কক্সবাজার

শূন্য রেখায় ৪ হাজার রোহিঙ্গার অনিশ্চিত বসবাস

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন

কক্সবাজার, ৩১ অক্টোবর- বাংলাদেশ মিয়ানমার দু’রাষ্ট্রের জিরো পয়েন্টের শূণ্য রেখাটি নো ম্যানস ল্যান্ড নামে পরিচিত। এক পাশে কাঁটাতার অন্য পাশে খাল, মাঝখানে (এপারে) প্রায় ৪ হাজার রোহিঙ্গার অনিশ্চিত বসবাস। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানটিতে কোমলমতি শিশু কিশোররা জানে না তারা কোনদেশে আছে।

জাতিগত পরিচয় আর নাগরিকত্বহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাঝে এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছে বিনোদন কেন্দ্র। মুসলিম বিদ্বেষী মিয়ানমারের সশস্ত্র রাখাইন জনগোষ্ঠী জাতিগত নিধনের ফলে গত ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্টের পর থেকে প্রাণ বাচাঁতে পালিয়ে আসে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের উলুবনিয়া, আনজুমানপাড়া, নলবনিয়া, রহমতের বিল, কাটাখালী, ধামনখালী, ফারিরবিল সংলগ্ন নাফনদী পার হয়ে রোহিঙ্গা পারাপারের ঢল নামে।

২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট থেকে মিয়ানমারের গ্রামেগঞ্জে যখন আগুন জ্বলছিল, অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত রোহিঙ্গা নারী পুরুষ শিশুদের আর্তচিৎকারে যখন আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল, তখন অসহায় রোহিঙ্গারা তাদের প্রিয় মাতৃভূমি, সহায় সম্বল ফেলে চলে আসে এদেশে।

সরকার মানবিক কারণে এসব রোহিঙ্গাদের তাৎক্ষনিকভাবে আশ্রয়ের পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসলেও তা সংকুলনা হচ্ছিল না। পরবর্তীতে সরকারের পাশাপাশি দেশি বিদেশী এনজিও,আইএনজিও রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন।

আরও পড়ুন: টেকনাফে জুতার ভেতর ৫৬ ভরি সোনাসহ একজন আটক

তুমব্রু কোনারপাড়া গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪ হাজারেও অধিক রোহিঙ্গা নারী পুরুষ শিশুসহ কোনার পাড়া সীমান্ত অতিক্রম করে খাল পার হওয়ার চেষ্টা করছিল ঠিক তখনই বাঁধা দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এসব রোহিঙ্গারা আবার ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে অপর দিক থেকে বাঁধা প্রদান করে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)।

রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ জানিয়েছেন, তারা সামনেও এগোতে পারছে না পেছনেও যেতে পারছে না। এমনি এক সংকটময় মুহুর্তে মিয়ানমার বিজিপি ও রাখাইন সন্ত্রাসী জনগোষ্ঠী রাতের আধাঁরে মদ্যপান করে খালি বোতল ও ইট পাটকেল রোহিঙ্গা ঝুপঁড়িতে নিক্ষেপ করায় রোহিঙ্গাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। এসময় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি খালের উপর কাটের সেতু নিমার্ণ করে এসব রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবায় এগিয়ে আসেন। যা এখনো পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।

রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ আরও জানান, তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্ককিং কমিটির এক দল সদস্য পর পর কোনারপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও পরবর্তীতে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানে এসব রোহিঙ্গারা এক বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তারা কোথাও কোন কাজ করতে যেতে পারছেনা। সরকারি ভাবেও চাহিদা মতো সাহায্য সহযোগীতা দেওয়া হচ্ছে না তাদের।

রোহিঙ্গাদের দাবি, তাদেরকে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে অথবা অন্যত্রে সরিয়ে নেওয়া হোক। তাহলে তারা নিজেরাই কাজ কর্ম করে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করতে পারবেন।

শূণ্য রেখায় বসবাসরত স্বামীহীন বিধাব বয়োবৃদ্ধ ছেনুয়ারা বেগম (৬৫) জানায়, দুনিয়াতে তার কেউ নেই। মিয়ানমারের সৈন্যরা তার ছেলে আলমকে গুলি করে চোখের সামনে হত্যা করেছে। এরপর পাড়া প্রতিবেশীর সাথে চলে এসে এ খালের পাড়ে আশ্রয় নিয়েছে। খাওয়া দাওয়া কোথায় থেকে পান জানতে চাওয়া হলে ওই বয়োবৃদ্ধ জানান, কেউ দয়া করে দু’মুঠো দিলে খাই, আর না দিলে উপোস থাকতে হয়।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, চলমান ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গারা ভোটার হওয়ার জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করে আসছিল। এমনকি তারা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকে কৌশলে ভোটার তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ।

সূত্র : প্রতিদিনের সংবাদ
এন এইচ, ৩১ অক্টোবর

Back to top button