জাতীয়

৪০১ ধারায় কী আছে?

কবির হোসেন

ঢাকা, ২১ নভেম্বর – বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে। আলোচনা চলছে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা নিয়েও। এ ধারার অধীনে খালেদার সাজা স্থগিত রেখে শর্তসাপেক্ষে বাড়িতে থাকার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এখন ওই একই ধারার অধীনে খালেদার পরিবার ও বিএনপি সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যেন বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার বলছে, ৪০১ ধারা একবার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, ফলে ওই ধারায় নতুন আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই।

১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী সরকার চাইলে বিনাশর্তে বা শর্তসাপেক্ষে কারও দণ্ড স্থগিত করতে পারে। পরবর্তী সময়ে সরকার স্থগিতাদেশের সময় বাড়াতে পারে। আবার শর্ত ভাঙলে যে কোনো সময় স্থগিতাদেশ বাতিল করে দিতে পারে।

যা বলা আছে ৪০১ ধারায় : ধারা : ৪০১। দণ্ড স্থগিত অথবা মওকুফ করার ক্ষমতা।

(১) কোনো ব্যক্তি কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হলে সরকার যে কোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত ব্যক্তি যা মেনে নেয়, সেই শর্তে তার দণ্ড কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশ বিশেষ মওকুফ করতে পারবেন।

(২) যখন কোনো দণ্ড স্থগিত রাখা বা মওকুফ করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়, তখন যে আদালত উক্ত দণ্ড দিয়েছিলেন বা অনুমোদন করেছিলেন, সেই আদালতের প্রিসাইডিং জজকে সরকার উক্ত আবেদন মঞ্জুর করা উচিত কিংবা মঞ্জুর করতে অস্বীকার করা উচিত, সে সম্পর্কে তার মতামত ও মতামতের কারণ বিবৃত করতে এবং এই বিবৃতির সঙ্গে বিচারের নথির নকল অথবা যে নথি বর্তমানে আছে, সেই নথির নকল প্রেরণ করার নির্দেশ দেবেন।

(৩) যেসব শর্তে কোনো দণ্ড স্থগিত রাখা বা মওকুফ করা হয়েছে, তার কোনোটি পালন করা হয়নি বলে মনে করলে সরকার স্থগিত বা মওকুফের আদেশ বাতিল করবেন এবং অতঃপর যে ব্যক্তির দণ্ড স্থগিত রাখা কিংবা মওকুফ করা হয়েছিল, সে মুক্ত থাকলে যে কোনো পুলিশ অফিসার তাকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারবেন এবং তার দণ্ডের অনতিবাহিত অংশ ভোগ করার জন্য তাকে জেলে প্রেরণ করা যাবে।

(৪) সেই শর্তে এই ধারার অধীন দণ্ড স্থগিত বা মওকুফ করা হয়, যা যে ব্যক্তির দণ্ড স্থগিত বা মওকুফ করা হয়, সেই ব্যক্তি পূরণ করবে অথবা শর্ত এমন হবে যা পূরণে সে স্বাধীন থাকবে।

(৪ক) এই বিধি বা অন্য কোনো আইনের কোনো ধারা অনুসারে কোনো ফৌজদারি আদালত কোনো আদেশ দান করলে তা যদি কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব করে অথবা তার বা তার সম্পত্তির ওপর দায় আরোপ করে, তা হলে উপযুক্ত উপধারাসমূহের বিধান এই আদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

(৫) প্রেসিডেন্টের অনুকম্পা প্রদর্শন, দণ্ড স্থগিত রাখা বা কার্যকরীকরণের বিলম্ব ঘটানো বা মওকুফ করার অধিকারে এই ধারার কোনো কিছু হস্তক্ষেপ করবে বলে মনে করা যাবে না।

(৫ক) প্রেসিডেন্ট কোনো শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা মঞ্জুর করলে উক্ত শর্ত যে প্রকৃতিরই হোক না কেন, তা এই আইন অনুসারে কোনো উপযুক্ত আদালতের দণ্ড দ্বারা আরোপিত শর্ত বলে গণ্য হবে এবং তদানুসারে বলবৎ যোগ্য হবে।

(৬) সরকার সাধারণ বিধিমালা বা বিশেষ আদেশ দ্বারা দণ্ড স্থগিত রাখা এবং দরখাস্ত দাখিল ও বিবেচনার শর্তাবলী সম্পর্কে নির্দেশ দিতে পারবেন।

এই ধারার প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘এই ধারা সরকার প্রয়োগ করে। সরকার যেটা ভালো মনে করবে, সেভাবেই এই ধারার প্রয়োগ করতে পারবে।’ এই ধারা পুনর্বিবেচনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা অবস্থার ওপর নির্ভর করে। সরকার একবার তাকে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। সে ধরনের চিকিৎসা তিনি পাচ্ছেনও। তা হলে বিদেশে যাওয়ার যৌক্তিকতাও দেখতে হবে।’ সব কিছু সরকারের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে বলে মনে করেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী।

সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আপিল বিভাগ পর্যন্ত জামিন না পেয়ে আমরা বলেছিলাম, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া তার জামিন সম্ভব নয়। তখন পরিবারের পক্ষ থেকে একটি আবেদন করা হয়। সরকার তাতে সাড়া দিয়ে শর্তযুক্তভাবে সাজা স্থগিত করে প্রাথমবার ৬ মাসের জন্য খালেদা জিয়াকে বাসায় যাওয়ার সুযোগ দেন। এর পর ৩ বার তার সাজা স্থগিতের মেয়াদ বাড়িয়েছে। এর পর খালেদা জিয়া যখন করোনায় আক্রান্ত হন, তখন তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করলে তাতেও অনুমতি দেওয়া হয়। সরকার তার শর্ত প্রত্যাহার করে তাকে বাসার বাইরে ভর্তি করে চিকিৎসার সুযোগ দিয়েছে। সাজা স্থগিতের শর্ত পুনর্বিবেচানার সুযোগ নেই বলে আইনমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘৪০১ ধারায় যে ক্ষমতা তা সরকার ইচ্ছেমাফিক ব্যবহার করতে পারেন। এ ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার এখতিয়ার কারো নেই। ৪০১ ধারা বার বার বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর অনুমতি দেওয়া সরকারের ওপর নির্ভরশীল।’

দুর্নীতির দুই মামলায় ১৭ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় দুই বছর কারাবন্দি ছিলেন। করোনা মহামারী শুরু হলে ২০২০ সালের ২৪ মার্চ সাজা স্থগিত করে তাকে সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। পরে ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খালেদা জিয়া বাসায় ফেরেন। সে সময় খালেদার মুক্তির বিষয়ে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বয়স বিবেচনায় ও মানবিক কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ সময়ে নিজ বাসায় থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে তাকে। এমনকি বিদেশেও যেতে পারবেন না। খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে করা আবেদনে আইনের ধারা বা বিধানের উল্লেখ ছিল না। সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১/১ ধারার বিধান খতিয়ে দেখে খালেদা জিয়ার পরিবারের করা আবেদন নেয়।

স¤প্রতি খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে জানিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে অনুমতি দিতে দাবি জানানো হচ্ছে। গত ১৬ নভেম্বর সংসদ অধিবেশনে অংশ নিয়ে বিএনপির নারী সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ‘আইনগতভাবে’ তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা মতে এ সুযোগ দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের রয়েছে।’ রুমিনের বক্তব্যের জবাবে সংসদে আইনমন্ত্রী বলেন, তিনি বর্তমানে সাজা স্থগিতপূর্বক বাসায় আছেন, সেটা ৪০১ ধারার ভিত্তিতেই। খালেদা জিয়ার পক্ষে করা আবেদনটি ৪০১ ধারার আলোকেই নিষ্পত্তি হয়েছে। আর একটি আবেদন যে ধারার অধীনে নিষ্পত্তি হয়েছে, একই ধারায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ২১ নভেম্বর

Back to top button