Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৩-১৩-২০১৭

বিদেশি কোম্পানির দখলে চলে যাচ্ছে পোল্ট্রি শিল্প

নিজামুল হক ও মুন্না রায়হান


বিদেশি কোম্পানির দখলে চলে যাচ্ছে পোল্ট্রি শিল্প

ঢাকা, ১৩ মার্চ- পোল্ট্রি শিল্প, বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। দেশে প্রাণিজাত প্রোটিনের বড় যোগানদাতা পোল্ট্রি শিল্প। তথ্য অনুযায়ী, ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ প্রোটিনেরই যোগান আসে পোল্ট্রি থেকে। বর্তমানে সপ্তাহে উত্পাদিত ডিমের পরিমাণ প্রায় সোয়া দুই কোটি। আর মাংস উত্পাদিত হচ্ছে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১৮শ’ টন। দেশের চাহিদার নিরিখে ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে দ্বিগুণ বিনিয়োগ করতে চান পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা।

২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই খাতে ২৫ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। আর এই বিনিয়োগে গ্রামীণ অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে তেমনি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নানা সংকট ও সমস্যা এ খাতের বিনিয়োগের প্রধান বাধা বলে মনে করেন তারা। এ নিয়ে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের উদ্বেগও রয়েছে। বিদেশি পুঁজি আসার কারণে দেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতা চলছে। বড় পোল্ট্রি ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্র খামারিরা।

এসব নানা সংকটে ২০২১ সালের মধ্যে বিনিয়োগের লক্ষ্য অর্জন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে পোল্ট্রি খামারগুলোকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। তাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তার লক্ষ্যমাত্রা হতে হবে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান সংকট নিরসন করা সম্ভব না হলে এই বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে না।

দাম পাচ্ছে না ছোট খামারিরা : পোল্ট্রির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ হলো একদিন বয়সী বাচ্চা এবং পোল্ট্রি খাবার । কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ সংক্রান্ত নীতিমালা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বর্তমানে বাজারে ব্রয়লার মুরগির একদিনের বাচ্চার দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা। আর লেয়ারের বাচ্চা খামারিদের কিনতে হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। অথচ এক হিসেব থেকে দেখা যায়, ব্রয়লারের একদিনের বাচ্চার উত্পাদন খরচ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। লেয়ারের বাচ্চার উত্পাদন খরচও ৩৫ টাকার কাছাকাছি। অথচ তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিনগুণ দামে। ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সমীক্ষা করে উত্পাদন খরচের ভিত্তিতে মুরগির বাচ্চার দাম বেঁধে দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যে যাতে বাচ্চা বিক্রি হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে।

ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে ছোট ও মাঝারি ধরনের অসংখ্য খামার। এতে খামারিরা পথে বসার পাশাপাশি কাজ হারিয়েছে অনেক শ্রমিক। বাজারে দাম বেড়েছে মুরগির। দাম বেড়েছে বাচ্চারও। খামার পরিচালনার খরচ বেড়েছে। কমেছে মুনাফা।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়ক এসএম সোহরাব হোসেন বলেন, এ শিল্পটি অভিভাবকহীন। নানা সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পোল্ট্রি শিল্প। কোনো নিয়ম-নীতি না থাকায় এ খাতের বড় কোম্পানিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র খামারিরা। তিনি বলেন, একদিনের লেয়ার মুরগির বাচ্চা ১০৫ থেকে ১১৫ টাকা কিনতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক ফায়েজ রাজা চৌধুরী বলেন, এ খাতের বড় কোম্পানিগুলোর কাছে আমরা ছোট খামারিরা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছি। একদিনের ব্রয়লার বাচ্চা কিনতে হচ্ছে ৭২ থেকে ৭৬ টাকায়। এই বাচ্চাকে এক কেজি থেকে এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের বানাতে ৩৫ থেকে ৪০ টাকার খাবার খাওয়াতে হয়। কিন্তু এই ওজনের একটি মুরগি আমরা বিক্রি করছি ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। আমরা মুনাফাতো দূরের কথা মুরগি বিক্রি করে লোকসান গুনছি।

