Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৯-১২-২০১৬

ভবনটি নিরাপদ ছিল কিনা জানে না কেউ

ভবনটি নিরাপদ ছিল কিনা জানে না কেউ

ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর- গাজীপুরের টঙ্গীর শিল্পনগরীরর টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের যে কারখানাটি ধসে পড়েছে, সেটি ৩৯ বছর আগের পুরনো ভবন। সাড়ে তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত ভনটি নিরাপদ ছিল কিনা তা এখনও কেউ বলতে পারছেন না। তা নিশ্চিত হতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় পৃথক পাঁচটি কমিটি করেছে।

টাম্পাকোএ কমিটিগুলো খুঁজে বের করবে ভবন ধসের কারণ, ত্রুটি কী ছিল ও আগুন লাগার কারণ। যদিও একমাস আগে শ্রম মন্ত্রণায়ের কর্মকর্তারা ভবনটি পরিদর্শন করেছিলেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বয়লার পরিদর্শন বিভাগ কারখানার বয়লারের মেয়াদও বাড়িয়ে একবছর করেছিল। তারপরও দুর্ঘটনা! তবে কারও দায়িত্বে গাফিলতি থাকলে তাদের শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছে সরকারের উচ্চমহল।

রবিবার শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস, গাজীপুর জেলা প্রশাসকের অফিস ও বিসিক কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন (গাসিক) ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিলেও টঙ্গীর শিল্প এলাকায় এ বিষয়ে কাজ করে বিসিক। বিসিকই প্লট বরাদ্দ দেয়, ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে থাকে। সে কারণে ভবনটির দেখভালের দায়িত্বও তাদের।

ভবনটি দেখভালের দায়িত্ব কোন প্রতিষ্ঠানের এবং এটা নিরাপদ ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (গাসিক) প্রকৌশলী লেহাজ উদ্দিন বলেন, ‘বিসিক শিল্প এলাকায় আমরা কোনও ভবনের অনুমোদন দেই না। আমরা শুধু ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে থাকি এবং তা সময় মতো নবায়ন করি। এর পুরো দায়িত্ব বিসিকের। আমরা বিসিকের ভেতরে কোনও তদারকি করি না।’

একই প্রশ্নের জবাবে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. হযরত আলী বাংলা বলেন, ‘ভবনটি ১৯৭৭ সালে তৈরি বলে আমরা জানতে পেরেছি। এটি দেখভালের দায়িত্ব আমাদেরই। তবে এটি নিরাপদ ছিল কিনা, নাকি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা এখনই বলা যাবে না। তদন্ত হচ্ছে। তদন্তের পর তা জানা যাবে।’

দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়ে হযরত আলী বলেন, ‘এখানে কারও দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ছিল কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এবিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন এবং আমরা পৃথক কমিটি গঠন করেছি। আমাদের কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলেছি। প্রতিবেদন পাওয়া গেলেই বলতে পারবো, আসলে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কিনা!’ তিনি বলেন, ‘আগে কথা বলে কোনও লাভ নেই। যদিও প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আমাকেই সব জবাবদিহিতা করতে হচ্ছে।’

ভবন পরিদর্শনের বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, ‘একমাস আগে শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ভবটি পরিদর্শন করেছেন। তারা ব্য়লারের মেয়াদ আগামী এক বছর পর্যন্ত নবায়ন করেছে। সেটাও একটি বিষয়। ভবনটি পুরনো হলেও এটি দিনে দিনে বড় করা হয়েছে। কীভাবে করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।’

ক্ষতিপূরণ দিয়ে জীবনের মূল্য হয় না জানিয়ে বিসিকের চেয়ারম্যান মো. হযরত আলী বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ দিয়ে মানুষের জীবনের মূল্য হয় না। যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ) লে. ক. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শেষ হলেই কাজ শুরু করবেন কমিটির সদস্যরা। তদন্তের পর জানা যাবে আসলে ত্রুটি কোথায় ছিল। আমরা আগুনের সূত্রের কারণ খুঁজবো। ত্রুটি কী ছিল, তাও তদন্ত করে বের করা হবে।’

টঙ্গীর বিসিক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান সাজু দুর্ঘটনার পর শনিবার বিকেলে বলেন, ‘আমার চাচা তো ভাই মরহুম কাশেম মাতুব্বরের বাড়ি এটি। বর্তমানে তার তিন ছেলে। ফালু মাতুব্বর, জিএম মাতুব্বর ও জাহিদ মাতুব্বর। বিসিক এলাকাতে তার দুই বিঘার মতো জমি রয়েছে। ১৯৬১ সালের দিকে ভবনটি তৈরি করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর পরই ১৯৭৪ সালে কারখানাটি চালু হয়। কারখানাটির মালিক বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য সিলেটের মকবুল হোসেন লেচু মিয়া। এখানে সব সময় শ্রমিকেরা কাজ করেন।’

শাহজাহান সাজু বলেন, ‘ভবনটি এত পুরনো যে, যারাই দেখেছেন তারাই বলেছেন, এটি তাদের ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ভবনে এই কারখানা থাকায় অনেকেই রহস্যের গন্ধ পাচ্ছেন। স্থানীয় ও নিহতদের স্বজনের প্রশ্ন, তাহলে কি এসব দেখার কেউ নেই!

এ ঘটনা তদন্তে গাজীপুর জেলা প্রশাসনও একটি কমিটি গঠন করেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক এস এম আলম বলেন, ‘আমাদের কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। তদন্ত কমিটি শিগগিরই এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে।’

এদিকে, রবিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, টাম্পাকো ফয়েলস লিমিটেডের ঘটনায় যেইই দোষী হোক, তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের জীবনের মূল্য কেউ দিতে পারবে না। কিন্তু কার গাফিলতিতে এমনটি হয়েছে, তদন্ত করে তা বের করা হবে। কোনও শ্রমিক যেন তার কর্মক্ষেত্রে কোনও দুর্ঘটনার সম্মুখীন না হন, সেজন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিদ্যমান ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে তার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা তদন্ত করে দেখবো, কেন এ ঘটনা ঘটলো।’

অপরদিকে, ঘটনার পর পরই ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছিল, বয়লার বিস্ফোরণে এ ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শিল্প মন্ত্রণালয় নিযুক্ত কারখানা পরিদর্শক প্রকৌশলী শরাফত আলী মনে বলেন, বয়লার বিস্ফোরণ এ ঘটনা ঘটেনি।’
শরাফত আলী বলেন, ‘এ কারখানায় দুটি বয়লার আছে। বয়লারগুলো অক্ষত আছে। আমি বাইরে থেকে তা দেখেছি। এর অর্থ বয়লার বিস্ফোরিত হয়নি। আমি ধারণা করছি, গ্যাস সিলিন্ডারের স্টোররুম থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। যেহেতু, কেমিক্যাল বা দাহ্যপদার্থ ছিল, সে কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।’

প্রকৌশলী শরাফত আলীর ভাষ্যকে সমর্থন করেছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সনদপ্রাপ্ত বয়লার চালক ইমাম উদ্দীনও। ইমাম টাম্পাকো কারখানায় এক দশকেরও বেশি সময় কাজ করছেন তিনি। এ বিষয়ে ইমাম উদ্দীন বলেন, ‘আমি এ কারখানায় ১১ বছর ধরে কাজ করেছি। আমাদের গ্যাস লাইনে কিছু লিকেজ ছিল। এমন ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে ধারণা করছি।’

ঘটনার দিন শনিবারও ডিউটি করেছেন উল্লেখ করে ইমাম উদ্দীন বলেন, ‘আমি গতকালও ডিউটি করেছি। রাতের বেলা খালেক নামে অপর এক অপারেটর বয়লার চালাচ্ছিল। রাত সাড়ে ৪টার দিকে বয়লার বন্ধ করে দেওয়া হয়। নতুন ভবনের ভেতরে বয়লার। সেখান তা অক্ষত রয়েছে। পুরনো ভবনে গেটের সঙ্গেই গ্যাসের কন্ট্রোল রুম। সেখানেই বিস্ফোরণ ঘটে। খালেক অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে এসেছে। এখন বাসায় বিশ্রামে আছে। সে ভীষণ মর্মাহত।’

ইমাম আরও বলেন, ‘২০১৭ সালের জুন মাস অব্দি বয়লারের মেয়াদ নবায়ন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বয়স ৩৫-৩৬ বছর। প্রতিষ্ঠান ক্রমশ বড় হয়েছে; সঙ্গে ভবনও বেড়েছে। ভবনগুলো ঘন সন্নিবিষ্ট।’

এদিকে, টাম্পাকো ট্রাজেডির ঘটনায় নয়জন নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজছেন স্বজনেরা। এদের নাম, ঠিকানা, ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কন্ট্রোল রুমে দেওয়া হয়েছে। স্বজনদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। শনিবার রাত থেকে কন্ট্রোল রুমটি চালু করা হয়েছে।

রবিবার রাত পর্যন্ত নয়জন নিখোঁজের তথ্য পেয়েছে কন্ট্রোল রুম। কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হাসেম বলেন, ‘আমরা নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করছি। স্বজনদের এখানে তথ্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’

যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তারা হলেন- মো. আজিম উদ্দিন, জহিরুল ইসলাম, শ্রী রাজশ বাবু, রাহাদ হোসেন মুরাদ, ইসমাইল হোসেন, মো. আনিসুর রহমান, নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, মাসুম আহমেদ ও রফিকুল ইসলাম।

শনিবার সকাল ছয়টায় টাম্পাকোর কারখানায় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে পাঁচতলা ভবনটির আংশিক ধসে পড়ে। এ ঘটনায় শনিবার ২৪ জনের মৃত্যু হয়। রবিবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন এবং ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে সন্ধ্যায় আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজপি) একেএম শহীদুল হক বলেছেন, টঙ্গীর দুর্ঘটনায় তারা মামলা দায়ের করবেন। বর্তমানে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে