Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.3/5 (13 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-০৬-২০১৬

বিরূপ বিশ্বে প্রবাসী বাংলাদেশি

সৈয়দ আবুল মকসুদ


বিরূপ বিশ্বে প্রবাসী বাংলাদেশি

এত বেশি অস্বাভাবিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা চারদিকে প্রতিদিন ঘটে, যার ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়েও আমাদের মনোযোগ থাকে না। যেসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা নেওয়া হয় না। গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় খুন অথবা অপমৃত্যুর শিকার হয়েছেন। সেসব খবর আমাদের সংবাদমাধ্যমে ছোট করে আসে। আমরা তা পড়ে ভুলে যাই। কেউ বলতে পারেন, দেশেও তো প্রতিদিনই খুনখারাবি হয়। বিষয়টি সে রকম নয়। বর্তমানে প্রবাসী বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে কুইন্স এলাকায় বাংলাদেশি ইমাম আলাউদ্দিন আখুঞ্জি ও তাঁর বন্ধু তারা মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় পুলিশ অস্কার মোরেল নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য এখনো উদ্‌ঘাটিত হয়নি। ওই হত্যাকাণ্ডে নিউইয়র্কে বসবাসকারী হাজার হাজার বাংলাদেশির মধ্যে ঘৃণা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

আখুঞ্জি হত্যাকাণ্ডের রেশ না কাটতেই কুইন্সেরই জ্যামাইকায় গত বুধবার আরেক বাংলাদেশি নারী নাজমা খানম ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডে নিউইয়র্কবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক শুধু নয়, ক্ষোভও সৃষ্টি হয়েছে। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে শুক্রবার অনুষ্ঠিত নাজমা খানমের জানাজায়। স্থানীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় সহস্রাধিক বাংলাদেশি ও অন্যান্য দেশের নাগরিক অংশ নেন। এমনকি জানাজার সময় মসজিদ প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্কের মেয়র, পুলিশপ্রধান ও কুইন্স বরোর প্রেসিডেন্টের প্রতিনিধি। জানাজার সময় এই জাতীয় হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে স্লোগান দেওয়া হয়। মসজিদের বাইরে বিক্ষোভও হয়। বিক্ষোভকারীরা ‘হত্যা বন্ধ করো’ ও ‘সবার জীবনেরই মূল্য আছে’ লেখা প্ল্যাকার্ডসহ অবস্থান করেন এবং মসজিদের সামনের রাস্তা প্রদক্ষিণ করেন।

আখুঞ্জি ও নাজমা খানমের হত্যাকাণ্ডের খবর ও জানাজার প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে দেখে বিচলিত বোধ করেছি। কারণ, এই দুটি ঘটনার পরপরই তাঁরা হেইট ক্রাইম বা বিদ্বেষ ও ঘৃণাপ্রসূত হামলার শিকার হয়েছেন বলে স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে ধারণা জন্মেছে। নাজমা খানমকে হত্যার ঘটনার পরকাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের নিউইয়র্ক শাখা এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসলামিক পোশাক পরিহিত থাকার কারণেই নাজমা খানম নিহত হয়েছেন। জানাজার পর জ্যামাইকার মুসলিম সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে নাজমার শোকার্ত স্বামী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে আমি রক্ষা করতে পারলাম না।’ রাস্তায় হত্যাকাণ্ড যেখানে ঘটে তার একটু দূরেই তিনি ছিলেন। আমেরিকায় প্রবাসী হওয়ার আগে নাজমা খানম শরীয়তপুরের এক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। নাজমা খানমের সন্দেহভাজন খুনিও গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে যে তিনি হেইট ক্রাইমের শিকার হননি, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই তার ওপর আক্রমণ হয়েছিল।

