Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.6/5 (199 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ১০-০৭-২০১৬

বিচারের দাবি!

শাহেদীন মালিক


বিচারের দাবি!

‘বিচারের দাবি নীরবে নিভৃতে কাঁদে’, প্রসঙ্গ সেটা নয়। প্রসঙ্গ, বিচারের দাবি উঠছে।

সর্বশেষ খাদিজার আক্রমণকারী হত্যাচেষ্টার আসামি বদরুলের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল আর আন্দোলনে নেমেছে তঁার সহপাঠীরা। যোগ দিয়েছে অন্যান্য কলেজ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা।

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্রছাত্রীরা দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, এমনকি মাসের পর মাস দাবি জানাতে মানববন্ধন এবং অন্যান্য বহু কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, বেশ অনেক ত্যাগের বিনিময়ে।

ছাত্রছাত্রীরা ছাড়াও বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের পর ইদানীং নাগরিক সমাজও সোচ্চার হয়েছে। একমাত্র নারায়ণগঞ্জেই সাত খুন, ত্বকী হত্যা এবং হত্যা না হলেও শিক্ষক লাঞ্ছনার অপরাধের বিচারের দাবিতে রীতিমতো নাগরিক আন্দোলন হয়েছে। দাবি উঠেছিল, আন্দোলনও হয়েছিল, সিলেটের রাজনসহ ইদানীংকালে বেশ কয়েকটি শিশুহত্যা ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়।

বীভৎস বা চাঞ্চল্যকর অপরাধের গড় বিচারের দাবি, সেই দাবিতে আন্দোলন করা বেশ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাই হয়ে যাচ্ছে।

২. রাষ্ট্রের কাছে যেসব প্রত্যাশা স্বাভাবিক, সেগুলো কি ক্রমান্বয়ে অস্বাভাবিক বা অসম্ভব হয়ে উঠছে? স্বাভাবিকটাই ঠিক এখন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তাই দাবি উঠছে, যেটা স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্য, সেটা চাপ সৃষ্টি করে বা জোর করে আদায় করে নেওয়ার জন্য। ২০০১-০৬–এর বিএনপি জোটের আমলের শেষের দিকে নির্বাচনটা যাতে তাদের অনুকূলে যায়, সে জন্য সেই সরকার সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী করে বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়াল। আওয়ামী লীগ বলল, এটা করা হয়েছিল একজন বিএনপিমনা সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ পাইয়ে দেওয়ার জন্য। খুঁজে পেতে অযোগ্য আজ্ঞাবহ আরেক বিচারপতিকে করা হলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তাঁর চেয়েও আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ হয়ে গেলেন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।

সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে যেটা স্বাভাবিক ব্যাপার, অর্থাৎ সুষ্ঠু নির্বাচন—সেটাকে অস্বাভাবিক করে তুলতে যত রকম ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া সম্ভব তার সবকিছুই করা হলো।

বিগত বিএনপি সরকারের আমলে স্বাভাবিককে অস্বাভাবিক বানিয়ে তার ফায়দা নেওয়ার অপচেষ্টাগুলোর খেসারত ১০ বছর পরও দিতে হচ্ছে। দিতে হবে আরও বেশ কিছুদিন।

৩. কোনো দেশ বা সরকার এটা কখনোই নিশ্চিত করতে পারেনি যে সমাজে মোটেও অপরাধ হবে না। রাষ্ট্র এবং সরকার যেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে তা হলো, অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীকে খুঁজে বের করে আইন অনুযায়ী স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে বিচার হবে। বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে আইনানুযায়ী নির্ধারিত শাস্তি দেওয়া হবে।

এই স্বাভাবিক ব্যাপার এখন সম্ভবত আর স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না। অন্তত অপরাধের শিকার ভুক্তভোগী এবং অথবা তাঁর নিকটজনেরা এই স্বাভাবিক ব্যাপারটা—অর্থাৎ অপরাধীর বিচার হবে, সেই ভরসাটা আজকাল ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তারই প্রতিফলন হচ্ছে বিচারের দাবিতে স্লোগান, মানববন্ধন, দাবিদাওয়া, মিছিল, বর্জন—কোনো কোনো ক্ষেত্রে হরতালও হয়েছে, হয়েছে ভাঙচুরও। পাথরে খোদাই করা লিখিত আইন পাওয়া গেছে সাড়ে চার হাজার বছরের পুরোনো সমাজে। হাজার তিনেক বছর আগ থেকে যেসব ধর্মের লিখিত ধর্মগ্রন্থ আছে, তার প্রতিটিতে আইন ও নিয়মকানুনের কথা বলা আছে। বলা আছে বিচারের কথা, ইহজাগতিক এবং পরজাগতিক উভয় ক্ষেত্রে।

বিচারটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনে হচ্ছে আজকের বাংলাদেশে এটা এখন দাবির ব্যাপার। সম্মিলিতভাবে দাবির ব্যাপার। আশঙ্কা, সম্মিলিতভাবে দাবি না করলে হয়তো পাওয়া যাবে না। দাবি করলেই যে পাওয়া যাবে, তা-ও তো না। সোহাগী জাহান তনু, ত্বকী—উদাহরণের ফিরিস্তি দীর্ঘায়িত করা অনাবশ্যক।

৪.বহুদিন ধরেই বলছি, লিখছি, বিচার না থাকলে সমাজ থাকে না। বিচার বাদ দিলে কিছু স্বল্পমেয়াদি চাকচিক্য প্রায় দেখা যায়, কিছু জৌলুশ ভাব আসে। যেমন আজকাল দেখা যায় বেশ কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-সদস্যদের মধ্যে।

আমাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস এখন এক যুগেরও বেশি। ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে বিএনপির সংসদ যৌথ অভিযান (দায়মুক্তি) আইন, ২০০৩ পাস করে আইনে বলে দিয়েছিল যে অপারেশন ক্লিন হার্টের কারণে যাঁদের মৃত্যু, অর্থাৎ যৌথ বাহিনীর নির্যাতনের কারণে যাঁরা নিহত, আহত, পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ হয়েছেন, অথবা সম্পত্তি হারিয়েছেন, তাঁরা আদালতে বিচার চাইতে পারবেন না। বিচার না হতে হতে বর্তমান আমলে এসে বিচার দাবিতে পরিণত হয়েছে।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের হলফনামায় স্পষ্ট দেখা গেল, কীভাবে সম্পদের পাহাড় গড়া হয়েছে পাঁচ বছরে। দুদক বলল, এঁরা কেউ দুর্নীতি করেন নাই। সম্ভবত সবাই ইমানদার মৎস্য ব্যবসায়ী। কোনো সমাজেই সব অপরাধীর দোষ প্রমাণিত হয় না। কিন্তু যে সমাজে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ক্রমান্বয়ে চলতে থাকে, সেই সমাজে আজ হোক কাল হোক স্বাভাবিক বিচার দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠতে বাধ্য। তাই এখন ঘন ঘন বিচারের দাবি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, রীতিনীতি ক্রমান্বয়ে বিলীন হতে বাধ্য।

৬ অক্টোবর একটি  দৈনিক পত্রিকা শিরোনাম করেছে, ‘সড়কে শৃঙ্খলা নেই’। আরেকটা শিরোনাম, ‘সড়কে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ’। এগুলো  বিচারহীনতারই প্রতিফলন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৫ অক্টোবর সংসদে হতদরিদ্রদের মধ্যে ১০ টাকা কিলোগ্রাম দরে চাল বিক্রির প্রকল্পের কথা বলেছেন। যারা দুর্নীতি করবে তাদের সাবধান করে দিয়েছেন।

আস্থা রাখতে পারছি না। খোদ খাদ্যমন্ত্রী যেখানে বেআইনিভাবে পদ আঁকড়ে ধরে বসে আছেন, সেখানে খাদ্য বিতরণে ভেজাল বা দুর্নীতি হবে না—এমন আস্থা অনেকেরই থাকতে পারে, তবে অধমের নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি হলে বিচার তো আর হচ্ছে না। বিচার না হতে দেখে দেখে নাগরিকেরাও আজকাল অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই তারা সড়কে দাঁড়ায় ‘ফাঁসি চাই’ দাবি নিয়ে।

ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় মাথাপিছু আয় ছিল ১০ থেকে ৪০ হাজার ডলার। যেটা ছিল না, সেটা হলো বিচার। আমাদের কিছুটা এখন আছে। তবে নাগরিকেরা যেভাবে ঘন ঘন বিচারের দাবিতে মাঠে নামছে, তাতে মনে হচ্ছে তাদের বিচার পাওয়ার আশা কমে যাচ্ছে। অন্তত সরকারের (যেমন মন্ত্রী, সাংসদ) বা সরকারি দলের কেউ জড়িত থাকলে বিচার হবে না—এটা মোটামুটি এখন নিশ্চিত।

বিচার যত কমবে, সমাজ তত ভাঙবে। উন্নয়নের জোয়ার সেই ভাঙন ঠেকাতে পারবে না।

আর/০৭:১৪/০৭ অক্টোবর

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে