Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.5/5 (61 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-২৩-২০১৬

নতুন মর্যাদায় বাংলাদেশ

নতুন মর্যাদায় বাংলাদেশ

এবারের বিজয় দিবসের প্যারেডে সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বিশালভাবে প্রকাশ হয়েছে। যারা প্যারেড প্রত্যক্ষ করেছেন, টেলিভিশনে দেখেছেন, তারা নিশ্চয় বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ৪৫ বছর পর প্যারেডে যেমন জাঁকজমকভাবে অংশগ্রহণ করল তাতে সবার মনেই একটি নতুন আত্মবিশ্বাস বা গর্ব তৈরি হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর প্রদর্শিত আধুনিক অস্ত্রসমূহ মানুষের মনে অন্তত এটুকু আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে, বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে না, দেশের সার্বভৌমত্ব ও বিশাল সম্পদ রক্ষায় তাদের সক্ষমতা ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলছে। স্বাধীনতার শুরু থেকেই প্রতিরক্ষা বাহিনী নিজেদের আধুনিক যুদ্ধে সক্ষম করে তোলার জন্য একদিকে যেমন তাদের কলেবর বাড়িয়েছে, অন্যদিকে সজ্জিত হয়েছে প্রথাগত অত্যাধুনিক অস্ত্রে। এটি বিমান, সেনা ও নৌ সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য।

আধুনিক যুদ্ধে জ্ঞান এবং কৌশল শিখতে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এখানে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছে। যারা বাংলাদেশকে যুদ্ধের সরঞ্জাম দিতে রাজি হয়নি তারাও উচ্চমানের প্রশিক্ষণ বা কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেই শুধু নয়, বিশ্ব শান্তি স্থাপনে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশেষ অবদান রেখে চলেছে যেটি বিশ্বের পরাশক্তি  থেকে শুরু করে সব দেশই অকপটে স্বীকার করে।

প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রবৃদ্ধি বা সক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে অনেকেই প্রশ্ন তুলে থাকেন এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। তারা বিশ্বের নতুন ঝুঁকি সম্পর্কে না জেনেই বলে থাকেন। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ একটি দেশ হিসেবে কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় সবার সঙ্গেই বন্ধুত্বের নীতি অনুসরণ করে চলেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশের বিরোধসমূহ নিরসনের জন্য সামরিক শক্তির প্রয়োগের চেয়ে কূটনীতি ও পারস্পরিক আলোচনাকে ভিত্তি হিসেবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের হুমকি আগের দিনে মনে করা হতো প্রতিবেশী দেশ থেকেই আসবে।

প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিন্নতা ঝুঁকির উৎস যখন তাদেরকেও একইভাবে চিন্তিত করে তখন নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার কৌশল দেশের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বরাজনীতি পরাশক্তির আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং অপ্রথাগত ঝুঁকি মোকাবেলা করতে বিশ্বায়িত সমাজে সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের বর্তমান ঝুঁকির বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো শান্তিপূর্ণভাবে নিরসন হওয়ায় এবং পূর্ব পাশে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে অনিষ্পন্ন বিরোধসমূহ ঝুঁকির প্রকৃতিকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।

ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি ও সমুদ্র সীমা নির্ধারণের পর বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো অনেক সংকুচিত হয়েছে। ফলে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মাত্রা অনেক বেড়েছে। এবং দুই দেশের ভিতরে সামরিক সংঘর্ষের সম্ভাবনা ক্রমেই উবে যাচ্ছে। জঙ্গিবাদের বিশ্বায়ন, আন্তঃদেশীয় সংঘটিত অপরাধচক্রের অস্তিত্ব, মাদক ও মানব পাচারের ঝুঁকি যুদ্ধক্ষেত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সামরিক শক্তি বিদেশি আগ্রাসন মোকাবেলার চেয়ে এ সব অপ্রথাগত অপশক্তির ঝুঁকি মোকাবেলায় নতুন সক্ষমতা তৈরির প্রয়োজনীয়তা আগের থেকে অনেক বেড়েছে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সম্পদ রক্ষার দায়ও বাড়ছে। আগামী দিনের বৈরী শক্তিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে আঞ্চলিক দেশগুলোকেও সমানভাবে আক্রান্ত করে। ঝুঁকির বিশ্বায়ন স্বভাবতই দেশীয় প্রতিরক্ষা শক্তি দিয়ে এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। ফলে সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার ধারণা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্যতীত নতুন যুদ্ধে জয়লাভ করার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেয়। তাই সামরিক দেশীয় সক্ষমতা ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট না হলে সহযোগিতার পথটাই অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান ঝুঁকি মোকাবেলায় এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক সক্ষমতার পরিমাণ যথেষ্ট না হলেও আগ্রাসনের ঝুঁকি মোকাবেলায় যথেষ্ট মনে হয়। কারণ আন্তঃদেশীয় যুদ্ধের সম্ভাবনা কৌশলী পররাষ্ট্র নীতির কারণে অনেক কমেছে। আগ্রাসী শক্তি সহজেই বাংলাদেশের মাটির অধিকার নিতে সক্ষম হবে না। কারণ তাকে গুনতে হবে অনেক মূল্য। ভারত-পাকিস্তান বিরোধ দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। চীন-ভারত আধিপত্যের প্রতিদ¦ন্দ্বিতা ভবিষ্যতের সামরিক সংঘর্ষকে উস্কে দিতে পারে। তাদের দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা বাংলাদেশকেও ঝুঁকির বৃত্তে নিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ দূরপাল্লার অস্ত্র ও পারমাণবিক প্রতিযোগিতায় এখনো মাঠে নামেনি। স্বভাবতই দূর আক্রমণের হুমকি মোকাবেলায় বন্ধু রাষ্ট্রের সক্ষমতাকেও আমাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় অঙ্গীভূত করার আবশ্যিকতা রয়েছে। বাংলাদেশের যুদ্ধ সরঞ্জামের তালিকায় সাবমেরিন, মিগ ২৯, নতুন প্রজন্মের ট্যাঙ্ক ও কামানসহ মিসাইল সক্ষমতা অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশের এই সামরিক সক্ষমতাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করার প্রয়াসে লিপ্ত হয়েছে তাদের অনেকে। এতে বিশ্বশান্তি স্থাপনের দিক যেমন আছে, তেমনি এরই ধারাবাহিকতায় দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের কোনো কোনো দেশ জঙ্গিবিষয়ক আন্তঃদেশীয় সংঘাত প্রতিরোধে বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার জন্য স্বভাবতই নতুন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বসভায় নিঃসন্দেহে উপযুক্ত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাংলাদেশকে নতুন মর্যাদায় স্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক তৈরি এবং বিশ্বে শান্তি স্থাপনে বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের মধ্যেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় যুক্ত হবে। উন্নয়নের গতিধারার সঙ্গে নতুন নতুন ঝুঁকি বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হবে। নতুন ঝুঁকি থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে একটি সক্ষম সামরিক বাহিনীর কোনো বিকল্প নেই।

সামরিক বাহিনীকে শুধু প্রথাগত যুদ্ধে প্রশিক্ষিত হলেই চলবে না, অপ্রথাগত যুদ্ধে জয়ী হতে সমানভাবে সক্ষম হতে হবে। নতুন ধারণা, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, কৌশল নিয়ে তৈরি ও সজ্জিত হতে হবে, যাতে করে হঠাৎ করে উত্থিত ঝুঁঁকি ও দুর্যোগ মোকাবেলায় সামরিক বাহিনী সমানভাবে পারদর্শী হয়। ত্বরিত গতিতে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে গিয়ে অভিযান চালানোর মতো গতিশীলতা ও লজিস্টিকস সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। ইতিমধ্যে অনেক অগ্রগতি হলেও আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে।

প্রথাগত ঝুঁকির চেয়ে অপ্রথাগত ঝুঁকির মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখ-তা ও সম্পদ রক্ষার জন্য সক্ষম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি ও উন্নয়নের গতিধারা বজায় রাখার মধ্যে অবশ্য একটি ভারসাম্য ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় কৌশলগত দিক থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ঝুঁকিগুলোকে চিহ্নিত করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো ঢেলে সাজাতে পারলে বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে।

লেখক: মো. আবদুর রশীদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

আর/১০:১৪/২৩ ডিসেম্বর

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে