Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.2/5 (154 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-২০-২০১৬

নিধিরাম সরদার কোনো সরদারই নয়

সৈয়দ আবুল মকসুদ


নিধিরাম সরদার কোনো সরদারই নয়

অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠিত হলেই সেটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলো তা-ই, যেখানে জনগণের ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার ও ব্যবস্থা রয়েছে। জনগণের ক্ষমতায়নই গণতন্ত্র, শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারটুকু নয়। একদিন ভোট দিয়ে ভোটাররা তাঁদের একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করলে জনগণের কী যায়-আসে, প্রাপ্তিযোগ ঘটে প্রতিনিধির।

আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের যাঁরা প্রতিষ্ঠাতা এবং যাঁদের ওপর সংবিধান রচনার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল, তাঁরা নাগরিকদের হয়ে নিজেরাই নিজেদের একটি প্রশ্ন করেছিলেন: হাউ ডু উই প্রটেক্ট আওয়ার সেলভস অ্যাগেইনস্ট দোজ হু গভার্ন আস। যাঁরা আমাদের শাসন করেন, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ও সমষ্টিগতভাবে খুবই প্রবল, অসীম ক্ষমতার অধিকারী। ব্যক্তি হিসেবে আমরা নাগরিকেরা নিতান্ত দুর্বল। এই অবস্থায় আমরা নিজেদের কীভাবে আত্মরক্ষা করতে পারি তাঁদের থেকে, যাঁরা আমাদের শাসন করেন? শাসকদের অনিচ্ছাকৃত ভুলেও নাগরিকদের অনিষ্ট হতে পারে। তা থেকে বাঁচার উপায় কী? জবাবও তাঁরাই দিয়েছিলেন: অবিরাম সতর্কতা: eternal vigilence.

সেই ইটারনাল ভিজিলেন্সের মানে কি এই যে, জনগণ রাত জেগে পাহারা দেবে, যেন শাসকেরা তাদের কোনো অনিষ্ট করতে না পারেন। তা নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের অংশগ্রহণ থাকলেই তারা খুশি। সরকার যদি তাদের মতামতের মূল্য দেয়, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন যদি ঘটে সরকারের কর্মকাণ্ডে, তাহলেই সেটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তাহলে প্রশ্ন হলো, যে মানুষগুলো একেবারে দূরে রয়েছে কেন্দ্র থেকে, তাদের কথা অত দূরে পৌঁছাবে কীভাবে। গ্রাম-জনপদের মানুষের সমস্যার কথা, তাদের কী প্রয়োজন এবং কী প্রয়োজন নয়—সেসব কথা রাজধানীর বড় বড় চেয়ারে যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা জানবেন কীভাবে? তাঁদের নাগাল স্থানীয় জনগণের কি পাওয়া সম্ভব?

দূরবর্তী কেন্দ্রীয় সরকারের নাগাল পাওয়া যেহেতু কঠিন, সে জন্যই প্রায় সব দেশেই গণতান্ত্রিক হোক অথবা অগণতান্ত্রিক হোক—স্থানীয় শাসন–সংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা যাকে বলি লোকাল গভর্নমেন্ট বা স্থানীয় সরকার। যদিও আমরা বলি ‘সরকার’, আসলে ওগুলো সরকার নয়; যেমন নিধিরাম সরদারও সরদার নয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান তার ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে যে শব্দ ব্যবহার করেছে, সেটাই সঠিক—স্থানীয় শাসন। তবে এই শব্দটিও যে জুতসই তা নয়, আরও উপযুক্ত শব্দ হতে পারে।

স্থানীয় শাসন সম্পর্কে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ‘আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ আরও বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধান ও অন্য কোনো আইন সাপেক্ষে সংসদ আইনের দ্বারা যেরূপ নির্দিষ্ট করিবেন...অনুরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান যথোপযুক্ত প্রশাসনিক একাংশের মধ্যে সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন...।’ সংবিধানের ইংরেজি ভাষ্যের Unit-কে বাংলা করা হয়েছে ‘একক’। একাংশ কথাটার অর্থ যথেষ্ট স্পষ্ট নয়, যতটা পরিষ্কার ‘ইউনিট’ শব্দটি। যা হোক, আমরা বুঝে নিয়েছি প্রশাসনিক একাংশ বলতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলাকে বোঝায়।

