ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল বলেন, জয়িফ হাদিসই আমাদের কাছে রায় ও যুক্তির চেয়ে অধিক পছন্দনীয়।’ (আল মুহাল্লা; ইবনে হাজম, ৪/১৪৮, দারুল ফিকর, বৈরুত)

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘সুতরাং জয়িফ হাদিস ও আসারে সাহাবাকে কিয়াস ও রায়ের ওপর প্রাধান্য দেওয়া ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আহমদ উভয়ের মূলনীতি ছিল।’ (ই’লামুল মুয়াক্কিয়িন; ইবনুল কায়্যিম, ১/৮১, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত)

খ. যদি কোনো জয়িফ হাদিস অনুযায়ী তাওয়ারুসে উম্মত তথা মুসলিম উম্মাহর নিরবচ্ছিন্ন কর্মধারা চলে আসে এবং আলেমরা এ হাদিস গ্রহণ করেন, তাহলে ওই জয়িফ হাদিসের ওপর আমল করা জায়েজ তো বটেই, ওয়াজিবও হতে পারে। আরবের সমাদৃত লেখক, আল্লামা শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) বলেন, এখানে (আমল করা যাবে) এর মর্ম হলো—‘জরুরি ভিত্তিতে হাদিসটির ওপর আমল করা হবে এবং ওই আমল করাটা হাদিসকে সহিহর মানে উত্তীর্ণ করবে।’ শায়খ সেখানে এ বিষয়ের কয়েকটি নমুনাও পেশ করেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, সুনানে তিরমিজিতে হাদিস এসেছে : ‘খুনি নিহতের সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে না।’ ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটি সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন, ‘এই হাদিস সহিহ নয়। তদুপরি আলেমরা এই হাদিসের ওপর আমল করে থাকেন।’ (বিস্তারিত দেখুন—আল আজওইবাতুল ফাজিলা, পৃ. ৫০ ও ২২৮-২৩৮)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হলো যে বিভিন্ন পর্যায়ে জয়িফ হাদিসও কাজে আসে। আরবের স্বনামধন্য হাদিস গবেষক আল্লামা শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা হাফিজাহুল্লাহ তাঁর সাড়া-জাগানো গ্রন্থ ‘আসারুল হাদিসিশ শারিফ ফিখতিলাফিল আয়িম্মাতিল ফুকাহা’ (পৃ. ৩৬-৪১)-তে এ বিষয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন। আগ্রহী পাঠক তা দেখে নিতে পারেন। মোটকথা, জয়িফ হাদিস আর মাওজু হাদিস এক নয়। মাওজু হাদিস সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য, পক্ষান্তরে জয়িফ হাদিস বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য।

পাঁচ. হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সনদ বা সূত্র পর্যালোচনা করা একটি অপরিহার্য বিষয়। সনদ না থাকলে যার যা ইচ্ছা তা-ই হাদিস বলে চালিয়ে দিতে পারত। তবে এ কথাও জেনে রাখা দরকার যে ইসলামের প্রথম যুগগুলোতে মানুষের মধ্যে ধার্মিকতা ও সততা প্রবল থাকার কারণে তখনকার সনদগুলোতে তেমন দুর্বলতা পাওয়া যায় না, যেমনটি পরবর্তী সনদগুলোতে লক্ষ করা যায়। সুতরাং সনদের বাহানায় প্রমাণিত কোনো আমল অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) কতই না সুন্দর বলেছেন, ‘সনদ মূলত শরিয়তে নেই এমন বিষয়ের অনুপ্রবেশ থেকে প্রতিবন্ধকস্বরূপ, শরিয়তে প্রমাণিত কোনো বিষয় বের করার জন্য নয়।’ (দেখুন—বাসতুল ইয়াদাইন; কাশ্মীরি, পৃ. ২৬, মাআরিফুস সুনান; বানুরি, ৬/৩৮০, শায়খ আবু গুদ্দাহর ‘উজুবুল আমাল বিল হাদিসিজ জয়িফ…’ শীর্ষক প্রবন্ধ; আল আজওইবাতুল ফাজিলার সঙ্গে যুক্ত, পৃ. ২৩৮)

সর্বশেষ আরেকটি বিষয়ের প্রতি বিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। তা হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে হাদিসগ্রন্থাদি প্রচুর সংখ্যায় প্রকাশিত ও সহজলভ্য হওয়া কিংবা ইন্টারনেট-অনলাইনে অনায়াসে হাদিসের সন্ধান পেয়ে যাওয়া কস্মিনকালেও পূর্ববর্তী মনীষীদের চেয়ে আমাদের হাদিসজ্ঞান বেশি হওয়ার প্রমাণ নয়। এ ধরনের চিন্তা করা মারাত্মক ভুল ও বাস্তবতাবিবর্জিত। শায়খুল ইসলাম হাফিজ ইবনে তাইমিয়া (রহ.) অত্যন্ত সত্য কথা বলেছেন, ‘হাদিসের এসব গ্রন্থ সংকলিত হওয়ার আগে যেসব ইমাম অতিক্রান্ত হয়ে গেছেন, তাঁরা পরবর্তীদের চেয়ে অনেক বেশি হাদিসের জ্ঞান রাখতেন। কারণ, তাঁদের কাছে এমন বহু হাদিস ছিল, যা আমাদের পর্যন্ত মাজহুল (অজ্ঞাত) বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন্ন) সনদে পৌঁছেছে, কিংবা আদৌ পৌঁছেনি।’ (রাফউল মালাম আনিল আয়িম্মাতিল আ’লাম; ইবনে তাইমিয়া, পৃ. ১৮)

অতএব, কোনো হাদিসের সনদের বাহ্যিক দুর্বলতা দেখে সেটি পরিত্যাজ্য জ্ঞান করা, দু-একটি হাদিসগ্রন্থ অধ্যয়ন করেই কোনো মাসয়ালায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, নিরবচ্ছিন্ন কর্মপন্থায় চলে আসা উম্মাহর কোনো আমলকে ভুল আখ্যায়িত করা এবং উম্মাহর অনুসৃত ইমামরা সম্পর্কে অযাচিত মন্তব্য করা কোনোক্রমেই সমীচীন নয়। বরং এসব তো ব্যক্তির জ্ঞানের অপরিপক্কতা, চিন্তার অগভীরতা, মানসিক রুগ্ণতা ও চারিত্রিক দুর্বলতার পরিচায়ক।

এন এইচ, ৩১ অক্টোবর

Back to top button