জাতীয়

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নয়নই এখন দৃশ্যমান

তাওহীদুল ইসলাম

ঢাকা, ২১ ডিসেম্বর – দেশে যোগাযোগব্যবস্থার অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়নই ২০২১ সালে দৃশ্যমান হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পায়রা সেতু কিংবা কর্ণফুলী টানেল এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ। চালু হয়েছে ছোট-বড় আরও অনেক সেতু-সড়কও। ব্যতিক্রমও আছে; বিশেষ করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যোগাযোগব্যবস্থার অনেক দুর্বলতাও জনগণের সামনে তুলে ধরেছে।

পদ্মা সেতুর কাজ প্রায় শেষ। মেট্রোরেলের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। আগামী জুনে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ার কথা। একই বছরের ডিসেম্বরে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে চলাচল শুরু করতে পারে মেট্রোরেল। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম পাতালপথও (টানেল) চালু হওয়ার কথা আগামী বছরের শেষদিকে। এসব মেগা প্রকল্প চালু হলে দেশের সার্বিক চিত্র বদলে যাবে।

মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের কাজের সার্বিক অগ্রগতি ৭২ শতাংশ। এই প্রকল্প ২ পর্বে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ আগামী বছরের ডিসেম্বরে চালু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড।

২০২১ সালের ২৯ আগস্ট বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ডিপো থেকে বেরিয়ে উড়ালপথে উঠে উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে পল্লবী স্টেশন পর্যন্ত চলাচল শুরু করে মেট্রোরেলের একটি ট্রেন। এ সময় ট্রেনটির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার। এরপর ১২ ডিসেম্বর মেট্রোরেল প্রথমবারের মতো রাজধানীর উত্তরা থেকে আগারগাঁও চলাচল করেছে। পরীক্ষামূলক চলাচলের অংশ হিসেবে ট্রেনটি সেখানে যায়। এদিন সকাল ১০টার দিকে ট্রেনটি আগারগাঁও স্টেশনে এসে থামে। ৪০ মিনিট অবস্থানের পর আবার উত্তরায় ফিরে যায়।

এদিকে যানবাহন চলাচল উপযোগী করতে পদ্মা সেতুর কংক্রিটের স্ল্যাবের ওপর পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। ১০ নভেম্বর বুধবার সকালে জাজিরা প্রান্তের ৩৭ নম্বর পিলারের কাছ থেকে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত পিচ ঢালাইয়ের কাজ চলবে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে পদ্মা সেতুর রোড স্ল্যাবে পিচ ঢালাই হয়। পরে বৃষ্টিসহ নানা কারণে পিছিয়ে যায় পিচ ঢালাইয়ের কাজ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পদ্মা সেতুর স্প্যান বসানো শেষ হয় গত বছরের ১০ ডিসেম্বর। এর পর গত ২৩ আগস্ট মাওয়া প্রান্তের ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর রোডওয়ে স্ল্যাব বসানোর মাধ্যমে শেষ হয় ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাব এবং ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্ল্যাব বসানোর কাজ।

পদ্মা সেতুর পিলারে বেশ কয়েকবার ফেরির ধাক্কা লাগে। গত ২০ জুলাই রো রো ফেরি শাহ মখদুম, ২৩ জুলাই শাহজালাল ফেরি ও ৯ আগস্ট বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর ফেরির পদ্মা সেতুর পিলারের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এর পর গত ১৩ আগস্ট মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাট থেকে ছেড়ে আসা মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাটগামী ‘কাকলী ফেরি’ পদ্মা সেতুর ১০ নম্বর পিলারে পাইল ক্যাপে ধাক্কা দেয়। এসব ঘটনায় সেতুর ক্ষতি হয়নি। বিআইডব্লিউটিএর দাবি, প্রবল স্রোতের কারণে ও চালকের অদক্ষতায় এমনটি ঘটেছে।

এ বছর পটুয়াখালীতে পায়রা নদীর ওপর নির্মিত সেতু উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৪ অক্টোবর গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এই কার্যক্রমে অংশ নেন তিনি। একই সঙ্গে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-তামাবিল উভয় সড়কে পৃথক এসএমভিটি লেনসহ ৬ লেন নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সরকারপ্রধান। পায়রা সেতু চালুর মাধ্যমে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যেতে আর ফেরির দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। আগে যেখানে বরিশাল থেকে কুয়াকাটা যেতে লাগত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। এখন পায়রা সেতু চালুর ফলে লাগবে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। আশা করা হচ্ছে, ফেরিবিহীন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা চালু হলে কুয়াকাটা সমুদ্রবন্দর ও এখানকার পর্যটনের আকর্ষণ বাড়বে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর ইতোমধ্যে তিনটি সেতু নির্মিত হয়েছে। তবে তা যানবাহনের চাপ সামলাতে যথেষ্ট নয়। এর বাইরে কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, একে ঘিরে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। এর মধ্যে মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে। এ জন্য নির্মিত হচ্ছে কর্ণফুলী টানেল। নির্মাণাধীন দেশের প্রথম টানেলের নামকরণ করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। এ বছরই টানেলের কাজ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত ১৮৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের কাজ চলমান। প্রকল্পের অধীনে পর্যটননগরী কক্সবাজারে হচ্ছে ঝিনুক আকৃতির আইকনিক স্টেশন। সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে তিনটি বড় সেতু। সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ায় নির্মাণ হচ্ছে উড়াল সেতু। ফলে পর্যটন শহর কক্সবাজার ও সেখানে নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের পথ সুগম হবে। ২০২২ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো। এরই মধ্যে বন্দরটির কার্যক্রম মোটামুটি মাত্রায় শুরু হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হবে। পায়রা থেকে ঢাকামুখী যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৩ সালের মধ্যে ১৬ মিটার গভীরতায় চ্যানেল ড্রেজিং সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ বন্দর সুবিধা গড়ে তোলা। মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়ায় রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে।

সূত্র : আমাদের সময়
এম এস, ২১ ডিসেম্বর

Back to top button