Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

Nuran Nabi

ড. নূরন নবী: নিপুণ সমরকৌশলের জন্য তাঁকে বলা হতো 'দ্য ব্রেইন'। কাদেরিয়া বাহিনীর অন্যতম যোদ্ধা সেই মানুষটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির প্লেইনসবরো শহরের কাউন্সিলর। তাঁর আরেক কীর্তি কোলগেট টোটাল।

পরিবার
নূরন নবী থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে সপরিবারে বসবাস করছেন ১৯৮০ সাল থেকে। ১৯৭৪ সালের ২৬ মে বিয়ে করেন জিনাত নবীকে। তিনিও বিজ্ঞানী। তাঁদের দুই ছেলে- মুশফিক নবী ও আদনান নবী।

শিক্ষা এবং কর্মজীবন
নূরন নবী টাঙ্গাইলের হেমনগর এস এম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে। স্নাতকে খুব ভালো রেজাল্ট করেন। এর পুরস্কারও মেলে। রেজাল্টের পরপরই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটি থেকে। ১৯৮০ সালে জাপানের কিয়োটো ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। উচ্চতর গবেষণার জন্য এরপর চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত 'নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার'-এ পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করেন মলিকুলার বায়োলোজিতে।

মুক্তি যুদ্ধ
২৬ মার্চ, ১৯৭১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে পাকিস্তানি মিলিটারি। মিছিল নিয়ে সে ব্যারিকেড ভেঙে ফেলেন প্রতিবাদী ছাত্ররা। সঙ্গে সঙ্গে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে পাকিস্তানি সেনারা। গুলিবিদ্ধ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। নাম নূরন নবী। তখন তাঁর বয়স মোটে ২০ বছর। কয়েক দিন পর জখম নিয়েই পালিয়ে চলে যান টাঙ্গাইলের নিজ গ্রামে। সুস্থ হয়ে লেগে পড়েন ছাত্র, কৃষক, মজুরসহ সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করার কাজে। গড়ে তোলেন সাধারণ মানুষের এক মুক্তিবাহিনী। পরে সেই দল নিয়ে যোগদান করেন কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীতে।

তিনি যুদ্ধ পরিকল্পনা ও বার্তাবাহকের কাজে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় কমান্ডারদের মধ্যে বহুবার যোগাযোগের কাজ করেছেন। সম্মুখযুদ্ধে জীবন বাজি রেখেছেন অনেকবার। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের জোগান দিতে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতেও গেছেন বেশ কয়েকবার। শুধু তা-ই নয়, ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভারতীয় ছত্রীসেনা টাঙ্গাইলে অবতরণকালে অর্কেস্ট্রাবাদক দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন নূরন নবী।

রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রজীবনেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছিলেন ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। ১৯৬৬-৬৭ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ছাত্র আন্দোলনের ১১ দফা দাবি ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানেও ছিলেন সক্রিয়। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। অসহযোগ আন্দোলনে ছিলেন নির্ভীক সৈনিক।

উদ্ভাবন
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গৃহস্থালি ও স্বাস্থ্যসামগ্রী নির্মাতা কোলগেট-পামঅলিভ কম্পানির গবেষণাগারে যোগ দেন ড. নূরন নবী। মলিকুলার বিজ্ঞানী হিসেবে সেখানে সুনাম অর্জন করতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। কর্মদক্ষতার গুণে অল্প সময়েই পদোন্নতি লাভ করেন। হয়ে যান ওরাল কেয়ার রিসার্চের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর অব টেকনোলজি।
ড. নূরন নবীর কাজের ক্ষেত্র অনেক। পাশাপাশি রয়েছে ৫০টির বেশি গবেষণা। ড. নূরন নবী 'কোলগেট টোটাল'-এর সহ-উদ্ভাবক।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ডেন্টাল স্কুলে দাঁত পরিচর্যার এই নব আবিষ্কারটি নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি। কোলগেট-পামঅলিভ কম্পানির সঙ্গে ড. নবী ছিলেন দীর্ঘ ২২ বছর। সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। তার পরও কাজ তাঁকে পিছু ছাড়েনি। এখন অ্যাপ্লাইড রিসার্চ ও ফটোনিক্স ইন করপোরেশনের শেয়ারহোল্ডার ও বোর্ড অব ডিরেক্টরের সম্মানিত সদস্য, ইনভেন্ট এন্টারপ্রাইজ, এলএলসি নামের একটি কনসাল্টিং কম্পানির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নূরন নবী।

প্রবাসীর রাজনীতি
বাংলাদেশে বসবাসের সময় ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। আমেরিকায়ও তাঁকে পিছু ছাড়েনি রাজনীতি। জনসেবার এ দিকটিই বেছে নিয়েছেন। পরপর দুবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি রাজ্যের প্লেইনবরো শহরের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধার দেশে বাস করলেও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা মোটেও কমেনি তাঁর। আর তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থা, ভালো-মন্দ- সব ধরনের খবর প্রচার ও প্রসারের জন্য নিজেই প্রকাশ করেন একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা। নাম 'প্রবাসী'। সম্পাদক তিনি নিজেই। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসী সম্পাদনা করে চলেছেন। গড়ে তুলেছেন 'ফোবানা (ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা) নামের একটি সংগঠন।

