সম্পর্ক

প্রেম করব কিন্তু বিয়ে করব না!

রনি আর কেয়া (ছদ্মনাম), বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে রনি যখন সহপাঠী কেয়াকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, তখন সে রাজি হয়েছিল এক শর্তে—বিয়ের ব্যাপারে তার নিজস্ব কোনো মত নেই, বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। প্রেমে হাবুডুবু রনি তখন যেকোনো শর্তে রাজি। চতুর্থ বর্ষে এসে কেয়ার বাবা-মা যখন মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই ‘প্রতিষ্ঠিত সুপাত্র’-এর সামনে রনি টিকতে পারল না। কেয়াও বাধ্য মেয়ের মতো বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে রনিকে সেই শর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়।

কেন প্রতিশ্রুতিতে অনীহা?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একসময় প্রেমে জড়িয়ে পড়া মানে ছিল বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হওয়া। সময় বদলেছে। বিশ্বায়নের এই মুক্ত দুনিয়ায় পশ্চিমের হাওয়া ঢুকে পড়েছে এ দেশেও। ফলে কমিটেড বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কের বাইরে এমন সম্পর্কেও মানুষ জড়াচ্ছে, যেখানে আজীবন একত্র বাসের অঙ্গীকার নেই, যেখানে প্রেমের উদ্দেশ্য—পরস্পরের সান্নিধ্যে বর্তমান সময় পার করা।

বিভিন্ন কারণে মানুষ দায়বদ্ধতায় যেতে অনাগ্রহী হয়। বিয়ে শুধু দুটি মানুষের যৌথ জীবনকে বৈধতা দেওয়ার বিধান নয়, বিয়ে দুটি পরিবারের মধ্যে বন্ধনও বটে। বর-কনের পেশাগত-সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ে দুটি মানুষের নিজস্ব জীবনপন্থা পাল্টে দিয়ে নানা রকম দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার ভার চাপিয়ে দেয়। তাই সফল প্রেমিক জুটি সফল দম্পতি না-ও হতে পারেন।

নানা কারণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান বললেন, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ বা কলহপূর্ণ দাম্পত্যের কারণে অনেক সন্তান বিয়ের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। দাম্পত্যের আটপৌরে জীবনে প্রেম মরে যায়—এমন ধারণাও কাউকে কাউকে বিয়েতে নিরুৎসাহিত করে। দুজনের জীবনের গতিপথের ভিন্নতাও কমিটমেন্টে যেতে বাধা দেয়। কেউ কেউ আবার বহুগামিতায় আসক্ত থেকে কোনো একক সম্পর্কে আটকা পড়তে চান না। খুঁতখুঁতে স্বভাবের কারণে অনেকে নিশ্চিত হতে পারেন না তার বর্তমান প্রেমিক বা প্রেমিকাকেই তিনি জীবনসঙ্গী হিসেবে চান কি না। ঘন ঘন পছন্দের পরিবর্তন বা মানসিক অস্থিতিশীলতার কারণেও অনেকে পরিণতির প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সম্পর্কে যেতে ভয় পান।

প্রতিশ্রুতিহীন সম্পর্কে করণীয়
‘ট্রায়াঙ্গুলার থিওরি অব লাভ’ অনুসারে তীব্র আবেগ (প্যাশন), অন্তরঙ্গতা আর কমিটমেন্ট—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একটি সম্পর্ককে পরিপূর্ণতা দেয়। এমনটাই মনে করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি সম্পর্কের পরিণতি প্রত্যাশী হন, কিন্তু অপরপক্ষে অনীহা দেখেন, তবে সে সম্পর্ক ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলা বা সঙ্গীর প্রতি নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনাই ভালো। ভালোবাসার সর্বগ্রাসী প্রকৃতির জন্য আবেগে বাঁধ দেওয়া কঠিন। কিন্তু তা না হলে পরবর্তীকালে হৃদয়ভাঙার কষ্টটা আরও প্রকট হবে। ’

কোন দিকে হাঁটবেন?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুলতানা আলগিন দায়বন্ধতাকে আস্থা হিসেবেই মনে করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৃত, ভালোবাসা থাকলে কমিটমেন্ট থাকবেই। যদি কেউ পারিবারিক, আর্থিক, পেশাগত বা অন্য কোনো কারণে সম্পর্কের পরিণতি দিতে উৎসাহী না হন, তাহলে প্রেমের সম্পর্কে না জড়ানোই ভালো। আর যদি জড়িয়েই যান, তবে দায়িত্ব থাকবে বারবার সঙ্গীকে মনে করিয়ে দেওয়া যে এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব নেই এবং সঙ্গী যেন পরিণতির প্রত্যাশা না করেন। তা না হলে ভুল-বোঝাবুঝির অবকাশ থেকে যাবে।’

কমিটমেন্ট ফোবিয়া বা প্রতিশ্রুতি ভীতি কাজ করলে যেতে পারেন বিশেষজ্ঞের কাছে। যিনি কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মূল কারণ খুঁজে বের করে এই ভীতি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবেন। আর দুজনেরই যদি প্রতিশ্রুতিহীনতায় আপত্তি না থাকে, তাহলে নিজেদের মতো করে চালিয়ে নিতে পারেন ভালোবাসার রোমান্টিক সম্পর্ক। সে ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত না হয়ে সম্পর্কের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ভালোবাসাহীন প্রতিশ্রুতি আর প্রতিশ্রুতি ছাড়া ভালোবাসা
সব সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। প্রতিশ্রুতিহীন সম্পর্ককে সহজ সমীকরণে মেলানো যায় না। এটি অনেক রকম জটিলতা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ডেকে আনে। প্রেম করব কিন্তু বিয়ে করব না, এমন সম্পর্কও যেমন স্থায়ী হয় না, তেমনি আবার ভালোবাসা নেই কিন্তু কথা দিয়ে ফেলেছি—সে সম্পর্কও সুখ বয়ে আনে না। ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতির যুগলবন্দীতে একটি সম্পর্ক পূর্ণ সৌন্দর্যে বিকশিত হতে পারে।

এম এন / ২৯ অক্টোবর

Back to top button