Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-০৮-২০১৭

কেমন ছিলেন বিশ্বকবির মা 'সারদাসুন্দরী দেবী'?

কেমন ছিলেন বিশ্বকবির মা 'সারদাসুন্দরী দেবী'?

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মায়ের নাম সারদা সুন্দরী দেবী। তার সন্তানের সংখ্যা ছিল ১৫ জন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তার চৌদ্দতম সন্তান। রবীন্দ্রনাথের জন্মের সময় সারদা দেবীর বয়স ছিল প্রায় ৩৪ বছর। ১৫ সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মা সারদা দেবী বেশিরভাগ সময়ই অসুস্থ থাকতেন বলে জানা যায়। তার অসুস্থতার মধ্যেও রবি ঠাকুরের সঙ্গে তার সম্পর্ক গাঢ় হয়েছিল। সংসারের একেবারে ছোট সন্তানটি একটু বেশিই যেন আদুরে হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারদা দেবীর কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন না।

কনিষ্ঠ ছিলেন ‘বুধেন্দ্র নাথ’। বুধেন্দ্র নাথ খুব ছোট বয়েসে মারা যাওয়ার কারণে রবীন্দ্রনাথই হয়ে ওঠেন সংসারের ছোট ছেলে। প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিতা না হলেও, সারদাসুন্দরী নিরক্ষর ছিলেন না। তাঁর কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা ‘আমাদের গৃহে অন্তঃপুর শিক্ষা ও তাহার সংস্কার’ প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, “মাতাঠাকুরাণী ত কাজকর্ম্মের অবসরে সারাদিনই একখানি বই হাতে লইয়া থাকিতেন। চাণক্যশ্লোক তাঁহার বিশেষ প্রিয় পাঠ ছিল, প্রায়ই বইখানি লইয়া শ্লোকগুলি আওড়াইতেন। তাঁহাকে সংস্কৃত রামায়ণ-মহাভারত পড়িয়া শুনাইবার জন্য প্রায়ই কোনো না কোনো দাদার ডাক পড়িত।” সাংসারিক ব্যাপারেও কিছুটা উদাসীন ছিলেন সারদাসুন্দরী।

সেকালের ধনী গৃহস্থের গৃহিনী হিসেবে সেটা অবশ্য অস্বাভাবিক ছিল না।  মা সারদা দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেমন স্নেহ বা আদর করতেন, সেই প্রতিফলন রবীন্দ্রনাথের রচনায় খুঁজে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথের রচনায়, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে মায়ের উপস্থিতি অবিশ্বাস্য রকম কম। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘ঘরোয়া'-তে রবীন্দ্রনাথের মাতৃস্মৃতি উদ্ধৃত করেছেন; রবীন্দ্রনাথের জবানিতে ‘মাকে আমরা পাইনি কখনো, তিনি থাকতেন তাঁর ঘরে তক্তাপোশে বসে, খুড়ির সঙ্গে তাস খেলতেন।

আমরা যদি দৈবাৎ গিয়ে পড়তুম সেখানে, চাকররা তাড়াতাড়ি আমাদের সরিয়ে আনতেন যেন আমরা একটা উৎপাত। মা যে কী জিনিস তা জানলুম কই আর। তাইতো তিনি আমার সাহিত্যে স্থান পেলেন না।’ বস্তুত পক্ষে, সন্তানদের ব্যাপারে সারদা দেবীর এই উদাসীন্য তাঁর মন থেকে ছিলো না, তা ছিলো বনেদী বাড়ির প্রতিষ্ঠিত প্রথা।

১৮৭৫ সালের ১১ মার্চ আনুমানিক মাত্র ৪৯ বছর বয়সে সারদাসুন্দরী দেবীর মৃত্যু হয়। রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল তখন তেরো বছর দশ মাস। মায়ের মৃত্যুতেও রবীন্দ্রনাথ তেমন আহত কিংবা তেমন শোকগ্রস্ত হননি। কেন না, বৌদি কাদম্বরী তাকে আগলে রাখতেন। রবীন্দ্রনাথ তার মায়ের মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন ‘মায়ের যখন মৃত্যু হয় আমার তখন বয়স অল্প। অনেকদিন হইতে তিনি রোগে ভুগিতেছিলেন, কখন যে তাঁহার জীবনসংকট উপস্থিত হইয়াছিল তাহা জানিতেও পাই নাই। এতদিন পর্যন্ত যে-ঘরে আমরা শুইতাম সেই ঘরেই স্বতন্ত্র শয্যায় মা শুইতেন।

কিন্তু তাঁহার রোগের সময় একবার কিছুদিন তাঁহাকে বোটে করিয়া গঙ্গায় বেড়াইতে লইয়া যাওয়া হয়- তাহার পরে বাড়িতে ফিরিয়া তিনি অন্তঃপুরের তেতালার ঘরে থাকিতেন। যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে।” তখনই বউঠাকুরানী তাড়াতাড়ি তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া ঘর হইতে টানিয়া বাহির করিয়া লইয়া গেলেন-পাছে গভীর রাত্রে আচমকা আমাদের মনে গুরুতর আঘাত লাগে এই আশঙ্কা তাঁহার ছিল।

স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে- দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না- সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর।

জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকন্যার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না।

বেলা হইল, শ্মশান হইতে ফিরিয়া আসিলাম; গলির মোড়ে আসিয়া তেতালায় পিতার ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিলাম- তিনি তখনো তাঁহার ঘরের সম্মুখের বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া উপাসনায় বসিয়া আছেন।

আর/১০:১৪/০৮ মে

সাহিত্য সংবাদ

আরও সাহিত্য সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে