সচেতনতা

ফিস্টুলা কী, কারণ ও প্রতিকার

ফিস্টুলা মলদ্বারের একটি জটিল রোগ। এটি ভগন্দর নামেও পরিচিত। মলদ্বারের ভেতরের সঙ্গে বাইরের নালি তৈরি হওয়াকে বলা হয় ফিস্টুলা। এটি অতি প্রাচীন রোগ।

ফিস্টুলার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে যুগান্তরকে পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. একেএম ফজলুল হক। তিনি বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ।

এ রোগটির উৎপত্তি হয় মলদ্বারের বিশেষ ধরনের সংক্রমণের কারণে। মলদ্বারের ভেতরে অনেক গ্রন্থি রয়েছে, এগুলোর সংক্রমণের কারণে ফোড়া হয়। এই ফোড়া একসময় ফেটে গিয়ে মলদ্বারের চতুর্দিকের, কোনো একস্থানে একটি ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে আসে এবং পুঁজ নির্গত হতে থাকে। এ সংক্রমণের কারণে মলদ্বারে প্রচুর ব্যথা হয়। রোগী সারা দিন ব্যথায় কাতরাতে থাকেন। পুঁজ বের হওয়ার পর ব্যথা কমতে থাকে। মলদ্বারে পার্শ্বস্থিত কোনো স্থানে এক বা একাধিক মুখ দিয়ে মাঝেমধ্যে পুঁজ বের হয়ে আসাকে আমরা ফিস্টুলা বা ভগন্দর বলে থাকি।

মলদ্বারের ক্যান্সার এবং বৃহদন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগেও ফিস্টুলা হয়ে থাকে। মলদ্বারে যক্ষ্মার কারণেও ফিস্টুলা হতে পারে।

প্রকারভেদ

ফিস্টুলা দুই প্রকার—

সাধারণ ফিস্টুলা : এটি মলদ্বারের মাংসপেশির খুব গভীরে প্রবেশ করে না, বিধায় চিকিৎসা সহজসাধ্য।

জটিল ফিস্টুলা : এর বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে এবং তা নির্ভর করে এর নালিটি মলদ্বারের মাংসের কতটা গভীরে প্রবেশ করেছে এবং কতটা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এটি বাইরের মুখ পর্যন্ত এসেছে। এগুলোর চিকিৎসা সত্যিকার দুঃসাধ্য। তার পর যদি এ নালি একের অধিক হয় তা হলে তো আর কথাই নেই। এ রোগের অপারেশনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো সঠিকভাবে অপারেশন সম্পাদন করতে ব্যর্থ হলে রোগী মল আটকে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে।

ফিস্টুলা বা ভগন্দরের লক্ষণ বা উপসর্গ
এ রোগের লক্ষণ মূলত তিনটি। যেমন- ১. ফুলে যাওয়া, ২. ব্যথা হওয়া এবং ৩. নিঃসরণ বা পুঁজ ও আঠালো পদার্থ বের হওয়া।

বেশিরভাগ রোগীই আগে মলদ্বারে ফোড়া হয়েছিল বলে জানান। ভেতরে ফোড়া হাওয়ার জন্য ফুলে যায় এবং ব্যথা হয়। যখন এগুলো ফেটে মুখ দিয়ে কিছুটা পুঁজ বের হয়ে যায় তখন ব্যথা এবং ফোলা কমে যায়। নিঃসরণ বা পুঁজ পড়া সাধারণত মাঝে মাঝে হয়। কখনও কখনও ২-৪ মাস রোগটি সুপ্ত থাকে।

কখনও কখনও মলের সঙ্গে পুঁজ ও আম পড়তে থাকে। সমস্যা একটানা না থাকার কারণে রোগীরা অনেক সময় ভাবেন যে সম্ভবত ভালো হয়ে যাব। কিন্তু দু’চার মাস পর আবার যখন একই সমস্যা দেখা দেয় তখন আবার আমাদের কাছে এসে বলে স্যার এখন কি করা যায়?

কী কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন
* প্রক্টস্কোপি, সিগময়ডসকপি
* কোলনস্কপি
* বেরিয়াম এক্সরে
* ফিস্টুলো গ্রাম : খুব একটা অবদান রাখতে পারে না। মলদ্বারের ভেতরে আঙুল দিয়ে পরীক্ষা করাটা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
* এনাল এন্ডোসনোগ্রাফি।

অস্ত্রোপচার
বর্তমানে ফিস্টুলা চিকিৎসার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত অপারেশন পদ্ধতিগুলো হচ্ছে-

* ফিস্টুলোটোমি। * ফিস্টুলেকটোমি। * সিটন পদ্ধতি। * ফিস্টুলা প্লাগ। * ফিস্টুলা গ্লু। * ফ্ল্যাপ ব্যবহার। * রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার। * লেজার ব্যবহার। * স্টেম সেল ব্যবহার। * মলদ্বারের মাংসপেশির মাঝখানের নালি বন্ধ করে দেওয়া। * এন্ডোস্কোপিক ফিস্টুলা সার্জারি।

এগুলোর মধ্যে প্রথম তিনটি বহুল ব্যবহৃত। বাকিগুলো বিশেষ ক্ষেত্রে কিংবা অতিজটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। পদ্ধতি যাই হোক না কেন, ফিস্টুলার চিকিৎসার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয় যেমন- সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ফিস্টুলা নালিটি বন্ধ করা এবং মল ধরে রাখার ক্ষমতা বজায় রাখা।

ফিস্টুলা চিকিৎসার অন্যতম দিক হলো অপারেশনের পর ফিস্টুলা পুনরাবৃত্তি না হওয়া এবং মল ধরে রাখার ক্ষমতা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

সাধারণত কোমরের নিচ থেকে অবশ করে অপারেশন করা হয়। এক-দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। ফিস্টুলা অপারেশনের পর ঘা শুকাতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে সিটন পদ্ধতিতে দুই-তিন ধাপে অপারেশন করা হয়। প্রতিটি ধাপের মাঝে সাত থেকে ১০ দিন বিরতি দেওয়া হয়। এই সময় নিয়মিত ড্রেসিং করা প্রয়োজন। ড্রেসিং অপারেশনের পর পুনরায় ফিস্টুলা হওয়ার সম্ভাবনা কমায়।

এ কথা সত্য যে ফিস্টুলা অপারেশনের পর আবার হতে পারে। বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞদের মতে, অপারেশনের পর ফিস্টুলা পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা তিন থেকে সাত ভাগ। জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে এটি শতকরা ৪০ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এক কথায় জবাব দেওয়া সম্ভব নয় ফিস্টুলা অপারেশনের পর পুনরায় হবে কিনা। ফিস্টুলার ধরন, সার্জনের অভিজ্ঞতা এবং অপারেশনের পরের যত্নের ওপর ফিস্টুলা অপারেশনের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে।

এন এইচ, ২৪ অক্টোবর

Back to top button