অপরাধ

মতিঝিল আইডিয়ালের অধ্যক্ষের থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো

ঢাকা, ১৩ আগস্ট – রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদ, ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পরই বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল, প্রতিষ্ঠানটির স্বয়ং অধ্যক্ষই নানা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত! তাই অনুসন্ধানকালে যেন তিনি বিদেশ পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য তার দেশত্যাগে আসছে নিষেধাজ্ঞা। পাশাপাশি ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ ও নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের সব সদস্যেরই তথ্য সংগ্রহ করছে দুদক। এমনটাই জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

দুদক সূত্রে জানা যায়, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আতিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ ও নির্মাণকাজের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন, বিভিন্ন ব্যাংকে শত কোটি টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুদক। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ড. শাহান আরাসহ আরও বেশ কয়েকজনের অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য মিলেছে। অনুসন্ধান পর্যায়ে ইতোমধ্যে আতিকের বিদেশগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অধ্যক্ষও যাতে অনুসন্ধানকালে বিদেশ যেতে না পারেন সে জন্য নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করবে দুদক।

এ বিষয়ে জানাতে চাইলে দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) সাঈদ মাহবুব খান বলেন, ‘মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুর্নীতির ঘটনায় একটি অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আর সেটি হচ্ছে দুদকের অনুসন্ধান শাখা-১ থেকে। ঘটনার সঙ্গে অধ্যক্ষেরও জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। আমরা মনে করি এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’ তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, গভর্নিং বডির সদস্য ও সরবরাহকারীÑ যাদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদেরই ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দুদকের। অভিযোগের বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

এদিকে দুদক কর্মকর্তারা জানান, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান খানসহ একটি সিন্ডিকেট ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ ও নির্মাণকাজের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এমন একটি অভিযোগ পায় দুদক। কমিশন তা অনুসন্ধান করতে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মাহবুবুল আলমকে দায়িত্ব দেয়। অনুসন্ধানে নেমে আতিকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যক্তির সহায়তায় নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের তথ্য-উপাত্ত পান অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা। এর পরই অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা জারি করতে ঢাকা মহানগর আদালতে আবেদন করা হয়। আদালত এরই মধ্যে আতিকুর রহমান খানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেছেন।

আদালতে দাখিলকৃত অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়েছে, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের অভিযুক্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা আতিকুর রহমান খানের নামে সাউথইস্ট ব্যাংকে ২৬টি, প্রাইম ব্যাংকে ২৯টি, ঢাকা ব্যাংকে ১০টি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে ১০টি ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে তিনটিসহ মোট ১৫টি ব্যাংকের ৯৭টি হিসাবে ছয় বছরে ১১০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া তার নামে বনশ্রী মসজিদ মার্কেটে ‘বিশ^াস লাইব্রেরি’ নামে বিশাল বইয়ের দোকান, আফতাবনগর বি-ব্লকে ৩৪ নম্বর প্লটে ‘বিশ^াস বাজার’ নামে সুপারশপ, ‘ভিশন ৭১’ নামে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং আফতাবনগর ও বনশ্রীতে পাঁচটি বাড়ি পাওয়া গেছে। তার অর্জিত সম্পদ বিদেশে পাচারের জন্য দেশত্যাগেরও চেষ্টা করছেন। তিনি বিদেশ চলে গেলে তার অনুসন্ধান কার্যক্রম দীর্ঘায়িত বা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দুদকের তথ্য বলছে, আতিকুর রহমান খান ২০০৪ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। ২০১৫ সাল থেকে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সর্বসাকল্যে ৩০ হাজার টাকা বেতন পান। অতিরিক্ত কাজের জন্য পান আরও কিছু ভাতা। অথচ তার ৯৭টি ব্যাংক হিসাবে ১০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে। অভিযোগ আছে ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি সোনার হরিণ হাতে পেয়েছেন। প্রতিবছর স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণিতে অবৈধভাবে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানোর নামে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। এসব অর্থ দিয়েই গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।

জানা গেছে, গাজীপুরের কালীগঞ্জের বাসিন্দা আতিকুর রহমানের বাবা একজন কৃষক। আইডিয়াল স্কুলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কনকর্ড নামে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আয়কৃত অর্থ দিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। এর মধ্যে আতিকুর রহমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, স্ত্রী নাহিদা আক্তার নীপা, বড় ভাই আবদুস সালাম খান, ফজলুর রহমান খান ও শ্বশুর নুরুল ইসলামের নামেও লেনদেন রয়েছে বিপুল অংকের টাকা। এর মধ্যে তার বড় ভাই আবদুস সালাম মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বাংলা মাধ্যম দিবা শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

দুদকের তথ্য মতে, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শাখা ছাড়াও মুগদা ও রামপুরায় পৃথক দুটি শাখা রয়েছে। এই স্কুলে বাংলা মাধ্যমে প্রভাতি ও দিবা এবং ইংলিশ ভার্সনে প্রভাতি ও দিবা শাখায় প্রতিবছর অন্তত তিন থেকে চার হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। প্রতিবছরই অর্থের বিনিময়ে এখানে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়ে থাকে। অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হলেন এই আতিকুর রহমান খান। চলতি বছর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিভিন্ন শাখায় তিন হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে কয়েকশ শিক্ষার্থীকে ভর্তি করানো হয় অর্থের বিনিময়ে। প্রতি শিক্ষার্থীকে ভর্তি করাতে আতিকুল ইসলাম খান নিতেন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।

সূত্র: আমাদের সময়
এম ইউ/১৩ আগস্ট ২০২১

Back to top button