অভিমত/মতামত

আমরা কেন প্রমোশন পাই না?

রাব্বান চৌধুরী

নুতন অভিবাসী হিসাবে যখন আমরা কানাডায় আসি তখন আমাদের নানা রকমের প্রতিকূলতার মধ্যে যেতে হয়। এর ভিতর প্রধান ও অন্যতম সমস্যা হলো একটা চাকরি পাওয়া। এখানে প্রাথমিকভাবে বেঁচে থাকার জন্যে যে কোনো একটা চাকরি পাওয়া যায় তবে আমরা কেউ এখানে আসি না ‘যে কোনো’ চাকরি করার জন্যে, আসি নিজের পড়াশুনা/কাজের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি বিবেচনায় নিজের লাইনে একটা স্বপ্নের চাকরি পাওয়ার আশায়। নুতন দেশে একটা স্বপ্নের সংসার সাজানোর আশায়।

কেউ আগে কেউবা পরে একটা না একটা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য চাকরি পেয়েও যায়। তখন প্রশ্ন আসে – সেই চাকরি দিয়ে একটা আপাত-সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছানো গেলো, তবে জীবন এখানেই শেষ না। মাত্র শুরু। মোটামুটি একটা কেরিয়ারতো করতে হবে। বাড়ি কিনতে হবে, বাচ্চাদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, একটা কমফর্টেবল রিটায়ারমেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু প্যাচটা লাগে তখন যখন দেখা যায় সেই চাকরিতে কোনো উন্নতি নাই, প্রমোশন নাই, ফি বছর বেতন বাড়ে কি বাড়ে না। চাকরি একটা পেতেই না কত কাঠখড় পোড়াতে হয়, সেটা ছেড়ে দ্বিতীয় আরেকটা চাকরির খোঁজ করা, ইন্টারভিউ পাওয়া, ইন্টারভিউতে পাশ করা ও চাকরি পাওয়াটা চাট্টিখানি কথা না এবং তা অনেকের জন্যে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

তখন আমরা বেশিরভাগ লোকই এর কারণ হিসাবে দাঁড় করাই – এরা রেসিস্ট/বর্ণবাদী; এরা কোনোদিন আমাদের উপরে উঠতে দিবে না; আমরা এদের সুক্ষ অথচ সিস্টেমিক রেসিজ্মের শিকার ইত্যাদি ইত্যাদি। তাহলে অন্যান্য সাউথ-এশিয়ানরা কিভাবে আমাদের চেয়ে ঢের ভালো করছে, আর আমরা বাংলাদেশীরা পারছি না? সাদারা কি বাঙালি চিনে? এরা তো ব্রাউন সবাইকেই ইন্ডিয়ান মনে করে। আসলে আমরা পারছি না আমাদের নিজেদেরই অযোগ্যতায়, নিজেদেরই দোষে। চাকরি-প্রমোশন না পাওয়ার পিছনে যতটা না রেসিজম দায়ী তার চেয়ে বেশি দায় আমাদের নিজেদের। রেসিজ্ম যে একেবারে নাই তা বলছি না, কিন্তু নিজের দোষ, অক্ষমতা ও অযোগ্যতা ঢাকার জন্যে সব ক্ষেত্রে রেসিজমকে দায়ী করা আমি মোটেই ঠিক মনে করি না।

এখন সেই অধরা প্রমোশন কিভাবে পাওয়া যায়; আমরা কেন পাই না; সমস্যাটা কোথায়? ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, শ্রীলংকান – সবাই প্রমোশন পায়, ম্যানেজার হয়, ভাইস-প্রেসিডেন্ট হয় কিন্তু আমরা বাঙলিরা কেন পারি না। একেবারে হাতে-গোনা গুটি কয়েক বাঙালি যে উন্নতি করে না তা’ না, কিন্তু আমার দেখা মতে জানা মতে তা’ খুবই নগন্য। আমার কানাডা-আমেরিকায় অনেক দিনের বসবাস ও চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কারণ উল্লেখ করছি এবং কিভাবে এ সমস্যা থেকে উৎরে চাকরিতে উন্নতি করা যায় তার আলোচনা করবো। একান্তই আমার অভিজ্ঞতার আলোকে।

আপনি পড়াশুনা, অভিজ্ঞতা, ইন্টারভিউতে চাপাবাজি ইত্যাদি বিবেচনায় চাকরি একটা পেলেন ঠিক আছে, কিন্তু এর পর প্রমোশন পেতে আপনার বয়স, কাজের লম্বা অভিজ্ঞতা, বড় বড় ইউনিভার্সিটি থেকে আরো বড় বড় ডিগ্রি কিছুই কাজে লাগবে না। আপনাকে যে কাজ দেয়া হয়েছে ওটাতে পারফর্ম করতে হবে মানে ঠিকঠাক মতো করতে হবে। এভারেজ/মিডিওকার পারফর্মেন্স দিয়ে ও কিছু হবে না। আপনাকে সুপারম্যান-এর মতো পারফর্ম করতে হবে। আপনি এভারেজ পারফর্ম করে হয়তো চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারবেন, কিন্তু প্রমোশনের আশা করতে পারেন না।

আবার শুধু সুপার-পারফর্মেন্স দিয়েও প্রমোশন হয় না। সাথে সাথে আপনার বিহেভিওরাল কোয়ালিটি কি আছে সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ সমস্ত দেশে কোম্পানিগুলি কন্সটেন্টলি পরিবর্তিত হতে থাকে। বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যে এদের স্ট্রাটেজিকেলী-এজাইল হতে হয়। এতে কোম্পানির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব স্তরেই কাজের ধরণ-ধারণ অতি দ্রুত পাল্টায়। আপনি যে স্তরেই কাজ করুন না কেন আপনাকে সেই পরিবর্তনগুলোকে পজিটিভলি নিতে হবে। কোম্পানির চাওয়া মাত্রই আপনাকে চেষ্টা করতে হবে অতি দ্রুত মানিয়ে নেয়ার জন্যে। অনেকে আছেন পরিবর্তন গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক অথবা পরিবর্তনে অখুশি। অনেকে সারাক্ষন কমপ্লেইন করে বেড়ায়, নুতন নিয়মের সমালোচনা করে। এমনকি কো-ওয়ার্কারদের সাথে বলে বেড়ায় – ম্যানেজার কিছু জানে না, ম্যানেজমেন্ট কি একটা বাজে সিদ্ধান্ত নিলো ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যাপারটা যদি এই হয় আপনি সুপার পারফর্ম করলেও ম্যানেজমেন্ট আপনাকে জীবনেও প্রমোশন দিবে না। চিন্তা করে দেখেন – আপনি মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার কোম্পানিতে চাকরি করেন। যে সমস্ত লোক এই কোম্পানি চালায় তারা আপনার চেয়ে বেশি জানে। আপনি দেশে কি ছিলেন, কত বড়ো চাকরি করতেন- এসমস্ত ইগোকে আপনার সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে, ভুলে যেতে হবে। আপনার টোটাল-মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে।

আপনি যদি চাকরিতে ভালো করতে চান, প্রমোশন পেতে চান কোম্পানি-মেনেজমেন্টের সমালোচনা, ম্যানেজারের বদনাম ইত্যাদি বেমালুম ভুলে যেতে হবে। উল্টা আপনাকে মেনেজমেন্টের যে কোনো সিদ্ধান্তের পজিটিভ দিক গুলি বের করে প্রশংসা করতে হবে। আপনাকে প্রোএক্টিভে হয়ে ওই সমস্ত চেইঞ্জ/সিদ্ধান্ত আপনার কলিগদের কাছে প্রমোট করতে হবে। কলিগদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাহায্য করতে হবে যাতে তারা এই চেইঞ্জগুলি তাড়াতাড়ি এডপ্ট করতে পারে। এটা হলো ম্যানেজারিয়াল/লিডারশীপ কোয়ালিটির একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক। দিনের পর দিন যখন এটা করতে থাকবেন তখন আপনি ম্যানেজমেন্টের নজরে আসবেন।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ চাকরিতে, বিশেষ করে প্রাইভেট সেক্টরে ৩/৪ বছর পর পর প্রমোশন হয়, না হলেও আমরা অন্তত আশা করি। কিন্তু সে প্রোমোশনের পর আপনার কাজের দায়িত্বের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা মোটামুটি একই কাজ করি – কিন্তু আমরা অফিসার, সিনিয়র অফিসার, ম্যনেজার, এজিএম-ডিজিএম কত কিছু হই। এদেশের ম্যানেজমেন্ট স্টাইল ভিন্ন। এখানে একটা পজিশন/পদ খালি হলে, সেই পদে একটা লোক নেয়া হয়। শুধু প্রমোশনের খাতিরে প্রমোশন হয় না। ধরুন আপনি বিজনেস-এনালিস্ট হিসাবে একটা চাকরি শুরু করলেন। আপনার টিমে দশজন এনালিস্ট আছে এবং একজন ম্যানেজার। আপনার ওই ম্যানেজার যতদিন সেই পদে থাকবেন, আপনি অথবা ওই টিমের কেউ জীবনে ম্যানেজার হবেন না, সারাজীবন আপনি এনালিস্ট হিসাবে থাকবেন। প্রমোশানের জন্যে পদতো খালি হতে হবে। শুধু ভিজিটিং-কার্ড বানানোর জন্যে এখানে প্রমোশন হয় না। তবে অবশ্যই আপনার জন্যে প্রমোশনের অথবা কোম্পানির ভিতরে লেটারাল-মুভমেন্টের সুযোগ সুবিধা থাকবে। তাও নির্ভর করে কোম্পানি-সাইজ, কোম্পানি-কালচার ইত্যাদির উপর।

আপনার জব-ডেস্ক্রিপশনের বাইরেও আপনাকে অনেক কিছুতে ইনভল্ভ হতে হবে। সোশ্যাল কমিটি, জব-রিলেটেড কোনো টেকনিকেল কমিটি, অ্যানুয়াল কোম্পানি-পার্টি ইত্যাদিতে কমিটি-চেয়ার অথবা অন্যান্য কেপাসিটিতে কাজ করার সুযোগ থাকে। এই সব কাজে নিজেকে ইনভল্ভ করা, লিডারশিপ রোল নেয়া এখানকার কোম্পানিগুলিতে কেরিয়ার বিল্ড করার জন্যে খুবই দরকার। এগুলি হলো ভলান্টিয়ার কাজ। এসবের জন্যে আপনাকে টাকা-পয়সা অথবা ওভার-টাইম দেয়া হবে না।

এখানে টিম-লিডার অথবা ম্যানেজারদের পিপল-ম্যানেজার বলা হয়। এটার মানে আপনি আপনার কাজে যতই এক্সপার্ট হোন না কেন, আপনার যত বড়ো ডিগ্রি থাকুক না কেন, আপনি অনেক বছরের সিনিয়র হন না কেন – আপনার যদি পিপল-ম্যানেজার হওয়ার যোগ্যতা না থাকে তাহলে আপনাকে কোনোদিন কোন লিডারশিপ রোলে প্রমোশন দিবে না। এ সমস্ত দেশে সিনিয়রিটির কোনো মূল্য নেই। সরকারি চাকরিতে কোনো কোনো জায়গায় থাকলেও থাকতে পারে, আমি জানি না, যদিও না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সিনিয়রিটি কাজে লাগে শুধু ছুটি-ছাটা, স্কেজ্যুল ইত্যাদির ক্ষেত্রে। প্রোমোশনের ক্ষেত্রে মোটেই না, বরং মনে করবেন যত বেশি সিনিয়র হবেন আপনার মূল্য ততো বেশি কমতে থাকবে।

পিপল-ম্যানেজার হওয়ার অন্যান্য গুণাবলী, যেটা ম্যানেজমেন্ট আপনার ভিতর দেখতে চায় – আপনার পার্সোনালিটি কতটা ফ্রেন্ডলী, কোলিগদের ভিতর আপনার কতটা এক্সেপ্টেন্স আছে, আপনি কি প্রব্লেম-সল্ভার নাকি প্রব্লেম ক্রিয়েটর ইত্যাদি। আর কিছু বেসিক লিডারশিপ কোয়ালিটিতো আপনার থাকতেই হবে – আমরা সবাই এগুলি জানি বলে আমি বিস্তারিত বলছি না, যেমন – ইংরেজিতে কমিউনিকেশন স্কিল, প্রেসেন্টেশন স্কিল ও পাবলিক স্পিকিং স্কীল। সোজা কথা ম্যানেজমেন্টের আপনার উপর কনফিডেন্স আসতে হবে আপনি টিম লিড করতে পারবেন কিনা। মনে রাখবেন আপনার টিমে আর যে দশ /পনেরো জন কাজ করছে তারাও আপনার মতো কোয়ালিফাইড। সুতরাং আপনাকে এদের সবার চাইতে সবকিছুতে এগিয়ে থাকতে হবে।

ম্যানেজমেন্ট চায় রেজাল্ট। কোয়ার্টার শেষে তারা চাইবে ম্যানেজার হিসাবে আপনার টিমের মেট্রিক্স কি। বিভিন্ন প্যারামিটারে আপনার শতকরা বৃদ্ধি কতো। দিনশেষে তারা কেয়ার করে শুধু নাম্বার। আপনি সাদা, কালো না বাদামি তাদের কাছে মোটেই মেটার করে না, আপনি যদি নাম্বার প্রডিউস করতে পারেন। তারা চায় আপনি ম্যানেজার হিসাবে টিমকে কতটা মোটিভেট করে প্রোডাকশন বাড়াবেন। এই প্রোডাকশন নাম্বারের উপর ভিত্তি করে কোম্পানির সব কিছু ঘুরপাক খায়। ম্যানেজার নাম্বার প্রডিউস করলো’তো তার বাৎসরিক বোনাস নিশ্চিত হলো। যত বড়ো নাম্বার ততো বেশি বোনাস। সাথে সাথে বসের-বস-বসের-বস সবার বোনাস নিশ্চিত হলো। বিগ বসদের চার্টার্ড প্লেনে সুদূর কোনো এক আইল্যান্ডে কনফারেন্স-কাম প্রমোদ ভ্রমণ নিশ্চিত হলো। কোয়ার্টার শেষে বিগ-নাম্বার মানে স্টকমার্কেটে কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে গেলো। চেয়ারম্যান-সিইওদের চাকরির মেয়াদ আরো বৃদ্ধি পেলো ও মিলিয়নস-অফ-ডলারের নুতন চাকরি-চুক্তি হলো।

বাংলাদেশিদের আত্মাভিমান ও আত্মসম্মানবোধ প্রখর। এর প্রখরতা একটু বেশিই। আমাদের দায়িত্ববোধ ও প্রশ্ন সাপেক্ষ। আমরা সহজে নিজের দায়-দায়িত্ব শিকার করতে চাই না ও কোনো দোষ করলে তার দায় নিতে অপরাগ। ঠিক তেমনি চাকরি না পেলে, প্রমোশন না পেলে আমাদের অটোমেটিক-জাস্টিফিকেশন হলো আমরা বর্ণবাদের শিকার। বর্ণবাদ আছে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের চাকরি না পাওয়া, প্রমোশন না পাওয়ার জন্যে আমাদের নিজেদের অযোগ্যতা ও অক্ষমতাই দায়ী। অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির ইমিগ্রান্টরা কিভাবে বাংলাদেশিদের তুলনায় ভালো করছে? বর্ণবাদ এদের জন্যে প্রযোজ্য না? আমাদের অনেস্টলী ও অব্জেক্টিভলি ব্যাপারটা ভেবে দেখতে হবে। আমাদের কোয়ালিটি আছে। তবে আমাদের মাইন্ডসেট চেইঞ্জ করতে হবে। এখানকার এমপ্লয়াররা কি চায় তা ভালোভাবে বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরী করতে হবে। তাইলেই আমরা সফল হবো। ধন্যবাদ।

উইটবি, অন্টারিও

এন এইচ, ০৬ নভেম্বর

Back to top button