তিনি বলেন, সরকার ২০১৪ সালে যখন একদিনের ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার দাম ৩২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। পরে তা হাইকোর্টে রিট করে স্থগিত করা হয়। তখন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর তাদের হিসেবে একদিনের ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার উত্পাদন খরচ দেখিয়েছিল ২৪ টাকা। তিনি বলেন, গত এক বছরে এ বিষয়ে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে কমপক্ষে ২০ থেকে ২২টি সভা হয়েছে। কিন্তু এর কোনো সুরাহা হয়নি।

এগ প্রডিউসারস্ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন বলেন, দেশের কিছু বড় বড় কোম্পানি ও বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানির হাতে চলে যাচ্ছে পোলট্রি ব্যবসা। আমরা ক্ষুদ্র খামারিরা এখন কোনঠাসা। তিনি বলেন, আমরা প্রতি পিস সাদা ডিম বিক্রি করছি ৫ টাকা ২০ পয়সায়। তাহলে কিভাবে আমরা টিকে থকবো। সরকার যদি ক্ষুদ্র খামারিদের প্রতি নজর না দেয় তাহলে পোলট্রি শিল্পে ক্ষুদ্র খামারিরা টিকে থাকতে পারবে না।

এ প্রসঙ্গে পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা-২০০৮ প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এস. এম. বুলবুল বলেন, পোল্ট্রি নীতিমালা না মানার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ফিডের মান এবং মেডিসিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। ফিডের দাম অনেক বেশি। ফিড মিল মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফা করছে। তিনি বলেন, এই ব্যবসা কিছু লোকের হাতে বলে আমার মনে হয়। এ কারণে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ যেভাবে হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হচ্ছে না।

অগ্রিম আয়করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা : তথ্য অনুযায়ী, পোল্ট্রি উত্পাদনে যে খরচ হয় তার ৬৮ শতাংশ খাদ্য খরচ, ১৮.৫ শতাংশ বাচ্চা কেনার খরচ, ৫ শতাংশ ওষুধের খরচ, ৪ শতাংশ শ্রমিকের মজুরি এবং বাকি অন্যান্য খরচ। বর্তমানে এসব খরচ অনেক বেড়ে গেছে। সারাবিশ্বে পোল্ট্রি খাদ্যের অন্যতম উপকরণ ভুট্টার উত্পাদন কমায় দাম বেড়েছে। আমাদের প্রয়োজনীয় ভুট্টার ৪০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এর উপর আবার বসানো হয়েছে অগ্রিম আয়কর, যার কারণে বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ীরা।

তাছাড়া পোল্ট্রি শিল্পের কাঁচমাল সয়াবিন মিল ও ওয়েল কেকের উপর যথাক্রমে ১০ ও ৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পোল্ট্রি খাদ্যেও দাম বেড়ে গেছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।

ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন যাবত্ পোল্ট্রি শিল্পের আয় করমুক্ত ছিল। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ শিল্পের কর অব্যাহতি সুবিধা তুলে নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। চলতি অর্থবছরেও তা অব্যাহত আছে।

অসম প্রতিযোগিতায় খামারিরা: বর্তমানে দেশে পোল্ট্রি শিল্পে ৭টি বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে ৫টি ভারতের, ১টি থাইল্যান্ডের ও ১টি চীনের। এগুলো দেশের পোল্ট্রি শিল্পের প্রায় ৩০ ভাগ পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের সঙ্গে এক অসম প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে দেশি খামারগুলোর। বিদেশি অর্থপুষ্ট খামারগুলো বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে আসছে ৩ থেকে ৪ শতাংশ সুদে। অথচ আমাদের খামারগুলোকে ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। এমনকি বিদেশি খামারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় বড় খামারগুলোও হিমশিম খাচ্ছে। ঝরে পড়ছে ছোট খামারগুলো। বর্তমানে কৃষিখাতে মসলা ফসল চাষের জন্য ৪ শতাংশ সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দেয়া হচ্ছে। দুগ্ধ খামার গড়ে তোলার জন্য পশু কিনতে ঋণ দেয়া হচ্ছে ৫ শতাংশ হারে। ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, আমাদের পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ৪ থেকে ৫ শতাংশ সুদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এছাড়া ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।

এফ/০৯:০০/১৩মার্চ

ব্যবসা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে