জাতীয়

পূজামণ্ডপ, মন্দিরে হামলা: ১৬ জেলায় প্রায় ২৪ হাজার আসামি

ঢাকা, ২৫ অক্টোবর – কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে সম্প্রতি দেশের ১৬ জেলায় হিন্দুদের বাড়িঘর, পূজামণ্ডপ, মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার ঘটনায় দায়ের করা ৮৫টি মামলায় ২৩ হাজার ৯১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামি ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী রয়েছেন। আবার রাজনৈতিক পরিচয় নেই, এমন অনেককে এসব মামলায় আসামি ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে প্রায় ২৪ হাজার আসামির বেশির ভাগই অজ্ঞাতনামা বলে মামলার এজাহার পর্যালোচনায় দেখা গেছে। প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

আসামিদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা–কর্মীও আছেন

চাঁদপুর, নোয়াখালী, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ফেনীতে দায়ের করা মামলাগুলোতে আসামির নামের তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী আছেন। এর মধ্যে বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীই বেশি। আবার গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যেও বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মী রয়েছেন। রংপুরে গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে ছাত্রলীগের এক নেতা রয়েছেন।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে পূজামণ্ডপে ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াত নেতা ও সাবেক শিবির সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন আব্বাসিকে (৪০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা তিনি স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, হাজীগঞ্জের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০টি মামলা নেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৫ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ঘটনার পর থেকে জামায়াত নেতা কামাল উদ্দিনসহ ৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের সবাই এখন জেলহাজতে আছেন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে হামলা-ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় চৌমুহনী পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) জামাল হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। ওই মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লাকেও হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে জেলা যুবদলের সভাপতি মঞ্জুরুল আজিম ওরফে সুমনসহ দলের ১০-১২ জন নেতা-কর্মীকে।

মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, নোয়াখালী-৩ আসনের সাবেক সাংসদ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা তাঁর অনুগত স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনগণের সঙ্গে বিভিন্ন
মাধ্যমে প্রচার করে হামলায় ইন্ধন দেন বলে স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতি রয়েছে।

মামলার আসামি জেলা যুবদলের সভাপতি মঞ্জুরুল আজিম বলেন, তিনি চৌমুহনীতে হামলা-ভাঙচুরের আগের দিন (১৪ অক্টোবর) আদালতে হাজিরা দিয়ে ঢাকায় চলে যান। সেই থেকে তিনি ঢাকায় আছেন। পরে জানতে পারেন, ১৫ অক্টোবর চৌমুহনীতে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁকেও আসামি করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

১৬ জেলায় প্রায় ২৪ হাজার আসামি
এ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী আবদুর রহমান বলেন, মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনার পর ক্ষমতাসীন দলের ইন্ধনে পুলিশ বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে একের পর এক মামলা দিচ্ছে। এতে মন্দিরে হামলাকারী প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে চলে যাচ্ছে। আর বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

রংপুরের পীরগঞ্জে মাঝিপাড়া গ্রামের বড়করিমপুর এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে ছাত্রলীগের এক নেতা ও মসজিদের একজন মুয়াজ্জিন রয়েছেন। গতকাল রোববার তাঁরা দুজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে পীরগঞ্জে সহিংস ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। ছাত্রলীগ নেতা সৈকত মণ্ডল কারমাইকেল কলেজের দর্শন বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত। অন্যদিকে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার রবিউল ইসলাম রামনাথপুর ইউনিয়নের বটেরহাট জামে মসজিদের ইমাম।

পীরগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, পীরগঞ্জে সহিংসতার ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পৃথক তিনটি মামলা এবং একটি অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় পূজামণ্ডপে হামলা ও তোরণ ভাঙচুরের ঘটনায় পৃথক সাতটি মামলায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির জাফর সাদেক, বাঁশখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান, হাটহাজারী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম চৌধুরীসহ বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম নগরের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে তোরণ ভাঙচুরের মামলায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন যুব ছাত্র অধিকার পরিষদের ১০ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, তাঁরা পরিকল্পনা ও হামলাকারী। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষ, প্রতিবন্ধীও আসামি

ফেনীতে চারটি মামলায় ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে একজন যুবদল, অপরজন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। বাকি ১৬ জন হলেন ফেনী পৌরসভার মধ্যম রামপুর গ্রামের আহনাফ তৌসিফ মাহমুদ লাবিব (২২), ফেনী সদর উপজেলার দক্ষিণ লেমুয়া গ্রামের মেহেদী হাসান মুন্না (২২), পৌরসভার মাস্টারপাড়ার আবদুল মান্নান (৪৬), ফেনী সদর উপজেলার পূর্ব মোটবী গ্রামের এনামুল হক রাকিব (২০), ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দক্ষিণ ডেমরা এলাকার মো. মিরাজ (৩৩), কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার আমান সরকার বাজার এলাকার ফয়সল আহম্মেদ আল আমিন (১৯), ফেনীর পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের আবদুস সামাদ জুনায়েদ (১৯), লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মাওলানা পাড়ার মো. সোহেল (২৬), ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন (৩২), সাইফুল ইসলাম (৩৮), বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের মো. রোমন শেখ (১৬), তৌহিদুল ইসলাম জিদান (১৯), নোয়াখালীর সেনবাগের আবদুল্লাহ আল মিয়াজী (১৯), ফেনী পৌরসভার শান্তি কোম্পানি রোডের আজিম শরিফ (২৮) ও হাজারী রোডের ছাইদুল ইসলাম (২৯)।

জানতে চাইলে ফেনী সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনির হোসেন বলেন, তদন্ত চলছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার আসামিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। তবে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার আসামিদের কারও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা পরিচয় জানা যায়নি।

তবে ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন দাবি করেন, তাঁদের দলের অঙ্গসংগঠন ফেনী পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছয়েদুল ইসলাম ও পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিম শরিফকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ফলে অন্য নেতা-কর্মীরাও আতঙ্কে রয়েছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনায় জড়িত প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি করেন। এ জেলায় চার মামলায় ৬৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১৮ জন।

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বার্থী ইউনিয়নের ধুরিয়াইল শ্রীশ্রী কাজীরপাড় সর্বজনীন মন্দিরে হামলার অভিযোগে এক প্রতিবন্ধীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারে ওই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রতিমা ভাঙচুর করে দৌড়ে পালিয়ে গেছেন—এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: প্রথম আলো
এম ইউ/২৫ অক্টোবর ২০২১

Back to top button