ব্যবসা

ইভ্যালির দায় বাড়ে যেভাবে

ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর – সময়ের আলোচিত নাম ইভ্যালি। বর্তমান গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বিক্রি করে প্রতিষ্ঠানটি। দিত লোভনীয় সব অফার। নিজেদের পছন্দের পণ্যে এমন লোভনীয় অফার পেতে ঝাঁপিয়ে পড়তেন অসংখ্য গ্রাহক। এখন প্রশ্ন হলো সাইক্লোন ও টি-টেনের মতো অফারগুলো কিভাবে দিতো দেশব্যাপী চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এই প্রতিষ্ঠানটি।

নতুন গ্রাহকদের উপর দায় চাপিয়ে পুরাতন গ্রাহকদের আংশিক অর্থ ফেরত অথবা পণ্য ফেরত দিতেন অনলাইনে পণ্য সরবরাহকারী ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি। দায় ট্রান্সফারের দুরভিসন্ধিমূলক অপকৌশল চালিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। এভাবে প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কে গ্রাহক যত তৈরি হয় দায় তত বাড়তে থাকে বলে জানিয়েছেন র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র‍্যাব সদর দপ্তরে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী (সিইও) ও চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তারের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘ব্যবসা বাড়াতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন আইটেম নিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন প্রতিষ্ঠানটি। মোবাইল সেট, টিভি, ফ্রিজ, এসি, মোটরবাইক এমনকি গাড়িও বিক্রি করেছেন। মূল্যছাড়ের অফারে এর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি বিশাল আকারের দায়ে তৈরি হয়।’

‘২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ইভ্যালির দায় ছিল ৪০৩ কোটি টাকা, যেখানে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ছিল ৬৫ কোটি টাকা’- বিভিন্ন সংস্থায় প্রকাশিত এই বিপুল পরিমাণ দেনার বিষয়ে র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানটির এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রাসেল কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। বরং জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এ দেনার পরিমাণ আরও বেশি; ‘প্রায় হাজার কোটি টাকা’ বলে র‌্যাবকে জানিয়েছেন।

এক পর্যায়ে ইভ্যালিকে দেউলিয়া ঘোষণার পরিকল্পনা করছিলেন ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল উল্লেখ্য করে, র‌্যাব বলেন, ‘সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ই-কমার্স ব্যবসা সংক্রান্ত যে নীতিমালা করা হয়েছে তার আলোকে ব্যবসা পরিচালনা কিংবা গ্রাহকদের দেনা পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।’

গ্রেপ্তার রাসেল ‘জেনেশুনেই নেতিবাচক স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছেন’ বলে র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন তিনি। আল মঈন বলেন, ‘বিদেশি একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে লোভনীয় অফারের আলোকে ইভ্যালির কার্যক্রম শুরু করে।’

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ইভ্যালির গ্রাহক সংখ্যা ৪৪ লাখের বেশি। তিনি বিভিন্ন লোভনীয় অফারের মাধ্যমে স্বল্প সময়ে এত সংখ্যক গ্রাহক সৃষ্টি করেছেন। ইভ্যালির বিভিন্ন লোভনীয় অফারগুলো হলো- সাইক্লোন অফার (বাজার মূল্যের অর্ধেক মূল্যে পণ্য বিক্রয়); ক্যাশব্যাক অফার (মূল্যের ৫০-১৫০% ক্যাশব্যাক অফার); আর্দ্রকুয়েক অফার, প্রায়োরিটি স্টোর, ক্যাশ অন ডেলিভারি। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবেও ছিল জমজমাট অফার, যেমন- বৈশাখী, ঈদ অফার ইত্যাদি।

জানা যায়, ইভ্যালির কারসাজির মূলহোতা গ্রেপ্তার মো. রাসেল প্রতিষ্ঠানটির সিইও এবং তার স্ত্রী গ্রেপ্তার শামীমা নাসরিন (চেয়ারম্যান) তার অন্যতম সহযোগী। রাসেল ২০০৭ সালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন এবং পরে তিনি ২০১০ সালে এমবিএ শেষ করেছেন। তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করেন। ২০১১ সালে তিনি ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি শুরু করেন। তিনি প্রায় ছয় বছর ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি ২০১৭ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। তিনি প্রায় এক বছর শিশুদের ব্যবহার্য একটি আইটেম নিয়ে ব্যবসা করেন এবং পরে ইভ্যালি প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা বিক্রি করে দেন।

২০১৮ সালে আগের ব্যবসালব্ধ অর্জিত অর্থ দিয়ে ইভ্যালি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইভ্যালি কার্যক্রম শুরু হয়। কোম্পানিতে তিনি সিইও এবং তার স্ত্রী চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন।

ইভ্যালির ব্যবসায়িক অবকাঠামো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ভাড়া জায়গায় ধানমন্ডিতে প্রধান কার্যালয় এবং কাস্টমার কেয়ার স্থাপন করা হয়। একইভাবে ভাড়া করা জায়গায় আমিন বাজার ও সাভারে দুটি ওয়ার হাউজ চালু করা হয়।

কোম্পানিতে একপর্যায়ে প্রায় ২০০০ ব্যবস্থাপনা স্টাফ ও ১৭০০ অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ ছিল, যা ব্যবসায়িক অবনতিতে বর্তমানে যথাক্রমে স্টাফ ১৩০০ জন এবং অস্থায়ী পদে প্রায় ৫০০ জন কর্মচারীতে এসে দাঁড়িয়েছে। কর্মচারীদের একপর্যায়ে মোট মাসিক বেতন বাবদ দেওয়া হতো প্রায় পাঁচ কোটি টাকা, যা বর্তমানে দেড় কোটিতে দাড়িয়েছে বলে গ্রেপ্তাররা জানান।

এর আগে বৃহস্পতিবার ইভ্যালির রাসেল ও তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গুলশান থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় রাসেল দম্পতিকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে র‍্যাব। আরিফ বাকের নামে ইভ্যালির এক গ্রাহক মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আরিফ বাকের গত ২৯ মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে ইভ্যালিতে মোটরসাইকেলসহ বেশ কয়েকটি পণ্য অর্ডার করেন। এগুলো সাত থেকে ৪৫ কার্যদিবসের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও তারা (ইভ্যালি) দেয়নি। ইভ্যালির কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিয়ে সমাধান পাওয়া যায়নি। অফিসে গিয়ে তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বললে খারাপ ব্যবহার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও রাসেলের সঙ্গেও দেখা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন বাকের। তার সঙ্গে ইভ্যালি চরম দুর্ব্যবহার করেছে।

সূত্র : আমাদের সময়
এন এইচ, ১৭ সেপ্টেম্বর

Back to top button