অপরাধ

বাস কন্ডাক্টার থেকে ‘মানবাধিকার চেয়ারম্যান’, হাতিয়েছেন কোটি টাকা

ঢাকা, ২৩ অক্টোবর – কথিত মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেড এর ব্যাবস্থাপনা পরিচালক পরিচয়ে শীর্ষ প্রতারক শাহীরুল ইসলাম সিকদারকে (৪৮) বিপুল পরিমান দেশী-বিদেশী অস্ত্র ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৪। গ্রেপ্তারের পর র‍্যাব বলছে, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সৌখিন পরিবহনে বাসের কন্ডাক্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন,পরে প্রতারণার জন্য সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ দেয়ার প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলেন। এরপর এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরির চটকাদার বিজ্ঞাপন দিত। দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আবেদন করলে তাদেরকে কৌশলে ভুল বুঝিয়ে তার পরিচালিত কোম্পানীর মাধ্যমে নিয়োগ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি চাকুরী প্রার্থীর কাছ থেকে ১৫-২৫ হাজার টাকা জামানত হিসেবে গ্রহন করতো। আবার সরকারী প্রতিষ্ঠানের চাকরির ক্ষেত্রে ৫-১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতো। নিজেকে কখনও সরকারি ঊচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আবার কখনো মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও পরিচয় দিতেন প্রতারক শাহীরুল। প্রতারাণার মাধ্যমে একাধিক ফ্ল্যাট ও জমিসহ দৃশ্যমান প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন শাহীরুল।

শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীর রামপুরা বনশ্রী এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাহীরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

র‍্যাব বলছে, রাজধানীতে শাহীরুলের একাধিক ফ্ল্যাট ও জমিসহ দৃশ্যমান প্রায় ৫০ কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। এছাড়া তার কথিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে- হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিসেস লি, হোমল্যান্ড ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, মানবাধিকার সংস্থা, শাহীরুল এন্ড ডেভলপমেন্ট কো. লিমিটেড, হোমল্যান্ড হাউজিং, হোমল্যান্ড বেভারেজ এন্ড এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মাদারল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড, শাহীরুল ইসলাম বাংলাদেশ আউট সোর্সিং এন্ড পাওয়ার সাপ্লাইয়ার্স এসোশিয়েশন।

অভিযান পরিচালনার সময় ৩ টি বিদেশী পিস্তল, ১ টি শর্টগান, ১ টি এয়ারগান, ১ টি এয়ার রাইফেল, ২৩৭ রাউন্ড গুলি, ৫ টি ম্যাগাজিন, ৫ টি খালি খোসা, ২২ টি কার্তুজ, ৪ টি চাকু, ১ টি লোহার স্টিক, ৩ টি ডামি পিস্তলসহ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেড এর মাধ্যমে চাকুরির আবেদন ফরম, চুক্তিপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক বই, ব্যানার, প্যাড, স্ট্যাম্প, ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, গোপন ক্যামেরা, পাসপোর্ট, ভিজিটিং কার্ড, আইডি কার্ড, নেইম প্লেট, বিভিন্ন নামীদামী ব্যক্তিবর্গের সাথে তোলা ছবি, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, পাসপোর্ট, মানি রিসিভ বই, বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালমাল জব্দ করা হয়।

র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, চাকরি দেয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ এর ঘটনা পুরাতন হলেও মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় প্রদানকারী শাহীরুলের প্রতারনার ইতিহাস নিসন্দেহে ধৃষ্টতাপূর্ন এবং ভিন্নধর্মী। শাহীরুল একজন শীর্ষ পর্যায়ের প্রতারক। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিস লি. কোম্পানী খুলে, ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন ও চাকুরী প্রদানের নামে প্রতারনা এবং বিত্ত বৈভবের মালিক শাহীরুল ছিল সকলের ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

