Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৯-০৭-২০১৬

ছিটমহলে জমির মালিকানা দাগ খতিয়ান প্রদান

আজিনুর রহমান আজিম


ছিটমহলে জমির মালিকানা দাগ খতিয়ান প্রদান

লালমনিরহাট, ০৭ সেপ্টেম্বর- বিলুপ্ত ছিটমহলে সরজমিনে জমির দখল দারিত্বে প্রাথমিক মাঠ জরিপ দিত্বীয় দফায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে নকশা করে সেটেলমেন্ট জরিপ করা হয়েছে। দুই দফা জরিপ শেষে বর্তমান শেষ পর্যায়ে জমির নকশায় বর্ণিত পরিমাণ আর সঠিকতা নির্ণয় করে সত্যায়ন করার কাজ। জরিপ তথ্য আর সরজমিনে সত্যায়ন করে প্রকৃত মালিকদের হাল দাগ(আরএস) রেকর্ড সমমূল্যের খতিয়ান প্রদান প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ কাজ সম্পন্নের পর-ই বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসিরা তাঁদের জমির চুরান্ত মালিকানা ও ক্রয়- বিক্রয়সহ হস্তান্তর করার অধিকার পাবেন। তবে ভূক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ জরিপ সমূহের কাগজসহ খতিয়ান সংগ্রহ করতে মোটা অংকের উৎকোচ প্রদান করতে বাধ্য করা হয়েছে বরাবরই। আর মাঠে কর্মরত খতিয়ান প্রদান কাজে নিয়োজিত কর্তাদের চাহিদা মত আর্থিক ডিমান্ড মেটাতে গিয়ে ধার- কর্জ এমনকি বাড়ীর গৃহপালিত পশুও বিক্রয় করতে হচ্ছে।

সরজমিনে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের নামে টাকা নেয়ার বিস্তর অভিযোগ করেন একাধিক বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দা। জানাগেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পাটগ্রাম উপজেলায় অবস্থিত ৫৫টিসহ লালমনিরহাট জেলার ৫৯টি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের জমির সঠিকতা নির্ণয়ে তিন দফা জরিপ কাজ সঠিক ও স্বচ্চভাবে করার নির্দেশ দেয় সরকার। ভূমি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের তত্ত্বাধানে দখল দারিত্বে প্রাথমিক মাঠ জরিপ ও সেটেলেমেন্ট অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দিত্বীয় দফায় ডিজিটাল (ক্যামেরা) পদ্ধতিতে সেটেলমেন্ট নকশা জরিপ করা হয়।

শেষে চুরান্ত পর্যায়ে দুই দফা জরিপের তথ্য মোতাবেক প্রকৃত মালিকদের হাল দাগ নম্বর ঊল্লেখ করে(আরএস) রেকর্ড সমমূল্যের খতিয়ানে জমির সঠিক পরিমাণ বর্ণনা ও একজন উপ- সেটেলমেন্ট অফিসারের সত্যায়ন স্বাক্ষরের পর প্রদান করা হয়। কিন্তু কতিপয় দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা- কর্মচারী অবহেলিত বাসিন্দাদের নিকট থেকে সু- কৌশলে আর্থিক লেনদেন করায় ব্যাপক হয়রানির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা নতুন বাংলাদেশী হওয়া, ভোটার তালিকায় নাম উঠানো, কোনো প্রকার মারদাঙ্গা পরিস্থিতির উদ্ভব ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে জমির জরিপ শেষে খতিয়ান প্রদান করার ঘটনায় আনন্দিত হওয়ার কথা হলেও ম্লান করে দিচ্ছে উৎকোচ নেয়ার ঘটনা।

৬৮ বছরের দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে হাজার হাজার মানুষের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়া সরকারের বিশাল সাফল্যকে কলঙ্কিত করছে কতিপয় অর্থলোভী মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা- কর্মচারী।

অভিযোগ রয়েছে, টাকা দিয়ে পূর্বে করা জরিপে দখলে থাকা জমির প্রাথমিক ও কলমি নকশা এবং খতিয়ানে কৌশলে মালিকানা ঊল্লেখ করে নিয়েছেন অনেকে। অপরদিকে বিলুপ্ত ছিটমহলের দীর্ঘ সময় ধরে সুবিধাবঞ্চিত বাসিন্দাদেরকে চুরান্ত হাল খতিয়ান সংগ্রহে খতিয়ান প্রতি ৫ শত থেকে ৩ হাজার পর্যন্ত টাকা গুণতে হয়েছে। এতে প্রকৃত জমির মালিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা ধরণের শঙ্কা।

বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দা দিনমজুর রওশন আরা(৩৮) বলেন, ‘হামার পাঁচ শতক জমি মাইনসের বাড়ীত কাজ করি খাং(খাই)। স্বামী পাগলা টাকা কোটে পাই। টাকা না হইলে মালিকের নাম লেকি খতিয়ান দিবেনা কইছে এজন্যে মাইনসের কাছে পাঁচশ টাকা লাভের(সুদের) উপর আনি দিছি।’ ষাটোর্দ্ধ যাদু মিয়া বলেন, হামরা গরীব মানুষ খতিয়ান দিবার সময় অনেক টাকা চায় কোনোমতে ২ হাজার টাকা দিয়া হাত- পাও ধরিয়া কাগজ নিছি।’ দুলাল হোসেন(৩৫) বলেন, মুইও ৬ শতক জমির বাবদ ৫ শত টাকা দিছং। মইনূল ইসলাম জানান, ‘মালিকের নাম উল্লেখ করে নকশা প্রদানে অনেক কাজ আছে বলে টাকা চায়। প্রথমে ২ হাজার দেই নেয় না, পরে পঁচিশ শ’ দেই তাও নেয় না পরে ৩ হাজার টাকা দেই। এভাবে অনেকের নিকট টাকা নিয়ে খতিয়ান দিয়েছে। আর বলেছে কাউকে টাকা দেয়ার কথা বললে পরে জমির সমস্যা হবে।’ মোটরসাইকেল ভাড়া চালক আলম হোসেন বলেন, আমার জমির নাকী সমস্যা আছে। একথা বলে ২০ হাজার টাকা দাবী করে। ১০ হাজার টাকা দিছি কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। পরে টাকা ফেরত চাইলে ভয় দেখিয়ে টাকা ফেরত দেয়নি।’

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, প্রায় প্রত্যেকটি খতিয়ান প্রদান কাজে নিয়োজিদ ১১ টি টিমের সদস্যরা কোনো না কোনোভাবে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের নিকট থেকে উৎকোচ নিয়েছেন। গ্রাম এলাকার স্থানীয় হাট- বাজার সমূহের বিকাশের দোকানদাররা জানিয়েছে সহকারি সেটেলমেন্ট কর্তারা প্রায়-ই বিকাশে টাকা পাঠিয়েছেন। খতিয়ান প্রদানে উৎকোচ গ্রহণের ঘটনা ফাঁস হওয়ায় স্থানীয় সাংবাদিকদের ম্যানেজ করারও চেষ্টা করছেন কতিপয় সেটেলমেন্ট কর্তা।

সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উৎকোচ গ্রহণকারি প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি ও দরিদ্র বিলুপ্ত ছিটমহলবাসিদের টাকা ফেরতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নিকট উপজেলার সচেতন মহল অনুরোধ জানিয়েছেন।

বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসিরা অধিকাংশ অশিক্ষিত ও দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিষয়ের সাথে জড়িত না হওয়ায় জরিপ বা খতিয়ান ও কর্মকর্তাদের তথ্য এবং কাজের ব্যাপারে স্পস্ট ধারণা না থাকায় তাদের সর্বাধিক হয়রানিতে পড়তে হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দারা সাংবাদিকদের বলেন, টাকার পরিমাণের ওপর খতিয়ান ভালো- মন্দ করে দিয়েছেন সেটেলমেন্ট কর্তারা। তাই পূণরায় খতিয়ান নিরীক্ষণ করা হোক।

এ ব্যাপারে সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা খোরশেদ আলম, সাইফুদ্দিন তপন ও সার্ভেয়ার আলমগীর হোসেন, আব্দুস সামাদসহ একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হলে, ‘টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সুবিধা করতে না পেরে কেউ কেউ মিথ্যা অভিযোগ তুলছে।’

উপ- সহকারি সেটেলেমেন্ট অফিসার একরামুল হক ও আশরাফ আলীর সাথে কথা হলে জানান, বিষয়টি মাঠ পর্যায়ে সরাসরি শুনেছি গুরত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে।’
পাটগ্রাম সহকারি কমিশনার(ভূমি) টিএম এ মমিন বলেন, ‘আমরা অতি নিষ্ঠার সাথে প্রাথমিক জরিপ কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে দু’ একটা ভূল হতে পারে। শুনেছি সেটেলমেন্টের কিছু কর্মকর্তা আমাদের দেয়া ৭ জনের স্বাক্ষরিত কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দিতে বলেছেন। বিষয়টি ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’

পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুর কুতুবুল আলম বলেন, ‘সেটেলমেন্ট কর্মকর্তারা নাকী টাকা নিয়েছে ভাসা ভাসা শুনেছি। কিন্তু কেউ সরাসরি এসে লিখিত বা মৌখিকভাবে আমার কাছে অভিযোগ করেনি।’

পাটগ্রাম সেটেলমেন্ট অফিসার লতিফুর রহমান আনন্দ জানান, ‘টাকা নেয়ার অভিযোগ আমার কাছে কেউ করেনি। অভিযোগ আসলে যথানিয়মে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এ ব্যাপারে রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা(জেডএসও) আব্দুল মান্নানের সাথে মুঠোফোনে যোগোযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ ধরণের অভিযোগ স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাকে জানাতে হবে ওনারা আমাকে জানাবে। আমার কাছে এধরণের অভিযোগ আসেনি। যদি লিখিত অভিযোগ আসে তাহলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এফ/১৬:৫৫/০৭ সেপ্টেম্বর 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে