এশিয়া

চীন দেড় শতাধিক দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে যেসব ঋণ দিয়েছে তা কী শর্তে?

ওয়াশিংটন, ০১ অক্টোবর – কিছুদিন আগেও চীন নিজেই বিদেশি অর্থ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এখন সবকিছুই পাল্টে গেছে। চীনের কাছ থেকেই এখন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ঋণ নিচ্ছে দেড় শতাধিক দেশ এবং এর পরিমাণ শুনলে অনেকেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।

নতুন এক হিসাবে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্য প্রধান শক্তিধর দেশগুলো অন্য দেশকে উন্নয়নের জন্য যে অর্থসহায়তা দিচ্ছে- তার কমপক্ষে দ্বিগুণ অর্থ দিচ্ছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের উইলিয়াম অ্যাণ্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্র এইড ডাটার এক জরিপে দেখা গেছে, গত ১৮ বছরে চীন মোট ১৬৫টি দেশে মঞ্জুরি বা ঋণ হিসেবে ৮৪ হাজার ৩শ কোটি ডলার অর্থ দিয়েছে এবং তা খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৪২৭টি অবকাঠামো প্রকল্পে।

এই অর্থের অধিকাংশই হচ্ছে চীনের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংক থেকে আসা এবং এগুলো দেওয়া হয়েছে চড়া সুদে ‘ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ’ হিসেবে। এর একটি বড় অংশই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উচ্চাভিলাষী বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ব বাণিজ্যের নতুন নতুন পথ নির্মাণের জন্য ২০১৩ সালে এই প্রকল্প শুরু হয়।

সমালোচকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, চড়া সুদের যেসব ঋণ থেকে চীনের এসব প্রকল্পের অর্থায়ন হচ্ছে, তা অনেক দেশের জনগণের অগোচরেই তাদের কাঁধে বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

এখন চীনা কর্মকর্তারাও এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন। এইড ডাটার গবেষকরা চার বছর ধরে অনুসন্ধান করেছেন যে, চীনের দেওয়া ঋণ সারাবিশ্বে কোথায় কোথায় যাচ্ছে এবং তা কীভাবে খরচ করা হচ্ছে। তারা বলছেন, চীন সরকারের মন্ত্রণালয়গুলো নিয়মিত তাদের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছে যে তাদের অর্থ বিদেশে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এইড ডাটার নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাড পার্কস বলছেন, তাদের সঙ্গে চীনের সরকারি কর্মকর্তাদের সব সময়ই কথা হচ্ছে এবং তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণভাবে তারা এসব উপাত্ত হাতে পান না।

চীনের দেওয়া ঋণে অর্থায়িত উদ্যোগগুলোর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে চীন ও তার প্রতিবেশী লাওসের মধ্যে রেলপথ নির্মাণের প্রকল্পটিকে।

গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতিবিদরা এমন একটি সংযোগের স্বপ্ন দেখছিলেন, যাতে ভূ-বেষ্টিত দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সঙ্গে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু প্রকৌশলীরা বলছেন, এ প্রকল্প হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল কারণ এই রেললাইন নির্মাণ করতে হবে উঁচু পার্বত্য এলাকা দিয়ে, অনেকগুলো সুড়ঙ্গ ও সেতু বানাতে হবে। লাওস একটি গরিব দেশ এবং এ প্রকল্পের সামান্য অংশের খরচ মেটানোর ক্ষমতাও তাদের নেই। কিন্তু চীনের উচ্চাভিলাষী ব্যাংকাররা মঞ্চে প্রবেশ করার সাথে সাথেই এই চিত্র পাল্টে গেল।

চীনের কয়েকটি রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এবং রাষ্ট্রীয় ঋণদাতাদের একটি কনসোর্টিয়াম এ প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছে। মোট ৫৯০ কোটি ডলারের সেই রেললাইন এখন চালু হওয়ার পথে। আগামী ডিসেম্বরেই এতে ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ার কথা। তবে লাওসকে এজন্য ৪৮ কোটি ডলারের একটি ঋণ নিতে হয়েছিল একটি চীনা ব্যাংক থেকে-যাতে ওই প্রকল্পে দেশটির যে ইকুইটি তার অর্থায়ন করা যায়।

লাওসের অর্থনীতিতে সামান্য যে কয়েকটি খাত লাভজনক- তার একটি হচ্ছে তাদের পটাশের খনি। এই খনির আয়কে কাজে লাগিয়ে দেশটি সেই বিশাল ঋণ নিয়েছিল।

হংকংএর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সহযোগী অধ্যাপক ওয়ানজিং কেলি চেন বলছেন, লাওসের ইকুইটি অংশ অর্থায়নের জন্য চীনের এক্সিম ব্যাংক যে ঋণ দেয় তাতেই বোঝা যায় চীনা রাষ্ট্র এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে কতটা ব্যগ্র ছিল।

এই রেল লাইনের অধিকাংশেরই মালিক চীনানিয়ন্ত্রিত রেলওয়ে গ্রুপ। কিন্তু চুক্তি করা হয়েছে এমনভাবে যে রেলপথের ঋণের জন্য চূড়ান্তভাবে দায়ী হচ্ছে লাওস সরকার। এই চুক্তির কারণে আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে লাওসের রেটিং একেবারে নিচে নেমে যায়।

লাওসের দেউলিয়া হবার উপক্রম হলো ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন দেশটি চীনা দাতাদের ঋণের ভার হালকা করতে তাদের একটি বড় সম্পদ জ্বালানি গ্রিডের একাংশ ৬০ কোটি ডলারে চীনের কাছেই বিক্রি করে দিলো।