এর মধ্যে কুইন্সের হত্যাকাণ্ডের পরদিন কানাডার রাজধানী অটোয়া থেকে আসে আরেক অপমৃত্যুর সংবাদ। নুসরাত জাহান নামে ২৩ বছর বয়স্ক এক কলেজছাত্রী ইসলামি পোশাক পরে সাইকেল চালিয়ে বাইক লেন দিয়ে যাচ্ছিলেন। একটি ট্রাকের ধাক্কায় পড়ে গিয়ে ও পিষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি সড়ক দুর্ঘটনা, কিন্তু এখানেও নিহত কলেজছাত্রীর ঘনিষ্ঠদের ধারণা, এটিও হেইট ক্রাইমজনিত হত্যাকাণ্ড হতে পারে। নুসরাতের বাবা বাংলাদেশ হাইকমিশনের একজন হিসাবরক্ষক। যে কোম্পানির ট্রাক, তারা অবশ্য এই দুর্ঘটনার জন্য শোক প্রকাশ করেছে। তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে দুর্ঘটনার রহস্য।

নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের এমন কোনো পরিবার নেই, যাদের আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত কেউ আজ ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় নেই। কেউ গেছেন সপরিবারে, কেউ গেছেন পড়াশোনা করতে, কেউ চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য করে জীবিকার অন্বেষণে। বাংলাদেশের একশ্রেণির বিত্তবান বিদেশে ঘরবাড়ি কিনেছেন এবং দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেন। তাঁদের সংখ্যা কম। তাঁরা দেশের বন্ধু নন। তাঁরা স্বার্থপর। কিন্তু তাঁদের বাইরে যে প্রায় ৮০-৯০ লাখ বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত, তাঁরা কমবেশি নিয়মিত দেশে টাকা পাঠান। অমানুষিক পরিশ্রম করে তাঁরা অর্থ উপার্জন করেন। সেই টাকা দেশে পাঠান প্রিয়জনেরা যেন খেয়ে-পরে একটু ভালো থাকে।

আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অঙ্ক বলে আমরা টেবিল চাপড়াই, তার একটা বড় অংশ নিম্নমধ্যবিত্ত প্রবাসীদের পাঠানো। কিন্তু সেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেমন আছেন, তাঁদের সুখ-দুঃখের খবর আমরা কতটুকু রাখি? আমাদের দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনের উঁচু বেতন-ভাতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাঁদের বিপদে-আপদে কতটা পাশে থাকেন?

কয়েক মাস আগে মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশ থেকে এক প্রবাসী শ্রমিক আমাকে ফোন করেন। ও রকম ফোন মাঝেমধ্যে আসে। তিনি তাঁর দুঃখের কথা জানিয়ে বলেন, আমাদের জন্য কিছু লেখেন। আমি বললাম, কী হবে লিখে? তিনি বললেন, হোক বা না হোক তবু লেখেন। আমাদের দুঃখের কথা মানুষ জানলেও আমরা শান্তি পাব। তিনি জানালেন, কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকদের দ্বারাও তাঁরা নিগৃহীত হন। উদাহরণ দিয়ে বললেন, মাছ-মাংস কিনে খেতে পারি না। বড়শি দিয়ে সমুদ্র থেকে অবসর সময়ে যে মাছ ধরব, তাও ধরতে দেয় না। তাড়িয়ে দেয়। কোথাও ছোটখাটো চুরিচামারি হলে পুলিশ সোজা এসে ধরে বাংলাদেশিদের। পাকিস্তানি বা ভারতীয়দের চেয়ে সন্দেহ বাংলাদেশিদের বেশি। জিজ্ঞেস করে এই মেসে কোনো ‘আলিবাবা’ আছে কি না। বললাম, আলিবাবাটা কী? তিনি বললেন, বাংলাদেশিদের তাচ্ছিল্য করে বলে আলিবাবা। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের করুণ কাহিনি বলে শেষ করা যাবে না।

বিভিন্ন দেশে যেসব মধ্যবিত্ত বাংলাদেশি বাস করছেন, তাঁরা পরিপূর্ণ ও অতিশয় বাংলাদেশি। দেহটা জীবিকার তাগিদে সেখানে, মনটা পড়ে থাকে বাংলাদেশে। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবিত  অগ্রগতির ফলে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের প্রতিদিনের সংবাদ রাখছেন। তাঁরা আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো দেখছেন। অনলাইনে সংবাদ পাঠ করছেন। এমনকি সকালে পত্রিকা আমরা পড়ার আগেই আমাদের লেখা ও খবরাখবর প্রবাসীরা পড়ে ফেলেন। দেশের জন্য তাঁদের মন কাঁদে কিন্তু দেশ তাঁদের জন্য কী দায়িত্ব পালন করে?

নিউইয়র্কে হাজার হাজার বাংলাদেশি বাস করেন। কেউ কেউ দুই-তিন পুরুষ থেকে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বাংলাদেশি। ওই কুইন্সের ফুটপাত দিয়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছিলাম। একজন সালাম দিয়ে এগিয়ে এলেন। অভাবগ্রস্ত, কিন্তু কাজ করেই রোজগার করেন। বললাম, কী করেন? বললেন, বাংলাদেশিদের বাড়িতে গিয়ে চুল কাটি। তাঁর হাতে ক্ষুর-কাঁচির একটা পোঁটলা দেখা গেল। ওসব নগরীতে সেলুনে চুল কাটা ব্যয়বহুল। তাই কম খরচে ঘরেই অনেকে চুল কাটান। জিজ্ঞেস করে জানলাম, দেশে তাঁর পরিবার-পরিজন রয়েছে, তাঁদের জন্য টাকা পাঠান।

যেসব উন্নত দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা রয়েছেন, তাঁরা সেখান থেকে টাকা কামাই করে দেশেই পাঠান তা নয়, সেখানকার অর্থনীতিতেও তাঁরা অবদান রাখছেন। তা যদি না রাখতেন তাহলে দয়া করে সেসব দেশের সরকার তাঁদের জামাই–আদরে রাখত না। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেসব দেশে রয়েছেন, সেখানকার অর্থনীতিতে যেমন ভূমিকা রাখছেন, দেশের অর্থনীতিতেও রাখছেন অবদান। তাঁদের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। যে দেশে রয়েছেন সে দেশের সরকার থেকে যেমন তাঁদের ন্যায়বিচার ও সদাচরণ প্রাপ্য, তেমনি নিজের দেশের সরকারকেও তাঁদের পাশে থাকতে হবে। সেটা তাঁদের সাংবিধানিক দাবি।

সব প্রবাসী বাংলাদেশিই অতি ভালো মানুষ, নিষ্পাপ, তা বলব না। পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে তাঁরা কেউ কখনো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারেন। যিনি অপরাধ করবেন, শাস্তি তঁার প্রাপ্য। কিন্তু কখনো বিনা অপরাধে যাঁরা হয়রানির শিকার হন, তাঁদের পাশে আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের দৃঢ় অবস্থান নেওয়া নৈতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব কতটা পালিত হচ্ছে, সেটাই প্রবাসীদের ও আমাদের জিজ্ঞাসা।

পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানরা এখন সন্দেহভাজন প্রজাতি। বিশেষ করে পোশাকের কারণে একশ্রেণির মুসলমান নারী সহজেই তাঁদের বিরুদ্ধবাদীদের দৃষ্টিতে পড়ছেন। হত্যা ছাড়াও অন্য রকম হয়রানি, টিটকারির শিকার হচ্ছেন তাঁরা। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবারই সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন। আত্মরক্ষা আগে।

গুলশানে রেস্তোরাঁয় নারকীয় জঙ্গি হামলায় নিহত ব্যক্তিরা ছাড়াও দুজন বিদেশি—ইতালীয় ও জাপানি—সম্প্রতি বাংলাদেশে খুন হয়েছেন। সে জন্য আমরা মর্মাহত ও লজ্জিত। তবে খুনিদের বিচার করে শাস্তি দিতে আমাদের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। নাগরিক সমাজ থেকেও আমরা প্রতিবাদ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছি। সরকারকে চাপ দিচ্ছি দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে। বিদেশিদের নিরাপত্তা দিতে আমাদের সরকারও বদ্ধপরিকর।

আমাদের প্রত্যাশা, অন্য দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন নিরাপদে বাস করতে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্প্রতি বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি খুন হয়েছেন। ধর্ম বা বর্ণের কারণে হোক, ভাষা বা জাতিগত কারণে হোক, বাংলাদেশিরা যেন নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার না হন। তাঁদের আপদে-বিপদে আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের সমৃদ্ধির পেছনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান বিরাট। তাঁদের সম্ভ্রম রক্ষা ও জানমালের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট থাকা রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে বাংলাদেশিরা যেন ন্যায়বিচার পান।

আর/১৭:১৪/০৬ সেপ্টেম্বর 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে