অভিমত/মতামত

স্নাতকে অটো পাস নাকি পরীক্ষা

হৃদয় আলম

প্রথমে প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা (পিইসি) এরপর জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) বাতিল হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাতিল করা হয় এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষাও। এছাড়া সর্বশেষ গত ২১ অক্টোবর মাধ্যমিকের বার্ষিক পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ১৯৭১ সালে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তগুলো ছিলো দেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের নিয়ে তেমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ব্রিটিশ আমলে ‘ছুটির বিভাগ’ (ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট) হিসেবে পরিচিত ছিলো শিক্ষা বিভাগ। তবে সাম্প্রতিক করোনা মহামারি বদলে দিয়েছে সমস্ত সমীকরণ। এরইমধ্যে কয়েক দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বেড়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সম্ভাবনা কম। কারণ সরকার কোনো অবস্থাতেই শিক্ষার্থীদের ঝুঁকির মুখে ফেলতে চান না। গত ১৭ মার্চ প্রথম সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৬ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর এই ছুটি শেষ না হতেই তা বাড়ানো হয় ৩১ মে পর্যন্ত। কয়েক দফায় এখন ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি চলমান আছে। যা সামনে আরো বাড়ানো ইঙ্গিত দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে স্বল্প পরিসরে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান এবং সংগ্রহ প্রক্রিয়ার জন্য স্কুল খোলা থাকলেও পাঠদান কার্যক্রমের জন্য আপাতত স্কুল খুলছে না।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আকরাম আল হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। তাই নতুন করে আরো ছুটি বাড়াতে হবে। আগামী ২৯ অক্টোবর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ গোলাম ফারুক জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়তে পারে, তবে কতদিন বাড়বে তা এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেয়া হবে।

এদিকে স্নাতক-স্নাতকোত্তরের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কয়েকটি পরীক্ষা বাদ থাকার কারণে তারা সার্টিফিকেট নিতে পারছেন না। ফলে, বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায়ও তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অভিযোগ, জুনিয়র ব্যাচদের ঠিকই ক্লাস হচ্ছে এবং ক্যাম্পাস খুললে পরীক্ষাও দিতে পারবে। এর ফলে, সিনিয়র-জুনিয়র ব্যাচগুলোর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য থাকবে না।

পাশাপাশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে পরীক্ষা না হলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা হচ্ছে। এর ফলে, তৈরি হয়েছে সেশনজটের শঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে এসব শিক্ষার্থীদের হতাশা বেড়েছে কয়েকগুণ। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটছে।

সম্প্রতি সময়ে বিগত পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবিতে এবং ‘অটো পাস’ চেয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানববন্ধনও করতে দেখা গেছে। তারা সড়ক অবরোধও করেছেন।

এ মানবন্ধনে অংশ নেয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের ক্ষোভের কথা জানান প্রতিবেদককে। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রেজাউল ইসলাম জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজে চতুর্থ বর্ষ (অনার্স) পরীক্ষা চলাকালে পাঁচটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব তথা মহামারীর কারণে অন্যসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজ ও এর সকল পরীক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, কলেজ বন্ধ হওয়ার আগে চতুর্থ বর্ষের অনুষ্ঠিত পাঁচটি বিষয়ের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে বাকি বিষয়ের ইনকোর্স পরীক্ষার নম্বর মূল্যায়ন করে ফল প্রকাশ করা হোক।

মৌখিক ও বিজ্ঞান বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও গড় পদ্ধতি অনুসরণ করে সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন মানববন্ধনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা।

করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট নিরসন ও শিক্ষার্থীদের চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে বিশেষ সুযোগ সৃষ্টির জন্য পরীক্ষা না নিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় ফলাফল দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

ইতিপূর্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে সরকারের সিদ্ধান্তের উপর আমাদের পরীক্ষার ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত জানাবেন বলছেন। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষাবিহীন এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের আমাদের ফল প্রকাশের ব্যাপারে অদ্যবদি কোন সিদ্ধান্ত জানায়নি। এতে আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের আলহাজ মকবুল হোসেন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একই বর্ষের বিভাগের মো. লামিউল ইসলাম জানান, অনার্স চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা চলাকালীন সময় করোনা মহামারীর কারণে তিনটি পরীক্ষা বাকি রেখে সকল শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ কারণে ৬ মাসেও ওই তিন পরীক্ষা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এখনও বাকি পরীক্ষা নেয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি এবং অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আগের পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণপূর্বক ‘অটো পাস’ দিয়ে দ্রুত ফল প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রবিউল ইসলাম নিরব জানান, ইতিপূর্বে তাদের দাবির বিষয়ে শিক্ষার্থীরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। অদ্যাবধি ওই বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তের কথা না জানানোয় সোমবার দেশের বিভিন্ন কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা এ মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেন।

জামালপুরের মাহমুদা সালাম মহিলা কলেজের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষার্থী খুশবু রহমান নিশি জানান, দেশে করোনা মহামারী শুরুর আগে আমাদের ৯টি বিষয়ের মধ্যে ৫টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই ৫টি বিষয়ের সঙ্গে ইনকোর্স পরীক্ষার নম্বর যোগ দিয়ে তাদের ফল প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে স্নাতকের বিষয়ে কী ভাবছে সরকার তা জানিয়ে ২১ অক্টোবর মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অনার্সের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছাড়া ডিগ্রি দেয়া ঠিক হবে না। কারণ এই ডিগ্রি নিয়ে তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবেন। এক্ষেত্রে তাদের কর্মক্ষেত্রেও অন্যভাবে দেখা হতে পারে।

তিনি বলেন, অনার্সের শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছেন তাদের কিছু পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে। আর কিছু পরীক্ষা বাকি আছে। তারা অটো পাসের দাবি জানাচ্ছেন সার্বিক বিবেচনায় অনার্সের শিক্ষার্থীদের অটো পাস দেয়া ঠিক হবে না।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বলেন, ‘আপনি হাফওয়েতে এসে যদি আপনি বলেন পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হোক তবে অসম্পূর্ণ পরীক্ষা হবে। এই ফলাফল নিয়ে আপনি না পারবেন বিদেশে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে। না পারবেন চাকরীর জন্য এপ্লাই করতে। কারণ তারা জানবে আপনি সকল কোর্স সম্পন্ন করে আসেন নাই। এটা শিক্ষার্থীদের জন্য হীতে বিপরীত হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় সেশনজট ভয়াবহ ছিলো। ৪ বছরের অনার্স কোর্স ৭ বছর লাগতো। কিন্তু এখন তা লাগছে না। করোনা না হলে ২০১৯ সালের পরীক্ষা ২০১৯ সালেই হতো। করোনা পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক হয় তবে এই সমস্যা সমাধানে কোন সমস্যা হবে না। আমরা ৩ মাসের মতো ফলাফল দেবো। শুধু সনদ দিয়ে কী হবে? যদি মানসম্মত শিক্ষা হয়।’

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম বলেন, কোনো অবস্থাতেই অটো পাস সম্ভব না। আমরা এখনো এ বিষয়ে ভাবছি না। শিক্ষার্থীদের উচিত যথাযথভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া। অটো পাসের কোনো সম্ভাবনাই আপাতত দেখছি না। চাকরির বাজারে স্নাতক-স্নাতকোত্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা তাই এ বিষয়টাকে অবশ্যই গুরুত্ব দেব।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনোই না খুললেও শিক্ষার্থীদের মেধা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অটো পাসকে ভালো চোখে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তারা সশরীরে না হলেও অন্তত অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেন, অটো পাসের কোনো সুযোগ নেই। কারণ অটো পাসের বিষয়ে ভাবতে হবে প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা করে সিদ্ধান্ত নেবে। এক্ষেত্রে ইউজিসি বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কারণ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেমন তা সেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই বলতে পারবেন। আর এ সময়টা যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমার মনে হয়না অটো পাসের সুযোগ আছে।

‘সময়ের সাথে সাথে আমাদের বদলাতে হবে। অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্তটি এমনই এক বদলে যাওয়া সিদ্ধান্ত। তবে আমি মনে করি এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সবকিছু বিবেচনা করে দেখতে হয়। এখানে অনলাইনে পরীক্ষা নেয়ার পরিবেশ আছে কিনা সেটি আগে খতিয়ে দেখতে হবে। এরপর সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে কিছু পরীক্ষা নেয়া যায়। এসব কিছুর ফলাফল পক্ষে এলে তারপর এই সিদ্ধান্তে আসা যেতে পারে। তার আগে কিছু করা হলে সেটি সবার জন্য মঙ্গল নাও হতে পারে।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এটি অনেক বড় সিদ্ধান্ত। এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কয়েকবছর ধরে কেবল গ্রাউন্ড স্টাডিই করতে হয়, যে এই কাজটি সঠিকভাবে শেষ করা সম্ভব কিনা। এই সিদ্ধান্ত চালু করে দেয়ার আগে আরো বিবেচনা করে দেখা উচিত।’

এন এইচ, ২৪ অক্টোবর

Back to top button