ব্যবসা

সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে যা বলছেন অর্থনীতিবিদরা

সাঈদ শিপন

ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর – পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র ও ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের মেয়াদি হিসাবের মুনাফার হার কমিয়েছে সরকার। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে সঠিক বলছেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, সরকার ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের স্কিমে মুনাফার হার আগের মতো রেখে, এর বেশি পরিমাণ স্কিমে মুনাফার হার কমিয়েছে। এটা খুবই ভালো সিদ্ধান্ত। আরও আগে সরকারের এ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।

অর্থনীতিবিদদের অভিমত, যারা সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ করবেন তাদের মুনাফার হার কমানো হয়নি। সুতরাং সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়বে না। অন্যদিকে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ওপর মুনাফার হার কমানোর কারণে সরকারের সুদ ব্যয় কমবে। ফলে সরকার উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

তারা আরও বলেন, সরকার মুনাফার হার কমানোর পরও সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার এখনও ব্যাংকের সুদহারের চেয়ে অনেক বেশি। সুতরাং ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে সঞ্চয়পত্র কিনলে এখনও বেশি মুনাফা পাওয়া যাবে। তবে মুনাফার হার কমানোর ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের একটি অংশ শেয়ারবাজারে আসতে পারে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের উচিত, ভালো শেয়ার নির্বাচন করে বিনিয়োগ করা।

অবশ্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সিদ্ধান্তকে সঠিক বললেও যে সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেই সময়টি সঠিক হয়নি বলে অভিমত একটি অংশের।

তারা বলছেন, কোভিড-১৯ এর এ সময়ে সামাজিক সুরক্ষার আলোকে কিছুটা হলেও ছাড় দেওয়া উচিত ছিল। এখন সরকারের উচিত, যাদের সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য কোনো আয় নেই, তাদের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া। সেক্ষেত্রে ১৫ লাখ টাকার পরিবর্তে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা যেতে পারে। এ সুযোগ শুধু তারাই পাবেন যাদের সঞ্চয়পত্র ছাড়া বিকল্প কোনো আয় নেই।

জাতীয় সঞ্চয়পত্রের স্কিমগুলোর মুনাফার হার কমিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন হার অনুযায়ী, ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের স্কিমে মুনাফার হার আগের মতো রাখা হলেও এর বেশি পরিমাণ স্কিমে মুনাফার হার কমানো হয়েছে।

যারা নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনবেন, শুধু তাদের জন্য পরিবর্তিত এ হার কার্যকর হবে। এছাড়া আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটি পুনঃবিনিয়োগ করলে তখন নতুন মুনাফার হার কার্যকর হবে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয়ের জন্যই নতুন মুনাফার হার প্রযোজ্য হবে। এছাড়া যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেক বিনিয়োগকারী সব সঞ্চয় স্কিমে মোট বিনিয়োগের ওপর প্রযোজ্য হারে মুনাফা পাবেন।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা আমার মতে ঠিক আছে। এর কারণ হচ্ছে দুটি। একটা হলো সুদের হার কমানো হচ্ছে ১৫ লাখ টাকার ওপরে যাদের সঞ্চয়পত্র আছে তাদের জন্য। কাজেই একেবারে অল্প আয়ের মানুষ যারা বিনিয়োগ করছেন, তাদের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। দুই নম্বর হচ্ছে এখনও যে হার থাকবে তাতে ব্যাংকে টাকা রাখলে যে মুনাফা পাওয়া যায় তার চেয়ে বেশি মুনাফা পাওয়া যাবে সঞ্চয়পত্র থেকে। কাজেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ কমবে বলে আমার মনে হয় না।

তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বেশি হওয়ায় সরকারের সুদের জন্য যে ব্যয় হয় তা বিরাট অংক। কাজেই ভবিষ্যতে সুদহার কিছুটা কমলেও সেই অর্থ সরকার অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করতে পারে। সব মিলিয়ে আমি মনে করি, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তটা (সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো) নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সময়টা আমার কাছে খুব উপযুক্ত মনে হয়নি। কারণ এই সময় মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। এমনকি বড় উদ্যোক্তা ও ছোট উদ্যোক্তা সবার জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। সে রকম একটি সময়ে, বিশেষ করে যারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত, যারা শুধু সঞ্চয়পত্রের আয়ের ওপর বেঁচে থাকে, তাদের জন্য এই দুই পলিসি সাংঘর্ষিক। এদের জন্য যদি বাড়তি খরচ হয়েও থাকে, এসময়ে সেটা প্রণোদনা হিসেবে দেখা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, যারা পেনশনভোগী ও যাদের সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য কোনো আয় নেই, তাদের জন্য যেটা দেওয়া হয়েছে তা পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে বলে আমার মনে হয়। মাত্র ১৫ লাখ দিয়ে এদের রক্ষা করা যাবে না। কারণ নিম্ন আয়ের মানুষ খুব বেশি সঞ্চয়পত্র করে না, মধ্যবিত্তই বেশি করে। কাজেই ১৫ লাখ টাকার যে কাট অফ, এটাকে বাড়াতে হবে। এটা কতো বাড়বে, কী বাড়াবে সেটা আলাপ করা যেতে পারে। আমার নিজের ধারণা কমপক্ষে দ্বিগুণ করলে ভালো হবে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত। এটা আরও আগে নেওয়ার দরকার ছিল। দেরিতে হলেও ঠিকই আছে। বাজারের সঙ্গে সরকারকে সামঞ্জস্যতা তৈরি করতে হবে। যেভাবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছিল, তাতে সব টাকা এখানে চলে আসতো। তাহলে কী লাভ হতো? সঞ্চয়পত্র তো কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে লাগে না। এ টাকা সরকারও খাটায় না, কেউ কিছু করে না এবং সুদের হার অনেক বেশি। সরকারের অনেক লস হয়।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর কারণে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র সংকুচিত হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছুটা সংকুচিত হবে এটা স্বাভাবিক। এখন নিরাপদে বসে বসে বড় অংকের টাকা আয় করবো, এটা তো হয় না। সুতরাং বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখেই করা উচিত (সঞ্চয়পত্রের সুদহার নির্ধারণ করা উচিত)। এখনও মুনাফার হার অনেক বেশি। কাজেই এটা কিছুটা সংশোধন হলো। এতে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর কোনো চাপ বাড়বে না।

মুনাফার হার কমানোর কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের একটি অংশ শেয়ারবাজারে যেতে পারে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, শেয়ারবাজারে গেলে যাবে। তাতে তো সমস্যা নেই। শেয়ারবাজার তো বিনিয়োগেরই জায়গা। পৃথিবীর সব দেশেই শেয়ারবাজারে বেশি টাকা যায়। ফলে সেখানে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। শেয়ারবাজার বড় হলে ক্ষতি তো নেই। তবে শেয়ারবাজারকে একটু কন্ট্রোলে (নিয়ন্ত্রণে) রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানোর যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তা ভালো সিদ্ধান্ত। সরকার আর কতদিন বসিয়ে বসিয়ে টাকা দেবে?

কোন সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার কত

পাঁচ বছরমেয়াদি সঞ্চয়পত্রে বর্তমানে মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়। নতুন নিয়মে এই সঞ্চয়পত্রে যারা ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করবেন তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ হারে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে মুনাফার হার হবে সাড়ে ৯ শতাংশ। তবে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফার হার আগের মতোই থাকবে।

তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক তিন বছরমেয়াদি সঞ্চয়পত্রে বর্তমানে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। সেটি ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মেয়াদ শেষে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ শতাংশ। তবে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফার হার আগের মতোই থাকবে।

অবসরভোগীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরমেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে এতদিন ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যেতো। এখন এই সঞ্চয়পত্রে যারা ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করবেন তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করলে এই হার হবে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তবে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফার হার আগের মতোই থাকবে।

পরিবার সঞ্চয়পত্রের পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে মুনাফার হার এতদিন ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল। এখন এই সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কমিয়ে করা হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ। ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এর মুনাফার হার আগের মতোই থাকবে।

ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে ব্যাংকের সাধারণ হিসাবে মুনাফার হারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এই স্কিমের মুনাফার হার সাড়ে ৭ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রে ব্যাংকে তিন বছরমেয়াদি হিসাবে বর্তমানে মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, নতুন নিয়মে এখন ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার হবে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে হবে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ।

এছাড়া ওয়েজ আর্নার’স ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের বর্তমান মুনাফার হার ১১ দশমিক ২০ শতাংশ। নতুন হারে ১৫ লাখের বেশি বিনিয়োগ করলে মুনাফা মিলবে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর ৩০ লাখের বেশি বিনিয়োগে মুনাফা পাওয়া যাবে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া বিনিয়োগ ৫০ লাখের বেশি হলে ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যাবে।

সূত্র: জাগো নিউজ
এম ইউ/২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

Back to top button