পশ্চিমের দেশে পার্লামেন্ট মেম্বারদের বলা হয় ‘ল মেকার’—আইন নির্মাতা বা আইন রচনাকারী। আমাদের দেশের সাংসদেরা সাংবিধানিক আইনকানুন সম্পর্কে প্রগাঢ় জ্ঞানের অধিকারী এবং জনগণের প্রতিও যে তাঁদের অপার ভালোবাসা, তাতে দেশবাসীর সামান্যতম সংশয় নেই। তবে সংসদীয় কর্মকাণ্ডের বাইরে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা, ঠিকাদারি প্রভৃতি বহু ব্যাপারে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে অনেক সময় সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অবকাশ পান কম। বহু বছরেও স্থানীয় শাসন বা স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত আইনের উপযুক্ত আইন প্রণীত হয়নি।

রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের যতগুলো স্তর রয়েছে, তাকে যদি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, তাহলে স্থানীয় সরকার হলো ভিত্তি স্তর, প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভা দ্বিতীয় বা মধ্য স্তর এবং রাষ্ট্রপতি হলেন শীর্ষ স্তর। স্থানীয় সরকারের বিষয়ে উপযুক্ত আইন রচনার দায়িত্ব সংসদের ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী বহু বছরেও স্থানীয় সরকার আইন প্রণীত না হওয়ায় জনগণের ক্ষমতায়নের ব্যবস্থাটি রুদ্ধ হয়ে থাকে। ইউনিয়ন পরিষদ বা অন্য কোনো ‘প্রশাসনিক একাংশ’কে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে স্থানীয় সাংসদদের আধিপত্য ক্ষুণ্ন হয়। তাঁরা যাতে স্থানীয় সরকারগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরাতে পারেন, এই জন্যই স্বাধীন স্থানীয় সরকার আইন প্রণয়নে সাংসদদের অনীহা।

সংবিধান অনুযায়ী জনগণই যদি সকল ক্ষমতার উৎস হয়ে থাকে, তাহলে সেই ক্ষমতার অধিকার খর্ব করে কোনো আইন প্রণয়নের অধিকার সাংসদদেরও নেই। এটা আমার মতো অজ্ঞ লোকের কথা নয়, সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েই বলা হয়েছে। একটি মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলেছিলেন: ‘সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদের দেওয়া রূপরেখার বহির্ভূত স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত কোনো আইন প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের এখতিয়ার নেই এবং সেটা করা হলে ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ দুটিকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ এবং ৭ অনুচ্ছেদের ১ দফার বিরোধিতা করা হবে।’ [৪৪, ঢাকা ল’ রিপোর্টার্স (এডি), ৩১৯]

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের ১ দফায় কী বলা হয়েছে? পরিষ্কার বলেছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’

আমাদের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ দলিলে যে কথাই লিখে রেখে যান না কেন, জাতীয় জীবনের যে পর্বে আমরা বাস করছি, সেখানে জনগণের ক্ষমতায়ন নয়, সরকারি দলের নেতা ও ক্যাডারদের ক্ষমতায়নকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এখানে জনগণ দেশের সকল ক্ষমতার মালিক হওয়া তো দূরের কথা, জনগণ কার মামু, তা-ই তারা জানে না।

জেলা পরিষদ আইন, ২০০০ সংশোধন করে অধ্যাদেশের গেজেট হয়েছে ৫ সেপ্টেম্বর। ‘নিয়মরক্ষার নির্বাচন’ই হোক বা যা-ই হোক, আমাদের সংসদ রয়েছে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন, যার সঙ্গে জনগণের প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত, তা সংসদে আলোচনা করে এবং জনমত যাচাই করে প্রণয়ন করাই সমীচীন ছিল। সংসদ থাকতে অধ্যাদেশ জারি করার আবশ্যকতা কী? আমরা ধারণা করতে পারি, আগামী অধিবেশনেই বিল আকারে উত্থাপন করে এই অধ্যাদেশ আইন হিসেবে পাস হয়ে যাবে। এত তাড়াহুড়োর কী প্রয়োজন ছিল?

এখনো অনির্বাচিত একটি জেলা পরিষদ আছে। তার চেয়ারম্যান আছেন। তাঁর ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ড খুবই সীমিত। জেলাগুলোতে তাদের অস্তিত্বই অনুভব করতে পারে না জনগণ। জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব ডেপুটি কমিশনারের। জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জেলা পরিষদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। সে জন্য তাদের ক্ষমতা, অর্থ বরাদ্দ এবং কর আরোপের ক্ষমতা থাকতে হবে।

১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে জেলা বোর্ড ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। জেলার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিরাট দায়িত্ব ছিল তাদের। জাতীয় মহাসড়কের পরই ছিল জেলা বোর্ডের সড়ক। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল জেলা বোর্ডের। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে জেলা বোর্ডের দায়িত্ব ছিল বিরাট। বলতে গেলে, সেকালে জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ও মর্যাদা ছিল প্রাদেশিক গভর্নর বা লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পরেই। জেলা বোর্ড ও পৌরসভা থেকেই জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হতো। জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব, রেভিনিউ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর এবং পুলিশ সুপার করতেন, কিন্তু জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও দায়িত্ববান ব্যক্তি। তাঁদের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিছু করতে পারতেন না।

কুড়ি শতকে বাঙালির নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে লোকাল বোর্ড ও জেলা বোর্ড এবং পৌর করপোরেশনের মেয়রদের মধ্য থেকে। অবিভক্ত বাংলা এবং পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীদের অনেকেই রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র হিসেবে। শেরেবাংলা ফজলুল হক ছিলেন কলকাতার মেয়র, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতার ডেপুটি মেয়র, স্যার খাজা নাজিমুদ্দীন ছিলেন ঢাকা জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান সাত বছর, পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় নেতা বেরিয়ে আসতেন। স্বাধীনতার পর থেকে সেই দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তার ফলে ভবিষ্যতে জাতি নেতৃত্বশূন্যতায় বিপন্ন হবে।

বর্তমান অধ্যাদেশ অনুযায়ী ২১ সদস্যবিশিষ্ট যে জেলা পরিষদ হতে যাচ্ছে, ধারণা করি, অতি দ্রুতই বর্তমান দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনই সেই নির্বাচন সম্পন্ন করে বিদায় নেবে, তা আইয়ুবীয় পরোক্ষ মৌলিক গণতন্ত্রেরই বাংলাদেশি সংস্করণ। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার এবং জেলার পৌরসভার মেয়র ও কমিশনাররা। জনগণের অংশগ্রহণ বলে কিছু থাকবে না, সুতরাং জনগণের ক্ষমতায়নের প্রশ্ন আসে না। পরিপূর্ণ ক্ষমতায়ন ঘটবে সরকারি দলের নেতা ও ক্যাডারদের।

আরেকটি ব্যাপার, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও স্বাধীনতার কম্ম কাবার করেছেন স্থানীয় সাংসদেরা। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ওপর তো খবরদারি করেনই, উপজেলা পরিষদেও তাঁরা উপদেষ্টা। তার ফলে জটিলতা নানা রকম। যে উপজেলায় চেয়ারম্যান বিরোধী দলের এবং সাংসদ সরকারি দলের, সেখানে চেয়ারম্যানের টিকে থাকাই কঠিন। নানাভাবে তাঁকে হেনস্তা করা হয়। সাংসদ একটা বড় পদ। তাঁরা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে বৈদেশিক সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে ব্যস্ত থাকবেন। তা না করে তাঁরা উপজেলায় গিয়ে দলীয় লোকদের মধ্যে ত্রাণের খেজুর ও দুম্বার গোশত বণ্টন করেন। উপজেলায় তবু একজন সাংসদের খবরদারি। এবার জেলা পরিষদে দেখা যাবে তিন-চারজন সাংসদ তাঁদের মনোবাঞ্ছা পূরণে চেয়ারম্যানকে ক্যাডারবেষ্টিত হয়ে গিয়ে চাপ দেবেন। জনগণের ক্ষমতায়ন সেখানেই শেষ।

সব বড় দলই স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার অঙ্গীকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে করে থাকে এবং সব সরকারই স্থানীয় সরকারকে    তাদের দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে। ঔপনিবেশিক পরাধীন আমলেও নির্দলীয় স্থানীয় সরকার জনসম্পৃক্ত ছিল। স্বাধীন দেশে মানুষ আশা করে, জাতীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র থাক বা না-থাক, শাসন বিভাগের নিচের স্তর স্থানীয় সরকার থেকে গণতন্ত্র মুছে না যাক।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

এফ/১০:২৫/২০ সেপ্টেম্বর 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে