ইসলাম

বিনম্র নামাজ: মুমিনের সফলতার প্রথম সিঁড়ি

সফলতা কে না চায়? প্রত্যেক সুস্থ ও বিবেকসম্পন্ন মানুষই সফল হতে চায় আপন কর্মে, আপন ক্ষেত্রে। যেখানেই সে বিচরণ করে, সেখানেই সফলতা অর্জন করতে চায়।

সফলতার এ চাওয়া ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। খুব স্বাভাবিকভাবেই একজন মুমিনও সফল হতে চাইবে তার জীবনে। সে বিশ্বাস করে- এ জীবনের সীমা খুব দূরে নয়। এর পর শুরু হবে এক অসীম জীবনের পথে চলা। মনেপ্রাণে যে এ বিশ্বাস লালন করে, তার মূল লক্ষ্যই তো হচ্ছে- আখেরাতের জীবন। হয়তো সে সফলতা কামনা করবে দুই জীবনেই। কিংবা সসীম দুনিয়ার জীবন কোনোভাবে শেষ হয়ে গেলেও তার চূড়ান্ত চেষ্টা সাধনা ও কামনা- অসীম পরকালীন জীবনে যাতে সে ব্যর্থ না হয়।

দুনিয়ার জীবন যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই এর সফলতাও ক্ষণস্থায়ী। প্রকৃত সফলতা হচ্ছে- আখেরাতের সফলতা। তাই যদি কেউ আখেরাতের অনন্ত অসীম জীবনে সফলতা ও মুক্তি না পায়, তাহলে দুনিয়াতে সে যতই সুখ, বিলাসিতা ও আরামে কাটাক না কেন, সে সফল নয়। আর যদি কোনো মুমিন দুনিয়ার অস্থায়ী ও স্বল্পকালীন জীবনটাকে কষ্টের ভেতর দিয়েও কাটায়, কিন্তু আখেরাতে সে জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামতরাজি লাভ করতে পারে, তাহলে সেই সফল।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা সফল মুমিনের পরিচয় বলে দিয়েছেন। সেখান থেকে যে কোনো মুমিন তার সফলতার পথ খুঁজে নিতে পারে। সফলতার জন্যে মহান আল্লাহর দেখানো যে পথ, তার চেয়ে উত্তম ও যথার্থ আর কোনো পথ হতে পারে?

সূরা মুমিনুনের শুরুটাই হয়েছে এভাবে- নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ! যারা তাদের নামাজে আন্তরিকভাবে বিনীত। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। -সূরা মুমিনুন: ১-৩

এখানে মুমিনের সফলতার জন্যে প্রথম যে দিকটির কথা বলা হয়েছে তা হলো- বিনম্র নামাজ। লক্ষণীয়, এখানে কিন্তু আমাদের শুধুই নামাজের গুরুত্বের কথা বলা হয়নি। কিংবা বলা যায়, সফল মুমিনের গুণ হিসেবে এখানে শুধু ‘তারা নামাজি’ এতটুকু বলেই শেষ করেনি। বরং সফল মুমিনের পরিচয় হিসেবে এখানে নির্দেশ করা হয়েছে বিনম্র নামাজের প্রতি। আন্তরিকভাবে বিনীত নামাজের প্রতি। যে নামাজে বান্দা তার প্রভুর দরবারে দেহ-মন সঁপে দেয়।

খুশু-খুজু অর্থাৎ আন্তরিক বিনয়ের সঙ্গে নামাজ পড়ার অর্থ হচ্ছে- নামাজে অন্তর স্থির থাকবে আল্লাহর জন্যে, আল্লাহর ধ্যান ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে অন্তর থাকবে মুক্ত ও পবিত্র। অন্তরের পাশাপাশি দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকেও বিরত রাখতে হবে অনর্থক নড়াচড়া থেকে। আশেপাশে এদিক-সেদিক না তাকিয়ে দৃষ্টিকে নিবদ্ধ রাখতে হবে সিজদার স্থানে। নামাজের মধ্যে যে কেরাত ও দোয়াসমূহ পড়া হয়, সেগুলোর দিকেও মনোযোগী হতে হবে। আর নামাজ হবে কেবল আল্লাহর উদ্দেশে, সেখানে কোনো মানুষকে দেখানোর কোনো উদ্দেশ্য থাকবে না। সর্বোপরি নামাজ আদায় করতে হবে অত্যন্ত মনোযোগ ও যত্নের সঙ্গে। নামাজে কোনো ধরনের উদাসীনতা ও অলসতা যেন করা না হয়।

কোরআনে কারিমে মুনাফিকদের নামাজের বৈশিষ্ট্য উল্লেখিত হয়েছে যে, তারা নামাজে দাঁড়ায় অলসভঙ্গিতে। ইরশাদ হয়েছে- নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করে। আর তিনিও তাদেরকে এর শাস্তি দিয়ে থাকেন। তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন নামাজে দাঁড়ায় অলসভঙ্গিতে। তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে থাকে। -সূরা নিসা: ১৪২

যারা নামাজ পড়ে ঠিকই, কিন্তু অবহেলা ও উদাসীনতার সঙ্গে, তাদের এ নামাজই তাদের জন্যে ধ্বংস ও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সূরা মাউনে ইরশাদ হয়েছে- সে নামাজিদের জন্যে ধ্বংস, যারা তাদের নামাজে গাফলতি করে; যারা নামাজ পড়ে মানুষকে দেখানোর জন্যে। -সূরা মাউন: ৪-৬

আরও পড়ুন: যে ৫ সময়ের দোয়া করলে অবশ্যই তা আল্লাহ মহানের দরবারে কবুল হয়

তাই প্রতিটি মুমিনকে এ বিষয়ে সদাসচেতন থাকতে হবে, যেন তার নামাজে কোনো ধরনের আলসেমি সৃষ্টি হয়ে তা মুনাফিকদের নামাজের মতো না হয়ে যায়। নামাজে অবহেলার কারণে যেন নামাজই আবার ধ্বংসের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

নামাজ হচ্ছে আল্লাহতায়ালার সামনে মানুষের দাসত্ব ও গোলামি প্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম। আল্লাহর সামনে সোজা দাঁড়িয়ে নামাজ শুরুর মাধ্যমে এর সূচনা হয়। আর পরিপূর্ণতা লাভ করে সিজদার মাধ্যমে।

হাদিস শরীফে আছে, বান্দা যখন সিজদাবনত হয়, তখনই সে তার প্রভুর সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসে। -আবু দাউদ ও মুসলিম

কিন্তু এ গোলামি প্রকাশের জন্যে যদি কেউ নামাজে দাঁড়িয়ে ইচ্ছাকৃত নানান বিষয় চিন্তা করতে থাকে, তাহলে তা তো আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। তখন তার এ ইবাদত কবুল হওয়ার কী আশা করা যায়?

বিনয়ের সঙ্গে নামাজ পড়া যদিও নামাজের কোনো ফরজ বিষয় নয়, অর্থাৎ উদাসীনতার সঙ্গে নামাজ আদায় করলেও সে নামাজ আদায়ের ফরজ থেকে নিষ্কৃতি পাচ্ছে; কিন্তু নামাজ আল্লাহর কাছে গৃহীত ও কবুল হওয়ার জন্যে আন্তরিক বিনয় আবশ্যক। এ বিনয়ের সঙ্গে নামাজ আদায় করাই হচ্ছে- মুমিনের সফলতা অর্জনের প্রথম অবলম্বন।

এন এইচ, ৩১ অক্টোবর

Back to top button