Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.5/5 (52 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১২-২০-২০১৬

জাতীয় দিবস উদ্‌যাপনেরও নীতিমালা প্রয়োজন

সৈয়দ আবুল মকসুদ


জাতীয় দিবস উদ্‌যাপনেরও নীতিমালা প্রয়োজন

ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ অন্যের কাছে শ্রুতিমধুর হওয়ার কথা নয়। মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও বেগম হামিদের দাওয়াতে বঙ্গভবনে সংবর্ধনায় যোগ দিতে পারিনি। মহামান্য রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে উপস্থিত থাকা কর্তব্য মনে করি। গত ৪৪ বছরে এই প্রথম বঙ্গভবনে বিজয় দিবসে যেতে পারলাম না। টিএসসি, শাহবাগ ও কার্জন হলের সামনে রাস্তায় বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত গাড়ির মধ্যে আমার ধর্মপত্নী ও আমি বসে থাকি। ওভাবে আটকে থেকে যতটা কষ্ট পেয়েছি, বঙ্গভবনে যেতে না পেরে দুঃখ পেয়েছি ঢের বেশি। পরলোকগত মো. জিল্লুর রহমানের মতো আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতিও নিরহংকার, বিনয়ী ও বিশেষ ভালো মানুষ। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া ও দুটো কথা বলা আনন্দদায়ক। সেই আনন্দ থেকে বিধাতা আমাকে বঞ্চিত করলেন।

আমি আমার সারা জীবনে দেশে ও দেশের বাইরে কোথাও এত বেশি বাস ও ট্রাকভর্তি মানুষ দেখিনি। এত মানুষও রাস্তাঘাটে দেখিনি কোনো দিন। জাতির ইতিহাসের সেই ৭ মার্চের জনসভায় শহর ও শহরতলি থেকে যে যাঁর যাঁর মতো সুশৃঙ্খলভাবে সোহরাওয়ার্দী ময়দানে এসেছেন। পায়ে হাঁটা, ট্রাকের ওপর দাঁড়ানো ও বাসের ভেতরে বসা বা ছাদে দাঁড়ানো অত মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। বিপ্লবের পরে লেনিনগ্রাদে, লংমার্চের পর বেইজিং তিয়েনআনমেন স্কয়ারে, যেখানে দাঁড়িয়ে মাও সেতুং ‘চায়না স্টুড আপ’ বা চীন উঠে দাঁড়িয়েছে কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন; অথবা শাহের পতনের পর ইসলামি বিপ্লব ঘটিয়ে যেদিন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি প্যারিস থেকে তেহরান পৌঁছান, সেদিনও সম্ভবত অত লোক রাস্তায় ছিল না, গত শুক্রবার ঢাকার রাস্তায় যা দেখেছি। 

এরই নাম আমাদের মিডিয়া দিয়েছে ‘বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস’। পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে উচ্ছ্বাসপ্রবণতা আছে, তাদের উচ্ছ্বাসে তারা বাঁধ দিতে জানে এবং সেই বাঁধ তারা শক্ত করেই দেয়, যেন কোনো কিছুর ধাক্কায় তা সহজে ভেঙে না যায়। ধাক্কা জিনিসটা যে সব সময় মূর্ত হতে হবে তা নয়, বিমূর্ত ধাক্কাও আছে এবং বিমূর্ত ধাক্কা সবচেয়ে মারাত্মক। যেমন দেশের জন্য প্রেমের ধাক্কা এবং স্বাধীনতা শব্দটির জন্য ভালোবাসার ধাক্কা। বাঙালির এই ভাব দেখেই মনের দুঃখে বাংলা ভাষার একমাত্র নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি বলেছিলেন, আই অ্যাম নট অ্যা প্যাট্রিয়ট, আমি দেশপ্রেমিক নই, আমি আমার ‘কম্প্যাট্রিয়ট’ বা স্বদেশবাসী ও স্বজন খুঁজি বিভিন্ন দেশে, সব জাতির মধ্যে। যে সবাইকে ভালোবাসতে পারে না সে তার নিজের দেশ ও দেশবাসীকে কতটা ভালোবাসতে পারে?

বিস্ময়ের সঙ্গে আমার স্ত্রী ও আমি ঘণ্টা দুই তাদের মধ্যে থেকে লক্ষ করলাম ট্রাকারোহীদের বয়স আনুমানিক পনেরো থেকে তিরিশ। তাদের গড় উচ্চতা চার ফুট দুই ইঞ্চি থেকে চার ফুট দশ। তাদের ৯০ শতাংশই হালকা-পাতলা। তাদের কেউ কেউ খুবই পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। পোশাক ও স্বাস্থ্য দেখে অনুমান করা যায় এরা কোন আয়ের মানুষ। তবে সম্ভবত প্রায় সবার হাতেই চার ইঞ্চি আকারের একটি আধুনিক বস্তু আছে। তা যে আছে তা বোঝা গেল তাদের অনেকেরই একটি হাত কানে লাগানো দেখে। কেউ উচ্চ স্বরে কথা বলছে দূরের কোনো প্রিয়জনের সঙ্গে। কেউ নিশ্চল ট্রাকের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে নিজের বদনখানির সেলফি করছে। অনেকে দোয়েল চত্বরের ফোয়ারার দিকে পিঠ দিয়ে দুই বন্ধুতে গলা জড়িয়ে সেলফি তুলছে।

যাঁরা রাজপথে নেমে এসেছেন তঁারা সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং একই দলের কর্মী-সমর্থক। বাস-ট্রাকের আরোহী হোক বা নিজের দুই পায়ে হাঁটা পথচারী হোক, এই বয়সী আনন্দ প্রকাশকারীরা জানে না তাঁদের দেশটির মতো তাঁদের নিজেদেরও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অধিকাংশেরই ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই। এরা কেউই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া নয় বলেই প্রতীয়মান হলো।

শাহবাগ-টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর-শহীদ মিনার পর্যন্ত যে জনসমাবেশ, তাতে অবশ্য মেয়েদের সংখ্যা কম। মেয়েদের অনেকে লাল-সবুজ কাপড় পরে মাথায় ফুলের মুকুট পরে হাঁটাহাঁটি করছে অথবা মোবাইল ফোনে কথা বলছে কিংবা সেলফি তুলছে। যখন বেলা পড়ে গেল, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, নেমে এল রাত, মেয়েরা তখনো রাস্তায়। লাখো মানুষের ভিড়ের ভেতরে মেয়েদের জন্য দুশ্চিন্তা হলো। বঙ্গীয় সব যুবকের স্বভাব নির্মল হবে তা প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়ে ধারণা করা সম্ভব নয়।

জাতির খুশির দিনে এক দল মনোনীত মানুষ ট্রাকে-বাসে নগর ঘুরবে আর কেউ বেজার হয়ে মুখ ভার করে ঘরে বসে টিভিতে ক্ষমতাসীন দলের পরিকল্পনার মতো আনন্দযজ্ঞ দেখবে, তা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন করে না। রাজনীতিতে সরকারি-বেসরকারি লোক আছে, আনন্দ প্রকাশে সরকারি-বেসরকারি বলে কিছু নেই। অপজিশনের লোকদের ট্রাক-বাস ভাড়া করার টাকার কমতি থাকতে পারে, তাদের আনন্দ বাঁধভাঙাও হবে না, কিন্তু তাদেরও জাতীয় দিবসগুলোতে আনন্দ প্রকাশের ইচ্ছা হতে পারে। সে আনন্দ প্রকাশ থেকে তাদের বঞ্চিত করা অসংগত। আনন্দ জিনিসটি হবে স্বতঃস্ফূর্ত। বাধ্যতামূলক আনন্দ হলো ক্রীতদাসকে বেত্রাঘাত করে হাসানোর মতো।

শুধু মানুষ ও বাস-ট্রাক পথ রোধ করেছে তা-ই নয়, ইঞ্চি ইঞ্চি করে নীলক্ষেত, ঢাকা কলেজ হয়ে ফেরার পথে দেখি ভিড়ের ভেতরেই হাতি। তার পিঠে হাওদায় কিশোর বয়সী কয়েকজন বসা। শুঁড় উঁচিয়ে হাতি কখনো বাঙালিদের অভিবাদন দিচ্ছে। হাতি ধীর পদক্ষেপে হাঁটছে। তার সামনে একটি বা দুটি ভ্যানগাড়িতে কাগজ বা কাপড়ের নৌকা। ছোটখাটো না, মস্ত বড়। নির্বাচনী সমাবেশ নয়, তবু নৌকা কেন? ওই প্রকাণ্ড প্রাণীটি যদি আমাদের মতো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে তাহলে কতজন যে মারা যাবে ওর পায়ে পিষ্ট হয়ে, কিংবা শুঁড়ের প্যাঁচে আছাড় খেয়ে, তা বলা সম্ভব নয়। যে জনারণ্যে শিশু-কিশোরেরা থাকে, সেখানে এ–জাতীয় পশু নিয়ে আসা কতটা  সুবুদ্ধির পরিচয় তা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভেবে দেখা দরকার। হাতি যদি বিরোধী দলের সমর্থক হয়ে ওঠে তাহলে ৯০ দিনের হরতাল-অবরোধের সময়ের দশা হতে পারে।

যে নগরের রাজপথে হাতি আছে, সেখানে ঘোড়া না থেকেই পারে না। ঘোড়ায় টানা গাড়ি টমটম চলেছে বাস-ট্রাকের সঙ্গে অথবা পেছনে। গাড়ি ছাড়া শুধু ঘোড়াও কিছু দেখা গেল। তার পিঠেও মানুষ দু-একজন। তাদের কারও হাতে বাঁশ ও কাগজের তৈরি নৌকা অথবা বিরাট আকারের বেলুন প্রভৃতি।

যে জিনিসটির কথা এতক্ষণ উল্লেখ করা হয়নি, তা হলো ডিজিটাল ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড। তা যে কত আকারের এবং সংখ্যায় কত, তা গুনে শেষ করা সম্ভব নয়। তাতে শুধু স্লোগান লেখা নয়, সেগুলোর ওপরের দিকে অবধারিতভাবে তিনটি ছবি, তার পাশে বা নিচে কোনো ওয়ার্ড বা পাড়ার নেতা বা তস্য নেতার প্রকাণ্ড ছবি। প্রকাণ্ড নেতার যাঁরা শুভার্থী, সেই ‘সৌজন্য’কারী বা চামচাদেরও অনেক ছোট ছোট ছবি।

খুব বড় বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের ভেতর দিয়েই দেশ স্বাধীন হয়েছে। বিশেষ করে উনসত্তর থেকে একাত্তর পর্যন্ত যে আন্দোলন হয়েছে, তাতে সব শ্রেণির লাখ লাখ মানুষ রাজপথ উত্তাল করে রেখেছে। সেসব আন্দোলনে আওয়ামী লীগের 
ভূমিকা ছিল বেশি। হাজারো মানুষ রাজপথে থাকত, স্লোগান দিত, বিক্ষোভ করত, কিন্তু জনজীবন বিপর্যস্ত হয়নি। জাতীয় দিবসগুলোর উদ্‌যাপনও জনগণই করবে। তখনো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলবে, সেটাই হলো সুস্থ অবস্থা। আন্দোলনের জন্যই হোক বা আনন্দ প্রকাশের জন্যই হোক, এমন কোনো অবস্থার সৃষ্টি করা অন্যায়, যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। অনেকগুলো বড় হাসপাতাল যে এলাকায়, সে এলাকার সব রাস্তা একটি দিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া চরম নিষ্ঠুরতা। দেখলাম, জগন্নাথ হলের কাছ থেকে এক মরণাপন্ন রোগীকে তাঁর দুই ছেলে বা আত্মীয় ধরাধরি করে কোলে নিয়ে মেডিকেল হাসপাতালে যাচ্ছে। দৃশ্যটি আমাকে মর্মাহত করে।

আমাদের দেশব্রতী প্রশাসন দেশের মানুষের কল্যাণ ও সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করে বিরোধী দলকে তাদের সভা-সমাবেশ করতে দেয় না। জনগণ তাতে খুবই সন্তুষ্ট। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের অনুমতি পেতে কর্তৃপক্ষের দুয়ারে ঘুরতে ঘুরতে নেতাদের জুতার শুকতলি ক্ষয় হয়ে যায়। অনুমতি পাওয়ার পরেও কোথাও কোথাও অনুষ্ঠানের স্থানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে যে কেউ তা সমর্থন করে। জাতীয় দিবসগুলো উদ্‌যাপনের ক্ষেত্রেও জেলা প্রশাসন ও পুলিশের বিশেষ দায়িত্ব থাকে, যাতে উৎসবে অংশগ্রহণ করার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত না হয়।

আমাদের একটা চরিত্র দাঁড়িয়ে গেছে তা হলো হাত-পায়ের এস্তেমাল। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠানেও আমাদের স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না। সরকারি দলের জনপ্রতিনিধি জুতা পায়ে শহীদ মিনারে উঠে যান। শহীদ বেদিতে ফুল দেওয়া নিয়ে মারামারি। কারও ফাটে নাক, কারও ভাঙে পাঁজরের হাড়। আলোচনা সভাগুলোর যে চেয়ার তা বসার জন্য, ছোড়াছুড়ির জন্য নয়, কারও মাথা ফাটানোর জন্য তো নয়ই। এসবও এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু মেয়েদের গায়ে হাত। তাদের শ্লীলতাহানি? এবার বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে পাবনাসহ কয়েকটি জায়গায় মেয়েদের শ্লীলতাহানির খবর শুনে অবাক হইনি, তবে কষ্ট পেয়েছি।

পৃথিবীর সেরা শিক্ষানীতিসহ বহু নীতি রচনা করেছে আমাদের রাষ্ট্র। বিভিন্ন নীতির কপিতে ভরে গেছে আমাদের আলমারি। মহান জাতীয় দিবসগুলো কীভাবে ক্ষমতাসীন দল, ক্ষমতাসীনদের উপদল, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষ স্বাধীন ও সুষ্ঠুভাবে উদ্‌যাপন করবে, তারও একটা নীতি থাকা দরকার। সরকারি দলের কুড়িয়ে আনা লোকদের বাসে-ট্রাকে করে নিয়ে এসে রাস্তাঘাট ভরে ফেললে সাধারণ নাগরিকদের ওই সব দিবস উদ্‌যাপনে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। বিষয়টি ভেবে দেখতে নীতিনির্ধারকদের প্রতি করজোড়ে প্রার্থনা করি।

লেখক : সৈয়দ আবুল মকসুদ, লেখক ও গবেষক।

আর/০৮:১৪/২০ ডিসেম্বর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে