শিক্ষা

নতুন পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে চার সংকট

মুসতাক আহমদ

ঢাকা, ০৪ নভেম্বর- আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে চার ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের নতুন বইর বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রেসের সঙ্গে চুক্তিই শেষ হয়নি। বাজারে নেই এমন কাগজে প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানোর শর্ত দেওয়া হয়েছে। ফলে একটি বইও ছাপা হয়নি। এছাড়া গত বছরের বকেয়া বিল ও মামলার কারণে বই ছাপার বিষয়টি দেরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে এ তথ্য জানা গেছে।

অবশ্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, পাঠ্যবই নিয়ে প্রতিবছরই সংকটের কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বই পেয়ে যায়। প্রাথমিকের বই পুরোদমে মুদ্রিত ও সরবরাহ হচ্ছে। মাধ্যমিকের বেশিরভাগ বইয়ের চুক্তি শেষ হয়েছে। কিছু বই সরবরাহও হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তর নিয়ে যে সমস্যা, তা দু-একদিনের মধ্যে কেটে যাবে। প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এবার প্রায় ৩৫ কোটি বই ছাপানো হচ্ছে। এরমধ্যে প্রাথমিকে ১০ কোটি আর মাধ্যমিকে ২৫ কোটি। সাধারণত ১ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়া হয়। সেই হিসাবে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি আছে ৫৭ দিন। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যথাসময়ে কিছুতেই বই পৌঁছানো সম্ভব হবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্য যে সংকটের শঙ্কা করা হচ্ছে এর দায় এনসিটিবিরই। মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া দেরিতে করা হয়। সে অনুযায়ী, মুদ্রাকররা ৯ নভেম্বর এ বই ছাপানোর ব্যাপারে এনসিটিবির সঙ্গে চুক্তি হবে। দরপত্রে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপাতে চুক্তির পর ৭০ দিন আর অষ্টম-নবম শ্রেণির বইয়ের জন্য ৮৪ দিন দেয়া হবে। এ হিসাবে প্রথম দুই শ্রেণির বই সরবরাহে মুদ্রাকররা মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত সময় পাচ্ছেন। আর পরের দুই শ্রেণির বই ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পৌঁছায়। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এ স্তরে এবার ১ জানুয়ারির মধ্যে বই কিভাবে পৌঁছাবে।

মুদ্রণের দিক থেকে প্রাথমিক স্তর ভালো অবস্থানে আছে বলে জানা গেছে। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৩০ শতাংশ মুদ্রণ হয়েছে। এসব বই সংশ্লিষ্ট উপজেলার পথে আছে। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বই আটকে গেছে। এই স্তরে এবার জীবনে প্রথম স্কুলে যাবে প্রায় ৩৪ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের জন্য অনুশীলন গ্রন্থ বা হাতের লেখার খাতা ‘এসো লিখতে শিখি’ এবং পাঠ্য ‘আমার বই’ ছাপানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। অনুশীলন গ্রন্থ ইতোমধ্যে মুদ্রাকররা সরবরাহ করেছেন। কিন্তু আটকে গেছে পাঠের বইটি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) থেকে বুধবার এনসিটিবিতে পাঠানো একটি চিঠির সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আমার বই মুদ্রণের জন্য এবার আটটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য (প্যারামিটার) নির্ধারণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে ‘গ্লোস’ (চকমক বা ঝিলিক দেওয়ার ক্ষমতা) ৪০ জিইউ নির্ধারণ করা হয়। গত দশ বছর ধরে এই শর্ত ছিল না। কেননা, এই স্তরের বইটি ছাপানো হয় ‘হোয়াইট গ্লোসি প্রিন্টিং পেপারে’। এর পুরত্ব ৮০ শতাংশ, উজ্জ্বলতা ৮৫ শতাংশ, উড-ফ্রি পাল্পসহ ৭টি শর্ত আরোপ করা হয়। সাধারণত আর্ট পেপার বা আর্ট কার্ডে গ্লোস শর্ত থাকে। অর্থাৎ অবাস্তব শর্ত জুড়ে দেয়ায় মুদ্রাকররা বাজারে কাগজ পাচ্ছেন না। এ কারণে সরবরাহের দিন শেষ হয়ে গেলেও একটি বইও কেউ ছাপাতে পারেননি।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুরুল ইসলাম বলেন, তারা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎসে খোঁজ নিয়েও এনসিটিবির নির্ধারিত প্যারামিটারের কাগজ পাননি। বিগত দিনে এ নিয়ে একাধিকবার ধরনা দেওয়া সত্ত্বেও এনসিটিবির দায়িত্বপ্রাপ্তরা সমস্যা নিষ্পত্তি করেননি। ফলে সবার আগে দরপত্র দেয়া হলেও এই কাজ শেষ হয়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, মূলত অবাস্তব শর্ত দিয়ে কাগজের মান নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে হয় এনসিটিবি ভুল করেছে নতুবা কোনো দুরভিসন্ধি আছে। যদি ভুল হয় তাহলে এখন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এ কারণে তারা ভুল শিকার না করে মুদ্রাকরদের ওপর দায় চাপিয়ে এখন তারা পুনঃদরপত্রে যেতে চাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা ৪০ গ্লোস ঠিক রাখতে ‘বাল্ক’ এবং ‘অপাসিটি’ নামে শর্তের সঙ্গে আপস করতে চাচ্ছে। এতে কাগজের মান কমে যাবে। ফলে শিশুরা নিুমানের বই পাবে। বিষয়টি বলার পরও এনসিটিবি মানছে না। এ ক্ষেত্রে দুরভিসন্ধি আঁচ করা যাচ্ছে। হয়তো তারা বিদেশিদের হাতে কাজ তুলে দিতে চায়।

এদিকে বইটি নিয়ে এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ডিপিই হস্তক্ষেপ করেছে। বুধবার সংস্থাটি একটি চিঠি পাঠায় এনসিটিবিতে। এতে তিনটি নির্দেশনা দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে-নির্ধারিত কাগজে বই মুদ্রণের মহড়া (ট্রায়াল) দেয়া, (মুদ্রাকরদের) নমুনা কাগজ সরবরাহ এবং কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন ২০০৮ সালের পিপিআর অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এ স্তরের কাজ পেয়েছে ৫টি প্রতিষ্ঠান।

এগুলোর একটির স্বত্বাধিকারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, এনসিটিবি যে শর্ত আরোপ করেছে বাজারে সেই বৈশিষ্ট্যের কাগজ নেই। তাই তারা নমুনা সরবরাহ করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে ৪০ গ্লোস বহাল রাখতে হলে অন্য বৈশিষ্ট্য কমাতে হবে। অন্যথায় গ্লোস শর্ত বাতিল করতে হবে। যেহেতু বাজারে একইমানের কাগজ নেই, তাই এনসিটিবি এখন নড়েচড়ে বসেছে। বুধবার এ নিয়ে বৈঠক হয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

এ ব্যাপারে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, প্রাক-প্রাথমিকের বই নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দুটি নীতি গ্রহণ করার চিন্তা হচ্ছে। ‘গ্লোসনেস’ ঠিক রেখে অন্য প্যারামিটারের সঙ্গে আপস করা হবে। যদি এটা পারা না যায় তাহলে পুনঃদরপত্র দেওয়া হবে। তবে এর উদ্দেশ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া- এমন অভিযোগ সঠিক নয়। কেননা, উন্মুক্ত দরপত্রে সবাই অংশ নেবে। এছাড়া অন্য কোনো অভিযোগও সঠিক নয়।

তবে চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন মুদ্রাকররা। মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে, এখনো মাধ্যমিক স্তরের ৪৮ শতাংশ বই ছাপানোর চুক্তিই হয়নি। চুক্তির পর আরও ১৫ দিন সময় পাওয়া যায় কার্যাদেশ গ্রহণের জন্য। এ স্তরে ২৫ কোটি বই। সেই হিসাবে ১০ কোটি বই নিয়ে সংকট হতে পারে। আর যেগুলোর চুক্তি হয়েছে সেগুলো সরবরাহের শেষ সময় মধ্য জানুয়ারি। তাহলে ১৫ দিন আগে এনসিটিবি বই চাইবে কিভাবে।

অন্যদিকে প্রাথমিকের বই ১০ কোটির মধ্যে ২ কোটির মতো সরবরাহ হয়েছে। দ্বিতীয় হচ্ছে, প্রাক-প্রাথমিকের বই পুনঃদরপত্র করা সব কাজ প্রতিবেশী দেশের মুদ্রাকররা পাবেন। কেননা, গ্লোসি কাগজে বই ছাপানোর মেশিন বাংলাদেশে নেই-তা এনসিটিবি জানে। চেয়ারম্যানের অবসর ডিসেম্বরে। যাওয়ার আগে তিনি দেশীয় শিল্পবিরোধী একটি কাজ করে যেতে চাচ্ছেন। দেশে শত শত মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান আছে। করোনায় ১০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। এবার কাজ করতে না পারলে আরও ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে যাবে।

সূত্র: যুগান্তর
এম ইউ/০৪ নভেম্বর ২০২১

Back to top button