প্রতারক শাহিরুলের উত্থান

অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা শাহীরুল নিজ জেলা ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় কর্মজীবন শুরু করে গাড়ি ব্যবসা দিয়ে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সৌখিন পরিবহনে কাজ করে বলে জানা যায়। এরপর শুরু হয় নতুন ব্যবসা প্রতারণা। ২০০৩ সাল থেকে শুরু করে সিকিউরিটি গার্ড সরবরাহ। এরপর ধীরে ধীরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস লি. এর নামে শুরু হয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালের দিকে রামপুরা এলাকায় ‘হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এন্ড গার্ড সার্ভিস লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান খুলে প্রতারণামূলক কাজ দিয়ে নতুনভাবে কর্মজীবন শুরু করে। অতি অল্প সময়ে অধিক টাকার মালিক হওয়ার লোভে সে উক্ত কোম্পানীর নামে প্রতারণামূলক ভাবে অগণিত মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমান টাকা আত্মসাৎ করে আসছিল। এরপর থেকে শাহীরুল ইসলাম অবৈধ সম্পদের মালিক হতে শুরু করে।

তিনি আরও বলেন, এক সময় প্রতরণার নানান অভিযোগ আড়াল করতে শাহীরুল তার অফিসের ঠিকানা পরিবর্তন করে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সার্ভিস লি. এর পরিবর্তে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি বেনামী মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। ক্ষমতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সে নামিদামি ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ছবি তুলে সেগুলো প্রদর্শন করে এবং বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে।

র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক বলেন, গ্রেপ্তার আসামী তার প্রতারণার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বেকার ও শিক্ষিত বহু নারী ও পুরুষকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড, ড্রাইভার, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী, বিক্রয় কর্মকর্তা, লাইনম্যান ইত্যাদি হিসেবে চাকরি দেয়ার নাম করে বিপুল পরিমান টাকা আত্মসাৎ করে বলে জানা যায়।

শাহীরুলের প্রতারনার কৌশল

র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারক শাহীরুল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে চাকুরীর চটকাদার বিজ্ঞাপন দিত। দেশের শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরা বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে আবেদন করলে তাদেরকে কৌশলে ভুল বুঝিয়ে তার পরিচালিত কোম্পানীর মাধ্যমে নিয়োগ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতি চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে ১৫-২৫ হাজার টাকা জামানত হিসেবে গ্রহন করতো। এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানের চাকুরীর ক্ষেতে ৫-১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতো। সে নিজেকে শুটিং ক্লাবের সদস্য বলে পরিচয় দিত।

র‍্যাব কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, প্রশিক্ষণ, ইউনিফরম ও আনুসাঙ্গিক খরচ হিসেবেও টাকা নেয়া হতো। এভাবে অগণিত মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নামমাত্র কয়েকজন’কে নিয়োগ প্রদান করে বাকি ভুক্তভোগীদের টাকা আত্মসাৎ করে শাহীরুল। দীর্ঘদিন তার অফিস/বাসায় ঘুরাঘুরির পরও চাকুরীতে নিয়োগ না পাওয়ার পর পাওনা টাকা ফেরত চাইলে তার কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র দিয়ে ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন ভয়ভীতিসহ জীবননাশের হুমকি প্রদান করে।

শাহিরুল নিজেকে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ভুয়া পরিচয় প্রদান ও চাঁদাবাজি করার অপরাধে তার নামে ডিএমপির রামপুরা থানায় চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মামলা রয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে র‍্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রতারনামূলকভাবে মানবাধিকার সংস্থার চেয়ারম্যান পরিচয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। সরকারী কর্মকর্তা না হয়েও ভূয়া পরিচয় প্রদান করে এবং সরকারী কর্মকর্তার সই স্বাক্ষর নকল করে। অভিযান পরিচালনার সময় তার বাসা ও অফিস থেকে দেশী-বিদেশী অস্ত্র ও প্রচুর পরিমান বুলেট পাওয়া গিয়েছে। তবে এসব অস্ত্রের সে কোন বৈধ কাগজ পত্র প্রদর্শন করতে পারেনি।

সূত্র: বাংলাদেশ জার্নাল
এম ইউ/২৩ অক্টোবর ২০২১

Back to top button