Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-০৬-২০১৬

গরুর পালাই সোনাখালী গ্রামের মানুষের পেশা

জয়ন্ত শিরালী জয়


গরুর পালাই সোনাখালী গ্রামের মানুষের পেশা

গোপালগঞ্জ, ০৬ সেপ্টেম্বর- গ্রামটির চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। গ্রামটি বছরের প্রায় ১২টি মাসই পানিমগ্ন থাকে। হাজার হাজার হেক্টর জমি থাকলেও সেখানে উৎপাদন হয়না কোন ফসল। বলা যায় কোন উপায় না পেয়ে ধীরে ধীরে গ্রামটির ২৩০টি পরিবার ঝঁকে পড়েছে গরু পালনের দিকে। আর তাই এখন কেরাবানীর গরু মোটাতাজ করনের গ্রামে পরিনত হয়েছে গোপালগঞ্জের সোনাখালী। জলা ভূমি বেষ্টিত গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার পিঞ্জুরী ইউনিয়নের সোনাখালী গ্রামের ২ শ’ ৩০ পরিবারের পেশাই গরু পালন।

এ বছর অন্তত আড়াই হাজার গরু এ গ্রাম থেকে কোরবানীর হাটে বিক্রির জন্য আনা হবে। বিলের জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মানো ঘাস, ভাতের মাড়, খড়, ভুষি খৈইল খাইয়ে প্রাকৃতিক ভাবে এ গ্রামে গরু পালন করা হয়। এখানকার গরুকে স্টরয়েড বা অন্যকোন মোটাতাজাকরণের ওষুধ বা অপদ্রব্য পুশ করা হয়না। গরু পালনে ক্ষতি কারক কোন উপাদান ব্যবহার করা হয়না। সোনাখালী গ্রামে পালনকরা গরুর মাংস মান সম্পন্ন ও নিরাপদ।

এ সব কারনে গোপালগঞ্জের কোরবানীর হাটে সোনাখালীর গরুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ক্রেতারা সোনাখালীর গরু একটু বেশি দামেই কিনে নিয়ে যান। ক্ষুদ্র খামারী অন্তত ১ লক্ষ ও বড় খামারী ৩ লক্ষ টাকা আয় করেন। কোরবানীর ঈদের হাটে গরু বিক্রি করে সোনাখালী গ্রামের মানুষ কাঁচা টাকা ঘরে তোলেন। এ বছর ভারতীয় গরু প্রবেশ না করলে লাভ অরো বেশি হবে বলে জানিয়েছেন খামারীরা।

শুরুর কথা 
গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার বিলবেষ্টিত ও বিচ্ছিন্ন গ্রাম সোনাখালি। চারদিকে অথৈই পানি। প্রায় সারা বছরই এ গ্রামের মানুষ পানির সাথে বসবাস করেন। খাল পাড়ের সামান্য কিছু জমিতে ধান আবাদ হয়। বাদবাকী জমি আনাবাদী অবস্থায় পড়ে থাকে। গ্রামের মানুষে অভাব অনটন ছিল নিত্য সঙ্গী। আনাবাদি জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় এক ধরনের ঘাস। এই ঘাসকে কাজে কাজে লাগিয়ে তারা গরু পালনের পরিকল্পনা করেন। নিজেদের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে তারা গরু পালন শুরু করে। গরু পালনই ওই মানুষের প্রধান পেশা ও অর্থনৈতিক কাজে পরিনত হয়েছে। প্রতি বাড়িতে ৫ থেকে ১৫ টি পর্যন্ত গরু পালন করা হচ্ছে। গরু পালন করে তারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে।

গরু বাছাই 
সোনাখালী গ্রামের ক্ষুদ্র খামারী সুলতান খোন্দকার বলেন, কোরবানীর ঈদে আমরা গরু বিক্রি করে দেই। কোরবানীর ১ মাস পর হাট থেকে শংকর জাতের এঁড়ে বাছুর গরু কম দামে বেছে বেছে কিনে আনি। গ্রামের সবাই ওই সময় হাট থেকে গরু কেনে। তারপর সারা বছর আমরা গরু পালন করি। 

গরু পালনের পদ্ধতি
সোনাখালী গ্রামের গরু খামারী চুন্নু তালুকদার বলেন, আমরা প্রাকৃতিক ভাবে গরু পালন করি। গরুকে বিলে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ঘাস, ভাতের মাড়, ভূষি, খড়, খৈইল খাইয়ে প্রতি পালন করা হয়। পরিচর্যার পাশাপাশি প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের টেকনিক্যাল সাপোর্ট গ্রহন করি। নিয়মিত ভ্যাকসিন প্রয়োগ করি। আমরা গরুর শরীরে কোন প্রকার অপদ্রব্য পুশ করিনা। মেডিসিন বা স্টেরয়ে ব্যবহার করি না। আমাদের গ্রামে উৎপাদিত গরুর মাংস নিরাপদ।বিলের ঘাস ব্যবহার করে গরু পালন করায় খরচ হয়। এ ভাবে গরু পালন করে আমরা লাভের মুখ দেখতে পারি। গরু পালনই আমাদের গ্রামের মানুষের প্রধান পেশায় পরিনত হয়েছে।

খামারীদের সমস্যা
সোনাখালী গ্রামের গরু খামারী মিরাজ গাজী বলেন, অনেক খামী মহাজনদের কাছ থেকে ৩০ ভাগ সুদে দাদন এনে গরু পালন করেন। সারা বছর গরু পালনের পর কোরবানীর সময় গরু বিক্রি করেন। গরু বিক্রির পর মোটা অংকের টাকা মহাজনকে দিয়ে দিতে হয়। সরকার কম সুদে গরু পালনে টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করলে অনেক খামারীই লাভবান হবেন। আমরা গরু উৎপাদন আরো বৃদ্ধি করতে পারবো।

লাভের হিসাব 
সোনাখালী গ্রামের গরু খামারী আরজ আলী তালুকদার বলেন, গত বছর বাজারে ইন্ডিয়ান গরু ছিল। তারা পরও ৫ টি গরু পালন করে ১ লক্ষ টাকা লাভ করেছিলাম। এ বছর ৮ টি গরু পালন করেছি। যদি বিদেশেী গরু না আসে তা হলে,আমরা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি লাভ করতে পারব।

গরুর ব্যাপক চাহিদা 
টুঙ্গিপাড়া উপজেলার তারাইল হাটের গরু ব্যবসায়ী তানজের মিয়া বলেন, সোনাখালীর গরু ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ গ্রামের গরু সনাতন পদ্ধতিতে পালন করা হয়। কোন মেডিসিন ব্যবহার করা হয় না। এ গরু কোরবানী করে ক্রেতারা ভাল মানের মাংস পান। তাই ক্রেতারা সোনাখালীর গরু শুনলেই একটু বেশি দাম দিয়েই নিশ্চিতে কিনে নিয়ে যায়।

বাপ দাদার পেশা
পিঞ্জুর ইউপির চেয়ারম্যান আবু সাঈদ সিকদার জানান, এটা তাদের বাপ-দাদার পেশা। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সোনাখালী গ্রামে এ ব্যবসা করে আসছেন। এ গ্রাম সারা বছরই জলমগ্ন থাকে। ধান বা অন্য কোন ফসল হয় না। কিন্তু গরু পালন করে অনেকেই ভালই আছে। যার নগদ টাকা নেই ,সে তেমন লাভ করতে পারছেনা। সরকার তাদের পাশে এসে দাড়ালে এ সমস্য দূর কবে। পাশাপাশি নিরাপদ গরুর মাংসের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে।

কোটালীপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ সৌরেন্দ্র নাথ সাহা বলেন, প্রাণি সম্পদ বিভাগ থেকে গরু পালনকারীদের পরামর্শ টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও ভ্যাকসিন দেয়া হয়। সোনাখালী গ্রামে গরুর কোন রোগ দেখা দিলে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ গ্রামের গরু পালনকারীরা স্টরয়েড ব্যবহার করেন না। স্টরয়েড ট্যাবলেট খাওয়ালে গরুর শরীরে পানি জমে মোটাতাজা দেখায়। নির্দিষ্ট সময়ে জবাই না করলে এসব গরু মারাও যেতে পারে। আর এ গরুর মাংস খেলে মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরতে পারে। কিন্তু প্রাকৃতিক ভাবে পালন করা সোনাখালীর গরুর মাংস মানব দেহের জন্য নিরাপদ।

গোপালগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ আতউর রহমান চৌধূরী বলেছেন, সোনাখালীর গরু পালনকারীরা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে গরু পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার যাতে কম সুদে গরু পালনের ঋন পেতে পারে সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহন করবো। গোপালগঞ্জের গরু হাটে প্রণি সম্পদের টিম কাজ করবে। স্টেরয়েড ব্যবহৃত গরু চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

এফ/২২:৫০/০৬ সেপ্টেম্বর 

গোপালগঞ্জ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে