ব্যবসা

পেঁয়াজে খরচ বাড়ল দৈনিক ১৩ কোটি টাকা

ঢাকা, ১০ ডিসেম্বর – দীর্ঘ সময় ধরে স্থির থাকার পর বাজারে হঠাৎ ‘ঝাঁজ’ বেড়েছে পেঁয়াজের। সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে গতকাল দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৮০ টাকা পর্যন্ত। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আমদানিকৃত পেঁয়াজের দামও। দাম বাড়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা নানা কারণ জানালেও অল্প সময়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ ভোক্তারা।

গতকাল রাজধানীর মালিবাগ বাজারে পেঁয়াজ কিনতে এসে দাম শুনে হতবাক বেসরকারি চাকরিজীবী মো. নজরুল ইসলাম ফরিদ। ফরিদ বলেন, ‘গত শনিবারও ৬০ টাকা কেজি কিনলাম। এখন সে পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকা। দাম বাড়ারও তো একটা সীমা থাকে। পাঁচ দিনের ব্যবধানে ২০ টাকা দাম বাড়ে কীভাবে বুঝে পাই না। সরকারের পক্ষ থেকে এসব নজরদারির জন্য কেউ কি নেই। বাজারে জিনিসপত্রের দাম নিয়ে যা খুশি হচ্ছে। হুটহাট দাম বেড়ে যাচ্ছে। সেটা আমাদের জন্য কতটা সহনীয় তা যাচাইও করা হয় না।’

মালিবাগ বাজারের গাজী স্টোরের ব্যবসায়ী মাসুদ রানা জানালেন, পেঁয়াজের দাম দীর্ঘ সময় ধরে ৫০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে স্থির ছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তিন থেকে চার দফায় দাম ২০ টাকা বেড়েছে। এখনো বাড়ছে। গত শুক্রবার দেশি পেঁয়াজের কেজি ৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে। সোমবারে একই পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৬৫ থেকে ৭০ টাকা কেজি। এর পর বুধবার ৭৫ টাকা এবং গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা কেজি। আড়তে দাম বাড়ার কারণে খুচরাতেও বাড়ছে।

পাইকারিতে দফায় দফায় দাম বাড়লেও সাধারণত খুচরায় তার প্রভাব পড়ে দেরিতে। কিন্তু খুচরায়ও অল্প সময়ে দাম বাড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঘাটতি থাকায় আড়তে চাহিদা মোতাবেক দেশি পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দফায় দফায় কিনতে হচ্ছে আমাদের। তাই খুচরাতেও দামটা সেভাবে বেড়েছে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে ২৪ লাখ টন। অর্থাৎ মাসে চাহিদা রয়েছে ২ লাখ টন এবং দৈনিক চাহিদা ৬ হাজার ৬৬৬ টন (৬৬ লাখ ৬৬ হাজার কেজি)। এ হিসাবে কেজিতে ২০ টাকা দাম বাড়লে প্রতিদিনের মোট চাহিদার পেছনে খরচ বেড়েছে ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ২০০ টাকা। বাড়তি খরচের এ বোঝা নতুন করে চাপে ফেলবে ভোক্তাদের।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা সব সময়ই সুযোগ সন্ধান করেন। বিভিন্ন অজুহাতে বাড়তি মুনাফার ফন্দি আটেন। পণ্য সংকটে দাম বাড়তে পারে, তবে কোনো ব্যবসায়ী এর সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। এক রকম দায়সারা মনিটরিং না করে বাজারে নিবিড় নজরদারি থাকতে হবে। নইলে এর বড় মাশুল দিতে হয় সাধারণ ভোক্তাদের।’

কারওয়ানবাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা নুর ইসলাম বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) এ বাজারের পাইকারিতে আমাদের দেশি পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে ৭২ থেকে ৭৪ টাকা। খুচরা যা বিক্রি করছি ৭৬ থেকে ৭৮ টাকা কেজি।’

মালিবাগের পাইকার প্রতিষ্ঠান খোরশেদ বাণিজ্যালয়ের ব্যবসায়ী মো. শাহবুদ্দীন বলেন, ‘শনিবার পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজের কেজি বিক্রি করছি ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা। এখন সে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর আড়তগুলোতে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ হঠাৎ অনেক হারে কমে গেছে। মজুদও তলানিতে ঠেকেছে। সে কারণে দাম চড়া। নতুন দেশি পেঁয়াজ না উঠা পর্যন্ত দাম এমন চড়াই থাকবে বলে ধারণা করছি আমরা।’

রাজধানীর পেঁয়াজের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার শ্যামবাজারেও দাম এক লাফে অনেকখানি বেড়েছে বলে জানালেন মিতালী বাণিজ্যালয়ের ব্যবসায়ী কানাই সাহা। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জেলার স্থানীয় মোকামে পুরনো দেশি পেঁয়াজ ফুরিয়ে গেছে। ফলে রাজধানীতে বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ অনেক কম আমদানি হচ্ছে। অল্প পরিমাণে যা আসছে, তা বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। তা ছাড়া ভারতীয় পেঁয়াজের দামও একটু বাড়তি। সব মিলিয়ে বাজার এখন চড়া।’

কানাই আরও বলেন, ‘গত সপ্তাহে এ বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা। এখন ৬৫ টাকা কেজি। অনেক আড়তে আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি এখন ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। গত সপ্তাহে ছিল ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।’

শ্যামবাজার পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাজেদ বলেন, ‘আড়তগুলোতে পুরনো দেশি পেঁয়াজ শেষের পথে। রাজধানীতে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। তাই দামটা বেড়ে গেছে। তবে বাজারে অন্য পেঁয়াজের সংকট নেই। কেবল দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ কম।’

মোহাম্মদ মাজেদ বলেন, ‘পেঁয়াজের বর্তমান দামে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই বাজারে নতুন দেশি পেঁয়াজ উঠবে বলে আশা করছি। আরও আগেই উঠত, কিন্তু মাঝে কয়েকদিন বৃষ্টিপাতের কারণে দেরি হচ্ছে।’

কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আগেও দেখেছি সংকটকালে অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে অস্বাভাবিকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। পকেট কাটা হয় ভোক্তাদের। দায়সারা অভিযান ছেড়ে নিবিড় নজরদারি ও তদারকি প্রয়োজন। বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবির পণ্য বিক্রির পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো প্রয়োজন।’

এদিকে বাজারে দাম লাফিয়ে বাড়ায় পেঁয়াজের জন্য টিসিবির ট্রাক সেলে ভিড় আরও বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার টিসিবির ডিলাররা জানান, আগে তেল, ডাল, চিনির চাহিদা বেশি থাকলেও এখন পেঁয়াজেরও চাহিদা বেড়েছে।

গত রবিবার থেকে ৩০ টাকায় পেঁয়াজসহ সাশ্রয়ী মূল্যে তেল, ডাল ও চিনি বিক্রি শুরু করেছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ডিলার ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনতে পারবেন। এ কার্যক্রম চলবে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। শুক্রবার বন্ধ থাকবে।

সূত্র : আমাদের সময়
এম এস, ১০ ডিসেম্বর

Back to top button