এ ঘটনা যখন ঘটছে তখনও সেই রেললাইন চালুই হয়নি। কিন্তু এখনও বেশ কিছু নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের কাছে অর্থের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে চীন।

ব্র্যাড পার্কস বলছেন, কোন এক বছরে চীনের গড় আন্তর্জাতিক অর্থায়নের পরিমাণ হচ্ছে ৮ হাজার ৫শ কোটি ডলার। এর সঙ্গে তুলনায় দেখা যাচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর বৈশ্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমে যে সহায়তা দিচ্ছে তার সঙ্গে। এই পরিমাণ হলো মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৭শ কোটি ডলার।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্প অর্থায়নের ক্ষেত্রে চীন অনেক আগেই অন্য সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু বেইজিং যেভাবে এ স্তরে উন্নীত হয়েছে তা একেবারেই ব্যতিক্রমী বলে উল্লেখ করেছে এইড ডাটা।

অতীতে এক সময় আফ্রিকান দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলার জন্য দোষ দেওয়া হতো পশ্চিমা দেশগুলোকে। চীন এসব দেশকে অর্থ ঋণ দিচ্ছে অন্য কায়দায়। এখানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে মঞ্জুরি বা ঋণের মাধ্যমে প্রকল্প অর্থায়ন করা হচ্ছে না। বরং চীন যে ঋণ দিচ্ছে তার প্রায় সবটাই আসছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের ঋণ হিসেবে।

গ্রহীতা দেশের সরকারি ঋণের যে আনুষ্ঠানিক বিবরণ থাকে তাতে চীন থেকে নেওয়া এসব ঋণের কথা উল্লেখ করা হয় না। কারণ চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে করা এসব চুক্তিতে অনেক সময়ই কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রতিষ্ঠানের নাম থাকে না। ফলে এসব চুক্তি থেকে যায় সরকারের দলিলপত্রের বাইরে। তাছাড়া এতে গোপনীয়তা সংক্রান্ত যেসব ধারা থাকে তার ফলেও সরকার জানতে পারে না যে ঋণ নেওবার সময় বন্ধ দরজার ওপাশে ঠিক কী সমঝোতা হয়েছিল।

এইড ডাটা বলছে, এই ধরনের অজানা ঋণের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৫শ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। চীন যেসব রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ঋণ দেয় তার বিপরীতে অনেক সময় অস্বাভাবিক ধরনের কোল্যাটেরাল দাবি করা হয়।

ইদানিং প্রায়ই চীনা ঋণ গ্রহীতাকে প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি করে পাওয়া নগদ অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করতে হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছে যাতে বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা তেল বিক্রি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা পাবে তা সরাসরি চীননিয়ন্ত্রিত একটি ব্যাংকের একাউন্টে জমা দিতে হবে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে চীনা ঋণদাতা সাথে সাথেই এ্যাকাউন্টে থাকা সেই অর্থ তুলে নিতে পারবে।

ব্র্যাড পার্কস বলছেন, অত্যন্ত দরিদ্র কোন দেশের আয় করা ডলার বা ইউরো এভাবে একটি বিদেশের এ্যাকাউন্টে আটকে থাকছে যার নিয়ন্ত্রক একটি বিদেশি শক্তি।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আ্যানা জেলপার্ন বলছেন, চীন এখানে বলা যায় বুদ্ধি এবং জোর খাটিয়ে তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করছে।

তিনি বলেন, অনেক দেশই আছে যারা ঋণগ্রহীতা হিসেবে সুবিধার নয়। তাই তারা যদি ঋণ শোধ করতে না পারে, তখন এটা আশা করা যায়না যে তারা বন্দরের মতো একটা অবকাঠামো বা সম্পদ অন্যের হাতে তুলে দেবে।

তবে চীন হয়তো শিগগিরই ঋণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে পারে। জুন মাসে জি-সেভেন জোটের সভায় ঘোষণা করা হয় যে চীনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য জি-সেভেন একটি পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় বৈশ্বিক অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে। তবে এ প্রকল্পগুলো আর্থিক ও পরিবেশগত দিক থেকে টেকসই কিনা তা দেখা হবে।

অবশ্য এমনও হতে পারে যে এই পরিকল্পনা করতে জি-সেভেন আসলে অনেক দেরি করে ফেলেছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো এবং চীনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাণিজ্য প্রতিনিধি ডেভিড ডলার বলেন, পশ্চিমা এই উদ্যোগ চীনা কর্মসূচিতে কোন আঁচড় কাটতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

তার মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামোর প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থ এসব উদ্যোগে নেই, তাছাড়া পশ্চিমা সরকারি অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় অনেক আমলাতান্ত্রিকতা এবং বিলম্ব হয়ে থাকে।

এইড ডাটার গবেষকরা বলছেন, চীনের বেল্ট এ্যান্ড রোড প্রকল্প (বিআরআই) নিজেও কিছু সমস্যার সম্মুখীন। তাদের মতে, বিআরআইএর প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে দুর্নীতি, শ্রম কেলেংকারি বা পরিবেশগত সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও চীনের অন্য চুক্তিগুলোর তুলনায় বেশি। গবেষকরা বলছেন, বিআরআই প্রকল্পকে চালু রাখতে হলে বেইজিংকে ঋণগ্রহীতার উদ্বেগগুলো বিবেচনায় নিতেই হবে।

সূত্র: জাগো নিউজ
এম ইউ/০১ অক্টোবর ২০২১

Back to top button