তালেবানের শীর্ষ নেতার মৃত্যুর গুঞ্জন, বারাদারও বন্দী

কাবুল, ২১ সেপ্টেম্বর – আফগান তালেবানের শীর্ষ নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা কি আদৌ জীবিত আছেন? তালেবান ঘোষিত নতুন আফগান সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আব্দুল গনি বারাদরকে কি কান্দাহারে বন্দি করে রাখা হয়েছে?
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য স্পেক্টেটরের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তালেবানের আধ্যাত্মিক নেতার মৃত্যুর আর মোল্লা বারাদারকে বন্দী করে রাখার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে আফগানিস্তানে।
গতকালই সামনে এসেছিল সরকার গড়ার আগে বারাদারকে কোণঠাসা করে রাখার খবর। গত ৭ সেপ্টেম্বর নতুন মন্ত্রিসভা ঘোষণার পর থেকেই সরকারি কোনও কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছে না আফগানিস্তানের বর্তমান উপ-প্রধানমন্ত্রী মোল্লা বারাদারকে। কিছু দিন আগে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আফগানিস্তান সফরের সময়ে কাবুলে তাঁর অনুপস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিষয়টি।
চলতি মাসের শুরুতে কাবুলের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে সরকার গঠনের আলোচনায় ছিলেন বারাদার সহ তালেবানের অন্য প্রভাবশালী নেতারা। ছিলেন পাকিস্তানি মদদপুষ্ট হাক্কানি নেটোয়ার্কের সদস্যরাও। সরকার গঠনের আলোচনার মধ্যে হঠাৎই বারাদারের দিকে তেড়ে যান মন্ত্রী খলিল-উর-রহমান হক্কানি। একের পর এক ঘুষি মারেন বারাদারকে! হাক্কানিদের দিকে গুলি চালায় বরাদারের নিরাপত্তারক্ষীরা। পাল্টা গুলি চালায় হাক্কানিরাও। প্রাণ হারান কয়েক জন দেহরক্ষী।
আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য আরও অধিকার চেয়েছিলেন বারাদার। তালেবান পতাকার পাশাপাশি সর্বত্র আফগান জাতীয় পতাকা ওড়ানোর পক্ষেও কথা বলেছিলেন। তবে ঠিক কী নিয়ে হাক্কানিদের সঙ্গে গোলমাল শুরু হয় তা স্পষ্ট নয়। সেসময় গুলিবৃষ্টি ছাড়াও ধস্তাধস্তি হয় বারাদার ও হাক্কানি গোষ্ঠীর সমর্থকদের মধ্যে। ছড়িয়ে পড়ে আসবাবপত্র, গ্রিন টি ভরা ফ্লাস্ক।
এই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের মধ্যে কারও মৃত্যু হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এই ঘটনার পর বারাদারের মৃত্যুর খবর রটে যায়। পরে যদিও জানা যায়, বারাদার নিরাপদ ভাবেই সে দিন কাবুল প্রাসাদ ছেড়ে বেরোতে পেরেছিলেন। আহত হলেও বেঁচে আছেন তিনি। তবে সে দিন কাবুল ছেড়ে কান্দাহারে যাওয়ার পর থেকে আর ফেরেননি বারাদার। পরে কান্দাহার থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে বারাদার বোঝানোর চেষ্টা করেন ওই সংঘর্ষে তাঁর আহত বা নিহত হওয়ার খবর মিথ্যা। সেখানে তিনি তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা এবং আধ্যাত্মিক প্রধান হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সঙ্গে আলোচনা করছেন।
সোমবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য স্পেক্টেটর দাবি করেছে, বারাদার কান্দাহারে তাঁর সমর্থনে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রবীণদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছিলেন। কিন্তু সেই সঙ্গে সরকারি টিভি চ্যানেলে ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছেন। সরকারি টিভি এখন তালেবানের দখলে। আফগান পর্যবেক্ষকদের মতে, বারাদার যেভাবে টিভি-তে বিবৃতি পাঠ করেছেন তা দেখে মনে হচ্ছে তাঁকে কান্দাহারে বন্দি করে রাখা হয়েছে।
অন্য দিকে তালেবানের শীর্ষ নেতা হায়বাতুল্লাহ আখুন্দজাদা আদৌ জীবিত আছেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তালেবানের কাবুল দখলের পরে প্রায় এক মাস কেটে গেলেও তাঁকে দেখা যায়নি। গুজব রয়েছে তিনি মারা গেছেন। দলটির শীর্ষস্থানে এই শূন্যতা তালেবান গোষ্ঠীর মধ্যে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে- যা তাদের দুই দশক আগের শাসনকালে দেখা যায়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য স্পেক্টেটর এর দাবি, তিনি জীবিত না-ও থাকতে পারেন। তাদের মতে, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট হাক্কানি গোষ্ঠীর প্রভাব ঠেকানো কঠিন হবে।
আফগান পর্যবেক্ষকদের দাবি, কাবুল প্রাসাদে গোলমালের সময়ে পাকিস্তানি সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান ফয়েজ হামিদ বারাদারের বিরুদ্ধে হক্কানিদের সমর্থন করেছেন।
হাক্কানিরা পাকিস্তানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এবং পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের কাছের দারুল উলূম হাক্কানিয়া মাদ্রাসা থেকেই তাদের নাম রাখা হয়েছে হাক্কানি নেটওয়ার্ক। হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ওই মাদ্রাসার ছাত্র এবং শিক্ষক ছিলেন।
মূলত ২০১৬ সালের দিকে তালেবান ও হাক্কানি গোষ্ঠী একীভূত হয়। মোল্লা বারাদার যেখানে মধ্যপন্থী সরকার গঠন করতে চান সেখানে হাক্কানিরা সন্ত্রাসবাদের সমর্থক। তারা আত্মঘাতী হামলার প্রশংসা করে এবং বিশ্বব্যাপী জিহাদ করতে চায়।
অন্যদিকে, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে সবথেকে বড় ভূমিকা রেখেছেন বারাদার। তার কূটনৈতিক চেষ্টাতেই তালেবানের সঙ্গে চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল ওয়াশিংটন।
সূত্র: দেশ রূপান্তর
এম ইউ/২১ সেপ্টেম্বর ২০২১









