জাতীয়

দেড়শ রেলকোচ কেনার চুক্তি বিধান না মেনেই!

ঢাকা, ২৯ অক্টোবর- দেড়শ রেলকোচ কিনতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার আগে এ সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাবে বিধিবিধান না মানার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওই প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর বিধিবিধান মানেননি। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নির্দেশে এ নিয়ে তদন্ত করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। মাস খানেক আগে প্রতিবেদনও দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা আছে বলেও কারো কারো অভিযোগ। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকেও নানা অভিযোগ আনা হয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ওইসব অভিযোগে প্রকল্প পরিচালকের কাছে কৈফিয়ত তলব করেন রেলওয়ের মহাপরিচালক। অভিযোগ উঠেছে, ২০১৭ সালের ১ জুলাই প্রকল্প অনুমোদন হলেও চুক্তি হতেই তিন বছর পার হয়ে যায় মূলত প্রকল্প পরিচালকের ঢিলেমির কারণে। চুক্তি সই হওয়ার পর প্রকল্পটি কবে বাস্তবায়ন হবে তা-ও নিশ্চিত নয়।

জানা যায়, ১৫০ ক্যারেজ সংগ্রহের দরপত্র আহ্বান করার আগে ‘অফিশিয়াল এস্টিমেট’ সিলগালা করে প্রকল্প পরিচালক নিজ হেফাজতে রাখার নিয়ম আছে। সেটি করতে হয় পিপিআর অনুসারে। প্রকল্প পরিচালক দরপত্র আহ্বানের প্রায় দুই মাস পর এস্টিমেট সিলগালা করেছেন। প্রকল্পে এমন অনিয়ম হওয়ায় বড় দুর্নীতির সুযোগ থাকে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ অনিয়ম তদন্ত করতে নির্দেশ দেয়। এক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। কিন্তু তদন্ত হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে না। প্রকল্প পরিচালকের এ অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইস্পাতের তৈরি ১৫০টি রেলকোচ কিনতে গত ২৯ জুলাই কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ ও ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় ওই চুক্তি হয়েছে। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হলো দক্ষিণ কোরিয়ার সুংশিন আরএসটি-পসকো ইন্টারন্যাশনাল যৌথ কোম্পানি। প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৬৫৮ কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে। চুক্তি সই হওয়ার দিন থেকে ৩০ মাসের মধ্যে কোচগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে সরবরাহ করতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওইসব কোচ কেনার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হলেও এ সংক্রান্ত ক্রয় প্রস্তাবে বিধিবিধান মানা হয়নি যথাযথভাবে। গত ২৪ জুন সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় বিষয়টি উঠে আসে। এজন্য রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) প্রণব কুমার ঘোষকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্য হলো মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আলী কবীর। ক্রয় প্রস্তাব পরীক্ষা করে এর প্রক্রিয়ায় বিধিবিধানে ব্যত্যয় সৃষ্টিকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ১৫ দিনের মধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ক্রয় প্রস্তাব প্রক্রিয়ায় বিধিবিধান না মানার জন্য প্রকল্প পরিচালককে দায়ী করেছে তদন্ত কমিটি।

আরও পড়ুন: কিছুক্ষণ পর স্বাধীনতা পুরস্কার দেবেন প্রধানমন্ত্রী

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির সদস্য, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আলী কবীর বলেন, প্রায় এক মাস আগে আমরা প্রতিবেদন দিয়েছি। এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান বলেন, ‘প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব প্রক্রিয়ায় বিধিবিধান না মানার অভিযোগ তদন্ত করেছে মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার নেই।’

নথিপত্র থেকে জানা গেছে, ইডিসিএফ কোরিয়ার আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ১৫০টি এমজি ক্যারেজ শীর্ষক প্রকল্পের কারিগরি দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন ইডিসিএফ কোরিয়া বরাবর কনকারেন্সের জন্য পাঠানোর আগে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান হোপ-এর কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি ‘দাপ্তরিক শৃঙ্খলার পরিপন্থি’। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় গত ২৯ জুলাই সম্পাদিত চুক্তিপত্র অনুসারে, লেটার অব ক্রেডিট খোলার কমিশন বাবদ নথিতে শূন্য দশমিক ৭০ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সোনালী ব্যাংকের চিঠিতে এলসি খোলার কমিশন বাবদ প্রতি কোয়ার্টার শূন্য দশমিক শূন্য ৭০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালককে পাঠানো কৈফিয়তপত্রে বিষয়টিকে অনিয়ম ঘটানোর অভিপ্রায়, অদক্ষতা এবং কর্তব্যে উদাসীনতার শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান গত ২৩ আগস্ট লিখিতভাবে কৈয়িফত তলব করেন। পরে ২ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ হাসান মনসুর কৈফিয়তের জবাব দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো জবাবে তিনি জানান, ইডিসিএফ কোরিয়ার আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ১৫০টি মিটারগেজ ক্যারেজ সংগ্রহের জন্য টেকনিক্যাল বিড ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট সকল দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরের পর কোরিয়ায় এক্সিম ব্যাংকে পাঠানোর জন্য দরপত্রের তখনকার কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির প্রধানের এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) সৈয়দ ফারুক আহমদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। তার অনুমোদনক্রমে টেকনিক্যাল বিড ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়। তিনি তা পাঠানোর আগে অনুমতি নেওয়ার জন্য হোপ-এর কাছে পাঠাতে পারতেন। এছাড়াও তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের টেকনিক্যাল বিড ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়নি। তখনকার প্রকল্প পরিচালক আবদুল মতিন চৌধুরী এক্ষেত্রে হোপ-এর অনুমোদন নেননি। এ বিষয়ে আবদুল মতিন চৌধুরীকে অনুসরণ করেছেন বলে হাসান মনসুর তার দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। লেটার অব ক্রেডিটের কমিশনের হারের ক্ষেত্রে ভুলক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অঙ্কটি উল্লেখ করেছেন বলে জানান হাসান মনসুর। ভুলটি নিজের দৃষ্টিগোচর না হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন হাসান মনসুর। তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতির জন্য অনুরোধ জানান।

১৫০ রেলকোচ কেনার প্রকল্পে প্রক্রিয়ায়ই তিন বছর পার হওয়ার কারণ জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা হাসান মনসুর বলেন, ‘অনেকগুলো কারণ রয়েছে। বিধিবিধান মানা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিধি মানা না মানা আমি কিছু জানি না। এটা নিয়ে একটি তদন্ত হয়েছে। তদন্ত যিনি করেছেন তার সঙ্গে আলাপ করেন। তদন্তাধীন বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

দক্ষিণ কোরিয়ার এ কোচগুলো রেলবহরে যুক্ত হলে বেশি সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। তাতে করে যাত্রীরা সুফল ভোগ করবে। স্টেইনলেস স্টিল বডির এসব কোচে থাকবে বায়ো-টয়লেট। যুক্ত থাকবে স্বয়ংক্রিয় এয়ার ব্রেক ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় স্লাইডিং ডোরসহ আধুনিক সুবিধা। ১৫০ কোচের মধ্যে থাকছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিপিং বার্থ ৩০টি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচ ৩৮টি, শোভন চেয়ার মোট ৪৪টি, খাবার গাড়িসহ শোভন চেয়ার কোচ ১৬টি, পাওয়ার কারসহ শোভন চেয়ারকোচ ১২টি, রাষ্ট্রীয় পরিদর্শনের জন্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি একটি, খাবার গাড়ি একটি, পাওয়ার কার একটি এবং পরিদর্শন কার একটি।

সূত্র : প্রতিদিনের সংবাদ
এন এইচ, ২৯ অক্টোবর

Back to top button