এসব ছাড়াও ড. নূরন নবী যুক্তরাষ্ট্রের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি। পরিষদের সদস্যসংখ্যা ৩০১। ১৯৮০ সালে 'কমিটি ফর ডেমোক্রেটিক বাংলাদেশ' গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ড. নূরন নবীর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে মুক্তিযুদ্ধ। তাই যখনই সুযোগ পেয়েছেন আমেরিকা থেকে শুরু করে বিশ্বের নানা দেশে একাত্তরের নির্মম গণহত্যা নিয়ে কথা বলেছেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে প্রতিষ্ঠা করেন 'কমিটি ফর দ্য রিয়ালাইজেশন অব বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার আইডলস অ্যান্ড ট্রায়াল ফর বাংলাদেশ ওয়ার ক্রিমিনালস'। নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাঙালিদের সেবায় নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি।

তার লেখা বই
রাজনীতি ও গবেষণার পাশাপাশি লেখালেখিতে সমান সক্রিয় ড. নূরন নবী। তাঁর লেখনীতেও ঘুরেফিরে এসেছে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ। দুটি বই লিখেছেন তিনি_'জন্মেছি এই বাংলায়' ও 'আমার একাত্তর আমার যুদ্ধ'। পরে এগুলো ইংরেজিতেও ভাষান্তরিত হয়_'বর্ন ইন বেঙ্গল' ও 'বুলেটস অব সেভেনটি ওয়ান : এ ফ্রিডম ফাইটার্স স্টোরি'।

সম্মাননা
মুক্তিযুদ্ধে দুঃসাহসী ভূমিকার জন্য ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ সাময়িকী ১৯৭২ সালের ৬ মে সংখ্যায় ড. নূরন নবীকে টাঙ্গাইল মুক্তিবাহিনীর 'মাথা' বা 'দ্য ব্রেইন' আখ্যা দেয়। দাঁত পরিচর্যায় অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য পেয়েছেন গ্লোবাল টেকনোলজি অ্যাওয়ার্ড। সিক্স চেয়ারম্যানসের 'ইউ ক্যান মেক অ্যা ডিফারেন্স' পুরস্কারেও সম্মানিত হন। নিউ জার্সির প্লেইনসবরো পৌরসভায় কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য ২০০৭ সালে পুরস্কার দেন মেয়র পিটার ক্যান্টো।

এছাড়াও তিনি
কোলগেট টোটালের সহ-উদ্ভাবক
দাঁতের পরিচর্যার জন্য 'কোলগেট টোটাল' নামের আবিষ্কারটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে পৃথিবীব্যাপী। তিনি ছিলেন এর সহ-উদ্ভাবক। 'কোলগেট টোটাল' হলো দাঁতের জীবাণুনাশক টুথপেস্ট। এটি দাঁতের মাড়ির ফোলা রোধ করে, দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। অনন্য এই আবিষ্কারের জন্য কোলগেট কম্পানি ও বিভিন্ন দেশের অনেক সংস্থা তাঁকে পুরস্কৃত করেছে।

'ফোবানা'র প্রতিষ্ঠাতা
ড. নূরন নবী গড়ে তুলেছেন 'ফোবানা (ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা) নামের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। দায়িত্ব পালন করেছেন ফোবানার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে। ২৭ বছর ধরে আমেরিকা ও কানাডায় বাংলাদেশিদের নিয়ে বার্ষিক আলোচনা ও কনফারেন্সের আয়োজন করে আসছে 'ফোবানা'।
উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ সম্মেলন প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে। পরে যা ফোবানা উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ সম্মেলন বলে পরিচিতি লাভ করে।

প্রধানত তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে ফোবানা সম্মেলন শুরু হয়েছিল_উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পরিচর্যা ও প্রচার, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যোগাযোগ ও পরিচিতি বৃদ্ধি এবং উত্তর আমেরিকার মূলধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলাদেশিদের যোগাযোগ ও সম্পর্কের উন্নয়ন। ২০১৩ সালে ফোবানার সম্মেলন হবে জর্জিয়ার আটলান্টায়।

প্লেইনবরোর কাউন্সিলর
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি রাজ্যের প্লেইনসবরো টাউনশিপের লোকাল গভর্নমেন্টের নির্বাচনে অংশ নেন ড. নূরন নবী। পাঁচ সদস্যের এই গভর্নমেন্টে আছেন একজন মেয়র, একজন সহকারী মেয়র এবং তিনজন সদস্য। তিন সদস্যের একজন ড. নবী। কাউন্সিলর হিসেবে জয়লাভ করেছেন সর্বশেষ ২০১২ সালে। তবে এটিই তাঁর প্রথম জয় নয়। ২০০৭ সাল থেকে পরপর দুবার প্লেইনসবরো শহরের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এর আগে বেশ কয়েক বছর কাউন্সিলের প্ল্যানিং বোর্ডের সম্মানিত সদস্য ছিলেন।

ড. নবী ডেমোক্রেটিক পার্টির সক্রিয় সদস্য। ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে কাউন্সিলর নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। ২০১০ সালের জরিপে এ শহরের লোকসংখ্যা ২২ হাজার ৯৯৯। মজার বিষয় হলো, প্লেইনসবরোতে বাংলাদেশি ভোটারের সংখ্যা মোটে ১২। ড. নবীর নিজস্ব ভোটব্যাংক মোটে চারটি। তিনি নিজে, স্ত্রী ও দুই ছেলে। নূরন নবী নির্বাচিত হয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের ভোটেই। তাঁর দলীয় অন্য সহপ্রার্থী ছিলেন নিল লুইস। প্রতিপক্ষ ছিলেন রিপাবলিকান দলীয় ম্যারিওজি লিওন ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত কৃষ্ণা জগনাথন। নির্বাচনে রিপাবলিকান কৃষ্ণা জগনাথনকে পরাজিত করেন ড. নবী।


Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে