অপরাধ

ওষুধের আড়ালে ভয়ংকর মাদক অক্সি-মরফোন

মো. ফরহাদ উজজামান

ঢাকা, ২১ নভেম্বর – কিছুতেই যেন লাগাম টানা যাচ্ছে না মাদকের। প্রথাগত মাদকের পাশাপাশি নানা নাম ও বৈশিষ্ট্যের দেশি-বিদেশি মাদকদ্রব্য জব্দের খবর প্রায়ই আসে। এক সময় ভাং, আফিম, গাঁজা ইত্যাদির প্রচলন থাকলেও বর্তমানে নানা ধরনের মাদকের ছড়াছড়ি।

নতুন মাদক হিসেবে যোগ হয়েছে এলএসডি, ব্রাউনি বা গাঁজার কেক, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, এমডিএমএ। এবার ব্যথানাশক ওষুধ অক্সি-মরফোন ট্যাবলেট ব্যবহৃত হচ্ছে মাদক হিসেবে। অক্সি-মরফোন হলো মরফিনের একটি এনালগ, যা একটি এনালজেসিক ড্রাগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যমতে, যুবসমাজ বিশেষ করে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে এই মাদকের। অক্সি-মরফোন একটি ইউফোরিক ড্রাগ। যা মস্তিষ্কে প্রচণ্ড আনন্দ অনুভূতি তৈরি করে। শরীরে সাময়িকভাবে দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা ভুলিয়ে দেয়। ব্যথার সিগন্যাল গিয়ে মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করতে পারে না। মস্তিষ্ক বোধহীন, অসাড় হয়ে যায়।

ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে বেশ কয়েকটি চক্র এটিকে মাদক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এসব তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

ব্যথানাশক ওষুধ অক্সি-মরফোন ট্যাবলেট ব্যবহৃত হচ্ছে মাদক হিসেবে। যদিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত মাদকের তালিকায় রয়েছে এই ট্যাবলেটটি।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোর উপপরিচালক মানজুরুল ইসলাম বলেন, অক্সি-মরফোন মাদকটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত মাদক, যেটাকে কন্ট্রোল মাদক বলা হয়। এটা মূলত ক্যান্সার রোগীদের জন্য। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে সাধারণ ওষুধের মতো এই অক্সি-মরফোন বিক্রির সুযোগ নেই।

এর আগে রাজধানীর কোতোয়ালি ও ধানমন্ডি এলাকা থেকে ১৩ হাজার পিস অক্সি-মরফোনসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগ। গ্রেপ্তার দুজন হলো- আলমগীর সরকার ও জাহিদুল ইসলাম। শুক্রবার কোতোয়ালি থানার বাবু বাজার এলাকা ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের ধানমন্ডি শাখায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে ডিবি লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার মো. সাইফুর রহমান আজাদ বলেন, খোলাবাজারে অবৈধভাবে এই অক্সি-মরফোন ট্যাবলেট বিক্রি করে আসছে একটি চক্র। তারা এই ট্যাবলেটের ২০ পিস দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করতো। বাজারে ২০ পিস অক্সি মরফোনের দাম ৪০০ টাকা। বিপুল পরিমাণে ভয়ঙ্কর এই ড্রাগ সংগ্রহ করে মাদকসেবীদের কাছে যত্রতত্র বিক্রয় করতো চক্রটি।

এই মাদকের ভয়াবহতা উল্লেখ করে ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, অক্সি-মরফোন হলো মরফিনের একটি এনালগ, যা একটি এনালজেসিক ড্রাগ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এটি ইনজেকশন থেকে ওরাল ফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে। এটি মূলত কাজ করে ব্রেইনে (সেন্ট্রাল নার্ভ সিস্টেম)। তীব্র ব্যথানাশক হিসেবে ক্যান্সার, হার্ট, দূরারোগ্য রোগে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর তীব্র ব্যথা কমানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এই ব্যথানাশক ট্যাবলেট ব্যাপক আকারে মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি বলেন, মাদকসেবীরা অক্সি-মরফোন গুড়ো করে যেকোন সিরাপ বা পানীয়র সাথে মিশিয়ে খেয়ে থাকে।

এই মাদকের ব্যবহারকারী কারা জানতে চাইলে মো. সাইফুর রহমান আজাদ বলেন, যুবসমাজ বিশেষ করে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের ব্যাপক ব্যবহার গোয়েন্দাদের নজরে এসেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ বিক্রয় ও বাজারজাত করার অনুমোদন দেয়। যা নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে লাইসেন্স দেখিয়ে পরিবহনের রুট প্রদর্শন করে এবং কার কাছে বিক্রি করা হবে তা জানিয়ে গ্রহণ এবং বিক্রি করতে হয়। প্রচণ্ড পরিমাণে ভয়ঙ্কর ড্রাগ হওয়ায় কোম্পানিগুলো তাদের প্রচলিত মার্কেটিং চ্যানেল ব্যবহার করে। তারপরও এতো বিপুল সংখ্যক ড্রাগ আসামিদের কাছে কীভাবে এলো তা তদন্তাধীন রয়েছে।

নির্ধারিত কোম্পানি থেকে এই ট্যাবলেটগুলো অবৈধভাবে আসামিদের কাছে এসেছে। এই ১৩ হাজার ট্যাবলেটের বড় একটা অংশ কুরিয়ারের মাধ্যমে বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছে। যিনি এই ট্যাবলেটগুলো পাঠিয়েছেন তিনি আগের মামলায় পলাতক আসামি। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

অক্সি-মরফোন কারা বিক্রি করতে পারবে জানতে চাইলে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোর উপপরিচালক মানজুরুল ইসলাম বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে দুই ধরনের মাদকের শিডিউল থাকে। একটা কন্ট্রোল মাদক, অন্যটা কন্ডাক মাদক। অক্সি-মরফোন একটি কন্ট্রোল মাদক। কারণ এটা চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটা বিক্রি করতে হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স থাকতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ বিক্রয় ও বাজারজাত করার অনুমোদন দেয়। এই ওষুধ বিক্রি করতে হলে অবশ্যই প্রেসক্রিপশন লাগবে এবং বিক্রির সময় প্রেসক্রিপশনের গায়ে লিখে দিতে হবে ডাক্তার কতোগুলো লিখেছেন এবং রোগী কতোগুলো ওষুধ কিনেছেন। যেন পুরো তথ্য থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা যুবসমাজ ও জাতির ভবিষ্যত ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেসব প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা যেমন বিশেষ প্রয়োজন, তেমনিভাবে আইনি ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিক ও শক্তিশালী করা দরকার।

সূত্র : বাংলাদেশ জার্নাল
এন এইচ, ২১ নভেম্বর

Back to top button