ব্যবসা

ই-কমার্স নিয়ে সরকার কঠোর, তবুও থেমে নেই প্রতারণা

হিটলার এ. হালিম

ঢাকা, ০৬ অক্টোবর – ই-কমার্স নিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কঠোর অবস্থান নিলেও থেমে নেই এই খাতের প্রতারণা। এখনও ইভ্যালির মডেলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাদের অপব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এরইমধ্যে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন কয়েকজন ‍উদ্যোক্তা। কেউ কেউ পলাতক। এই খাত থেকে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ হয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশে শুরুর দিককার ই-কমার্স উদ্যোক্তারা বলছেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স নিয়ে যে অপকর্ম করেছে তা প্রকৃত ই-কমার্স নয়। গ্রাহকদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তারা এ-ও বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু পদক্ষেপ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়োপযোগী নিয়মের কারণে ই-কমার্স খাতে অগ্রিম টাকা গ্রহণ, ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা জমা নেওয়া ও এসক্রো সিস্টেম (পণ্য ডেলিভারি হওয়ার আগপর্যন্ত গেটওয়েতে টাকা ব্লক থাকা) চালুর ফলে এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।

দেশের প্রথম দিককার ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘ই-কমার্স খাতের অসৎ উদ্যোক্তাদের বিষয়ে সরকার যা করছে তা আরও আগে করা উচিত ছিল। আমরা দীর্ঘদিন বলে আসছিলাম এগুলো ই-কমার্স নয়। এখন ই-কমার্সে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, গ্রাহককে বোঝাতে হবে ই-কমার্স মানেই প্রতারণা নয়। এ জন্য তিনিসহ আরও কয়েকজন ই-কমার্স উদ্যোক্তা ‘১০ : ১০’ শীর্ষক একটি আয়োজন করতে যাচ্ছেন। প্রথম দিককার (যাদের ব্যবসার বয়স ৮-৯ বছর) ২০টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেবে বলে তিনি জানান।

গ্রেফতার হলো যারা

প্রথমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে নিরাপদ ডটকমের প্রধান নির্বাহী শাহরিয়ার খানকে। এরপর ই-অরেঞ্জের চিফ অপারেটিং অফিসার আমানউল্লাহ ও সাবেক চিফ অপারেটিং অফিসার নাজমুল আলমকে গ্রেফতার করা হয়। তার আগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমান আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে তা নাকচ হয়। প্রতিষ্ঠানটির অপর দুই কর্মকর্তা বীথি আকতার ও কাওসার এখনও পলাতক।

গ্রেফতার হয়েছে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী মো. রাসেল ও ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। এরপর ধামাকা শপিংয়ের তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলো সিওও সিরাজুল ইসলাম রানা, মোবাইল, ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ক্যাটাগরির প্রধান ইমতিয়াজ হাসান সবুজ এবং ক্যাটাগরি প্রধান (ইলেক্ট্রনিকস) ইব্রাহিম স্বপন। এই প্রতিষ্ঠানের অনেকে পলাতক।

গ্রেফতার হয়েছে রিং আইডির পরিচালক সাইফুল ইসলাম। কিউকমের প্রধান নির্বাহী মো. রিপন মিয়াও গ্রেফতার আছে। সবশেষে এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেসের পরিচালক আল-আমিন ও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী শারমীন আক্তারকে আটক করা হয়। এদিকে সিরাজগঞ্জ শপিংয়ের প্রধান নির্বাহী জুয়েল রানার বিরুদ্ধে মামলা হলে, সেও পালিয়ে যায়।

দেড় হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেফতারকৃতরা যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তাতে জানা যায়, অভিযুক্তরা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করেছেন। এগিয়ে আছে ইভ্যালি। প্রতিষ্ঠানটির আত্মসাতের পরিমাণ ৪০৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া ই-অরেঞ্জ ২৩২ কোটি টাকা, কিউকম ২৫০ কোটি টাকা, নিরাপদ ডটকম ৭-৮ কোটি টাকা, ধামাকা শপিং ১১৭ কোটি টাকা, রিং আইডি (অনলাইন প্লাটফর্ম, এমএলএম মডেল) ২১২ কোটি টাকা ও এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস (এমএলএম মডেল) ২৬৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। সিরাজগঞ্জ শপিং আত্মসাৎ করেছে ৪৭ কোটি টাকা।

এগুলোর বাইরে আরও কয়েকটি ই-কমার্স গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে। সেগুলো হলো- আলেশামার্ট, আলাদিনের প্রদীপ, বুম বুম, আদিয়ান মার্ট ও নিডস ডট কম ডট বিডি।

ইভ্যালির মডেল যারা এখনও অনুসরণ করছে

এখনও ইভ্যালির মডেল অনুসরণ করছে কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। বিশাল ছাড়ে অগ্রিম টাকা নিয়ে বিক্রি করছে নামিদামি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল। ইলেকট্রনিকস আইটেমেও দেওয়া হচ্ছে অস্বাভাবিক ছাড়। এর মধ্যে রয়েছে দালাল প্লাস, আনন্দের বাজার, শ্রেষ্ঠ ডট কম, আকাশনীল, থলে ইত্যাদি। যদিও শ্রেষ্ঠ ডট কম সম্প্রতি তাদের ব্যবসায়িক মডেলে পরিবর্তন এনেছে।

প্রতারণার নতুন ধরন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মূলত ইভ্যালির রাস্তা ধরে এগুনো এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার ধরন প্রায় একইরকম। ব্যবসায়িক ভাষায় মডেল দু’টি হলো, ‘ইনসেনটিভ’ মডেল’ ও ‘গ্রুপ বায়িং’ মডেল। ইনসেনটিভ মডেলে ডিসকাউন্ট অফার দিয়ে পণ্য বিক্রি করা হয়। গ্রুপ বাইং মডেলে ক্রেতার কাছ থেকে প্রি-অর্ডারের মাধ্যমে টাকা নিয়ে সেটা বাল্ক অর্ডারের মাধ্যমে কম মূল্যে পণ্য কিনে ডেলিভারি দেওয়া হয়। এই মডেল অনুসরণ করে আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের অতিরিক্ত ডিসকাউন্টের লোভ দেখিয়ে যেভাবে পণ্যের বিশাল অর্ডার নিচ্ছে তা বাস্তবসম্মত নয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তারা সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারিও দিতে পারেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অর্ডারের টাকাও ফেরত দিতে পারেনি।

ই-ক্যাব যা বলছে

ই-ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে ই-কমার্সের ব্যবসা ছিল ৫৬০ কোটি টাকার। এ বছর ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হয়। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত তিনমাসে দেশের শীর্ষ ২৫টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে লেনদেন হয়েছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে ওই ২৫টি ই-কমার্সে লেনদেন হয়েছে ৪৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে পণ্য ডেলিভারি হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়েগুলোকে ২০৪ কোটি টাকা ছাড় করেছে। এখনও ২৮৭ কোটি টাকা গেটওয়েতে আছে।

ই-ভ্যালির মতো আর কোন কোন প্রতিষ্ঠান এখন কার্যক্রম চালাচ্ছে জানতে চাইলে ই-ক্যাবের মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম শোভন বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখনও বিভিন্নভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে জানতে পেরেছি। কিন্তু তারা আমাদের সদস্য নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেলে ৩০-৫০ শতাংশ ছাড় দিচ্ছে। কিন্তু তাদের তো আগাম টাকা (১০ শতাংশের বেশি নয়) নেওয়ার সুযোগ নেই। এসক্রো সিস্টেম চালুর ফলে গ্রাহক পণ্য ডেলিভারি না পেলে টাকা গেটওয়েতেই থেকে যাচ্ছে। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নিতে পারছে না। এতে গ্রাহক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি বিষয় বুঝতে পারছি, কিন্তু ধরতে পারছি না। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সব গ্রাহককে টাকা ফেরত দিচ্ছে। তারা কীভাবে সব গ্রাহককে টাকা ফেরত দিচ্ছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কী পরিমাণ টাকা যাচ্ছে, কারা পাচ্ছে সেটা বোঝাও শক্ত। এটা শনাক্তের চেষ্টা করছি।’

জানা যায়, এখন ই-ক্যাবের সদস্য ১ হাজার ৬২০টি প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে পাঁচ হাজারেরও বেশি ই-কমার্স সাইট রয়েছে বলে ধারণা ই-ক্যাবের। ফেসবুক পেজভিত্তিক ই-কমার্স ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার সংখ্যা দুই লাখের মতো।

ই-ক্যাব সাম্প্রতিক স্ক্যামের কারণে এখন পর্যন্ত ৮টি প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ স্থগিত করেছে। এগুলো হলো—ইঅরেঞ্জ, গ্রিনবাংলা ই-কমার্স লিমিটেড, এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রো ফুড অ্যান্ড কনজ্যুমার লিমিটেড, টুয়েন্টিফোর টিকেটি ডট কম, ইভ্যালি, ধামাকা শপিং, সিরাজগঞ্জ শপ ও গ্লিটার্স আরএসটি ওয়ার্ল্ড।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন
এম এস, ০৬ অক্টোবর

Back to top button