Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৯-০১-২০১৬

‘তোমার অভিসারে যাব অগম পারে’– কবি শহীদ কাদরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

‘তোমার অভিসারে যাব অগম পারে’– কবি শহীদ কাদরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

নিকটজন কেউ মারা গেলে চট করে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখা প্রায় অসম্ভব কাজ। বিশেষ করে আমার জন্যে। আমি তখন কেমন তলিয়ে যাই নানান রকম স্মৃতির ভেতর। ঠিক কোথা থেকে কি দিয়ে শুরু করব তা বুঝতে পারি না। ২৮ আগস্ট কবি শহীদ কাদরী চলে গেলেন। আমার সেই একই বাণী-প্রতিবন্দী দশা।

ভেকেশানে ছিলাম কানাডার টরন্টোতে। সেখানে থেকেই জানলাম কবি শহীদ কাদরী আবার হাসপাতালে। মন খারাপ হয়ে গেল। ফেসবুকে খুটিয়ে খুটিয়ে নিউজগুলো পড়লাম। রক্তে ইনফেকশান। জ্বর। তাঁর শরীর ডায়ালিসিস আর নিতে পারছে না। মন বলল এমন তো অনেকবারই হয়েছে। ঠিক হয়ে যাবে। টরন্টোর ভেকেশান শেষে ফিরে এসেছি নিউইয়র্কে। কবির শরীর আগের চেয়ে ভাল জেনেছি। কারা কবির পাশে আছেন কেমন আছেন খোঁজ নিয়ে জেনেছি। কবি দু’চার দিনের মধ্যে নীরা ভাবীর জামাইকার পারসন্স বুলোভার্ডের বাসায় ফিরবেন তাও জেনেছি। মন শান্ত হয়েছে জেনে যে তিনি ভাল আছেন, কথাবার্তা বলছেন।

২৮ তারিখ সকালে হাঁটাহাটি শেষে ঘরে ফিরব বলে পা বাড়াতেই পকেটে বেজে উঠল ফোন। উডসাইডের বাসা থেকে ফোন করেছে দিঠি হাসনাত। কালি ও কলমের সম্পাদক আবুল হাসনাত ভাইয়ের মেয়ে দিঠি বেশ কিছুদিন হল আছে এই শহরে। ওর ফোনে জানলাম শহীদ কাদরী এই ভোরেই মারা গেছেন। ঢাকা থেকে হাসনাত ভাই তাকে জানিয়েছে। কাকে ফোন করলে সব খবর পাওয়া যাবে জানতে চাইলে হাসান ফেরদৌসকে কল করতে বললাম এবং জানলাম ওরা তখনো হাসপাতালে পৌঁছায়নি, পথে আছে। মুহূর্তেই আমার সারা আকাশ অসম্ভব নীলের চাঁদোয়ায় নিজেকে ঢেকে বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল। সারা আকাশ জুড়ে যেন নৃত্যের শেষ ঘূর্ণিচক্রের শেষে, নর্তকীর ঘাগরায় অলস বাতাসের ঝিমধরা ঘূর্ণন। আমি টলতে টলতে ঘরে এসে বসলাম। মন শুধু বলছে ‘অসম্ভব, এ অসম্ভব।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা থেকে সেলিনা ভাবীর কল এলো। ডঃ মোমেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার আগে আমার মাধ্যমে জেনে নিতে চাইলেন কবি শহীদ কাদরীকে দেশে নিয়ে যাবার ব্যাপারে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কোন বাঁধা আছে কিনা। ডঃ আব্দুল মোমেন (অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ভাই) ছিলেন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি। বর্তমানে আছেন বাংলাদেশে। সেলিনা ভাবীর কল পেয়ে আমিও কল করছি চারিদিকে। সাপ্তাহিক বাঙালির সম্পাদক কৌশিক আহমেদ ভাইকে পেলাম হাসপাতালে যেখানে কবি আজ সকাল ৭টা থেকে অন্তহীন ঘুমিয়ে আছেন আর অপেক্ষায় আছেন ফিউনারাল হোম থেকে কেউ এসে তাঁকে নিয়ে যাবে। হাসপাতালের লবিতে ভিড় করে আছেন কবিকে ভালবাসার মানুষগুলো। কৌশিক ভাইয়ের মাধ্যমে নীরা ভাবীর মতামত জানতে পারলাম। না কোন বাঁধা নেই। এনিয়ে সকাল থেকে বেশ কয়েকবার কথা হল মিসেস সেলিনা মোমেন ও ডঃ আব্দুল মোমেনের সংগে।

ঢাকায় তখন রাত ১০টার বেশী বাজে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘুমাতে যাবার আগেই তাঁর সাথে কথা বলা দরকার। ডঃ মোমেন কথা বললেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে। শহীদ কাদরীকে সম্মানের সাথে বাংলাদেশে নিয়ে যাবার সকল আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সহমর্মিতার সাথে একবাক্যে রাজী হয়েছেন। সসম্মানে ও পূর্ণ মর্যাদায় কবি শহীদ কাদরীর মরদেহ দেশে নেবার সকল দায়িত্ব ও যাবতীয় ব্যায়ভার তিনি নিজে বহন করবেন বলে জানিয়েছেন। কথা বলেই আবার আমাকে কল করলেন মোমেন ভাই। ‘লতা ইট’স ডান, আপনি সবাইকে জানিয়ে দেন।’ আমি নিশ্চত এব্যাপারে আরো অনেকেই বিশেষ করে নিউইয়র্ক-এর কন্স্যুলেট,ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস, জাতিসংঘের বর্তমান স্থায়ী প্রতিবিধি, ও অন্যান্য সবাই সাহায্য করেছেন।

ইতোমধ্যে হাসপাতালে একটু একটু করে অনেকেই পৌঁছেছেন। কেউ মারা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন হয়, হাসপাতালের নানারকম পেপার প্রসেস, দেহাবশেষ ফিউনারাল হোমে পাঠাবার নানা রকম ক্রিয়াকর্ম, কবির ইচ্ছে বা অনিচ্ছেয় জামাইকা মসজিদে নামাজে জানাযার ব্যাবস্থা। ভক্তদের জন্যে কবিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবার আয়োজন করা এসব সিদ্ধান্তের প্রয়োজনে এগিয়ে আসেন হাসান ফেরদৌস, সেই সাথে কৌশিক আহমেদ। ওনারা ছাড়া আরো হয়তো অনেকেই ছিলেন। বেলা দেড়টার দিকে ফিউনারাল হোম থেকে এসে কবিকে নিয়ে যাওয়া হল। আমার অস্থির লাগছে। বারেবারে কৌশিক ভাইকে ফোন করছি। ঐদিনেই ২৮ তারিখ সন্ধ্যায় কবিকে আনা হবে জামাইকা মুসলিম সেন্টারে। সেখানেই দেখার ব্যবস্থা। কিন্তু মসজিদে তো ফুল নেয়া যাবে না। কাউকে ফুল দিতে দেয়া হল না। সবার জন্যে উন্মুক্ত বিশেষ করে সংস্কৃতিকর্মী কবি সাহিত্যিকদের জন্যে আলাদাভাবে শ্রদ্ধা জানাবার কোন ব্যবস্থা হল না। পরদিন সারাদিন কবি একা একা শুয়ে রইলেন অন্ধকার শীতল ফিউনারাল হোমের হিমঘরে। রাতের ফ্লাইটে কবিকে দেশে নিয়ে যাবার আয়োজন হল। হ্যাঁ, কবি দেশে ফিরে যাচ্ছেন। ঐ তাঁর স্বপ্নের ঢাকা। কবিতায় ঠাঁসা চির তারুণ্যের শহর।

দিন কোথা থেকে কেটে গেল জানি না। একটু বেশী রাতেই অনেকদিন পরে বার্লিন থেকে বেজে উঠল ফোন। অনেক দিন পরে। আগে এই ফোন বাজতো যখন তখন। আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতাম। কত কথা কত সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনার গাঁথা। প্রেম, বিয়ে, একমাত্র সন্তানের জন্ম আবার বহেমিয়ান শহীদের উপর এক পৃথিবী অভিমানে সবকিছু ছেড়ে জার্মানির ডয়েচেভেলে রেডিয়োর বাংলাবিভাগে কাজ নিয়ে দেশ ছেড়ে তাঁর চলে যাওয়া। জার্মানিতে গিয়ে প্রথমদিকের কষ্টের দিনগুলোর গল্প। ৭০দশকের সকল কবি সাহিত্যিকের আরাধ্য এই আগুনের শিখার মত অনিন্দ্য সুন্দরী, শিক্ষিত, গুনী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন তখনকার তারুণ্যের দাম্ভিক কবি শহীদ কাদরী যার কবিতার বুকে ডিনামাইট ফুটত আর ভালবেসে চাইতেন সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করে চলে যাবে এবং স্যালুট করবে কেবল তাঁর প্রিয়তমা পিয়ারীকেই। সেই পিয়ারী। নাজমুন্নেসা পিয়ারী। আজ অনেক বড় শূণ্যতার দিনে আমাকে কল করেছেন। বার বার বলছেন ‘লতা, আমি কিছুতেই ভুলতে পারব না তুমি আমাকে তাঁর সাথে গোপনে দেখা করিয়ে দিয়েছিলে’, তুমি আমাকে বার্লিন থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলে সেবার। এবার কেন একটু আগে ভাগে জানালে না।’ হু হু করে কাঁদছেন পিয়ারী আপা। স্তব্ধ হয়ে বসে আছি টেলিফোন হাতে, কান্না তো দূরের কথা আমি তাঁকে কোনদিন মলিন মুখেও দেখিনি। 

সব সময় হাসি খুশী, সুস্থ সুন্দর পরিপাটি সাজগোজে এক নির্ধুম হোমানল যেন। পিয়ারী আপা নিউইয়র্কে আসেন প্রায় প্রতিবছরেই। বিশেষ করে মে মাসে বইমেলা উপলক্ষ্যে। সেসময় দিন কয়েক আমরা দু’জন সারাক্ষণ একসাথে কাটাই। রাতে বইমেলা থেকে ফিরে মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হলে আমার বাসায় থেকে যান। অফুরান গল্পের লোভে আমিও তাঁকে ধরে রাখতে চাই। আবার আমি বার্লিনে গেলে দেখা হয়। ইস্ট বার্লিন থেকে পোল্যান্ডের বর্ডার বেশ কাছে, একবার সবার সাথে পিকনিকে গিয়ে সেখানেও পিয়ারী আপার সাথে আনন্দে, ভাললাগায় কেটেছে হিরন্ময় সময়। সেই পিয়ারী আপাকে অমন হু হু করে গুঙিয়ে কাঁদতে শুনে নিরব হয়ে রইলাম। একবার বললেন ‘সব শেষ হয়ে গেল লতা। কাদরী সারাজীবন একা ছিল, বহেমিয়ান ছিল, একা একা ঘুরে বেড়াল সারা পৃথিবী, সেই একাই সব ছেড়ে চলে গেল।’

ওনাদের দুজনার একমাত্র সন্তান আদনান কাদরী লবিদ আছে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ পিয়ারী আপা সব শেষ হয়ে যায়নি। লবিদ তোমাদের সন্তান, সে রয়েছে তোমার সামনে। তুমি ভেঙে পড়ো না আপা, জানো তো কবিরা মরে না।’

আমার কথা শুনে পিয়ারী আপা কিছুক্ষণ থামলেন, তারপরে বললেন, ‘ হ্যাঁ লবিদ ওর বাবার সাথে বাংলাদেশে যাচ্ছে। লবিদ বাবা-হারা হয়ে গেল। তবুতো কাদরী ছিল।’ এবার আর পারলেন না, বাঁধ ভাঙা কান্নায় ডুবে যেতে যেতে ফোন লাইনটা কেটে দিলেন।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সেবার শহীদ ভাই খুব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন। ডাক্তাররা বলেই দিয়েছেন রুগীর আত্মীয় স্বজনকে ডেকে দেখা করিয়ে দিতে, আর বেশী সময় নেই। আমি আর আকবার হায়দার কিরন ভাই বার্লিনে কল করে পিয়ারী আপাকে জানালে উনি ২৪ ঘন্টার মধ্যেই নিউইয়র্কে এসে নামেন। নিউইয়র্কের সবাই ঢালাওভাবে কবিকে যখন তখন দেখতে যাচ্ছে। কবি কাউকে চিনতে পারছেন না। কথাটথাও বলছেন না। ডায়ালিসিস চলছে ক্রমাগত। ডাক্তারা তাঁকে কোনমতে শ্বাস প্রশ্বাসটুকু সচল রাখার ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। পিয়ারী আপা কবিকে দেখতে যেতে চাইলেন। তাঁর চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অবিরাম অশ্রুধারা। খুব গোপনে খবর নিয়ে জানলাম নীরা রাত ৯টার দিকে বাসায় চলে যান। রাতে কবি একাই থাকেন নার্সদের তত্ত্বাবধানে। অথবা মাঝে মাঝে কবির ভক্তকুলের কেউ কেউ থাকেন। নিউইয়র্কে পিয়ারী আপার ছেলে লবিদ থাকে ম্যানহাটানে। কুইন্সের একটি এলাকায় স্বামী সন্তান নিয়ে থাকে বোন রুনু। ঠিক হল সেই রাতে, একটু বেশী রাতেই ওদেরকে নিয়ে আমি যাব কবিকে দেখতে। এর আগেও এমনটা হয়েছে, তখন কবি কিছুটা সুস্থও ছিলেন। বইমেলা থেকে পিয়ারী আপাকে আমার গাড়ীতে নিয়ে বাসায় ফিরছি, হঠাৎ কবির ভক্ত কেউ কল করে জানিয়েছে কবি আছেন জ্যাকসান হাইটসের একটি প্রান্তে কফিশপে, পিয়ারী আপার সাথে একটু দেখা করতে চান। বারেবারে ফোন আসায় সেখানে নিয়ে পিয়ারী আপাকে নামিয়ে গাড়ীতে অপেক্ষা করেছি, তাদের কথপোকথন শেষ হলে পিয়ারী আপাকে নিয়ে বাসায় ফিরেছি। ফলে কবির সাথে পিয়ারীর এই গোপন অভিসার নতুন নয়, একবার তো মুষলধারে বৃষ্টি। কবি বসে থাকবার কথা ৩৭ স্ট্রীটের ডানকিন ডোনাট কফিশপে কিন্তু তিনি ভেতরে না বসে বাইরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছেন। আমার গাড়ী থেকে ছাতা নিয়ে পিয়ারী আপাকে নামিয়ে নিয়ে গেলাম কফিশপে আর বাইরে দাঁড়িয়ে ভেজার জন্যে শহীদ ভাইকে দিলাম বকা। কী যে মধুর শিশুর সারল্যেভরা সেই হাসি। পরে শুনেছি বিয়েতে রাজী করানোর জন্যে পিয়ারীদের পুরানা পল্টনের বাসার সামনে চার পাঁচ দিন একটানা ঝড় জল বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়েছিলেন প্রেমিক কবি শহীদ কাদরী। পিয়ারী বিয়েতে রাজী হলেই কেবল পথ থেকে সরেছিলেন তিনি।

তো এবার যখন কবিকে দেখতে নিয়ে যাব, আমাকে অনেক বেশী সতর্ক হতে হয়েছে। নীরা কবিকে অন্ধের মত ভালবাসেন। কবির জন্যে তিনি যা করেছেন তা বোধকরি একজনমে কোন মেয়ে করতে পারবে না। জেনে শুনে বিয়ে করেছেন একজন মানুষকে যিনি প্রচন্ড অসুস্থ। নিজ হাতে তাঁকে দেখাশোনার ভার তুলে নিয়েছেন কাঁধে। তিনি অত্যন্ত দায়িত্ববান ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন এক মেয়ে। কবিকে বিয়ে করে যেমন তিনি তাঁর দায়িত্বভার তুলে নেন নিজ হাতে তেমনি কবির স্বাধীনতাও। পুরনো পরিচিতদের অনেককেই তিনি কবির ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেননি। কবির নিউইয়র্কের জীবনকে কবি নিজে অন্ধকার সময় বলেই বর্ণনা করেছেন এক সাক্ষাৎকারে। নিউইয়র্কের আনাচে কানাচে এ নিয়ে প্রচন্ড ক্ষোভের অংকুর প্রকাশমান। ফলে গোপনে পিয়ারী আপাকে কবির কাছে নিয়ে যেতে একটু খারাপ লাগছিল। তাছাড়া নীরার সামনে পিয়ারীকে নিয়ে গিয়ে আমি নীরার হাতে অপদস্থ হব এমন শংকাও কম ছিল না। আবার একথাও তো সত্যি যে কবি শহীদ কাদরী একজন স্বাধীন মানুষ। পিয়ারী আপা তাঁর সন্তানের মা। কবির বাঁচা মরা পিয়ারীকে ছুঁয়ে যাবে তার সন্তানের জীবনের সাথে সাথে। সুস্থ থাকলে কবি নিজেই দেখা করতেন যার সাথে, কিম্বা আজ কবির পুত্র যদি তার মাকে সাথে করে নিয়ে যায় বাবার সাথে দেখা করতে তবে কেইই বা আটকাতে পারে তাকে। ফলে পিয়ারীকে কবির কাছে নিয়ে যাবার গ্লানি আমার আর রইল না। বরং মনে হল কবির কিছু হয়ে গেলে পিয়ারী আপাকে একটু দেখা করিয়ে না দিতে পারার অপরাধবোধ আমার যাবে না। 

রাত প্রায় ১২টার দিকে রুনু, রুনুর বর, পিয়ারী আপা আর আমি চলেছি লং আইল্যান্ড জুইস হাসপাতালে। আমরা চারজন খুব নিরব হয়ে আছি। যতদূর মনে পড়ে পথে কেউ আমরা একটি কথাও বলিনি। হাসপাতাল থেকে বেশ দূরে গাড়ী পার্ক করে ওদেরকে রেখে আমি একা চললাম ভিতরে। একটু ভয়ে ভয়ে আট বা নয় তলায় যখন পৌঁছালাম। আমার সামনে দেখি বাঘের মত নীরা পায়চারী করছে, তার পেছনে হাসান ফেরদৌসের স্ত্রী। আশেপাশে ঝন্টু এবং সম্ভবত আদনান সৈয়দ– কবির পুত্রতুল্য দুই ভক্ত। মনে হল নির্ঘাত হার্ট এটাক হয়ে যাবে আমার। আমাকে এত রাতে দেখে নীরা তো ভীষন অবাক। বললাম আমার গাড়ী না থাকায় অন্য একজনের সাথে এসেছি কবিকে দেখতে। দিনে সে সময় পায়নি বলে রাতে আসতে হল। শুনলাম সেদিন ডায়ালিসিসে একটা বড় রকমের ঝামেলা হয়েছে বলে নীরা রয়ে গেছে। ভয়টয় মিলে আমার পেট গুলিয়ে উঠল। জানতে চাইলে নীরা বাথরুম কোথায় দেখিয়ে দিলেন। ভিতরে গিয়ে ফিসফিসিয়ে পিয়ারী আপাকে বললাম ‘শোন আমিতো ধরা পড়ে গেছি, তোমরা গাড়ী থেকে নেমো না, সিগনাল না পাওয়া পর্যন্ত। আমার সামনে নীরা, উনি এখনও বাসায় যাননি। তোমাকে দেখতে পেলে সে আমাকে আজ এখানেই খুন করে ফেলবে।’

বাথরুম থেকে বেরুলে করিডোরের বন্ধ দরজার পরে দরজা পেরিয়ে নীরা আমাকে নিয়ে গেলেন আই সি ইউ তে শহীদ ভাইয়ের কাছে। একটি বিশেষ রুমে তিনি আছেন। পাশের রুমের বড় কাঁচের জানালা দিয়ে নার্সরা তাঁকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখছেন। মরার মত পড়ে আছেন কবি। তাঁর পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছি আমি। নীরা আহ্লাদ করে ডেকে ডেকে কবিকে বলছেন, ‘ও সোনা, ও জান, ও শহীদ দেখো কে এসেছে। চোখ খুলে একটু দেখো। শহীদ ভাই তাকিয়ে আছেন। নিথর চোখ। প্রথমে বুঝতে পারিনি, ওনাকে মৃত ভেবে আমি জোরে ফুঁপিয়ে উঠেছি। নীরা আবার ডাকছেন ‘ও জান, বল তো কে এসেছে! হঠাৎ কবির গলার ভেতর থেকে কফ জড়ান ঘড় ঘড় শব্দে কি যেন একটু অস্ফুট স্বর শোনা গেল। ওমনি নীরা চিৎকার করে বলে উঠলেন, ও লতা আপা তোমাকে চিনতে পারছে, ওরে আমার মানিক ওরে আমার জান আবার বল, আবার বল!’ কবির গলায় কফ ঘড় ঘড় শব্দে এবার আমি বুঝলাম ‘অতা’ আমার নাম।

কাঁপা হাতে কবির পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে প্রিয় শহীদ ভাইয়ের জন্যে অশ্রু। মিনিট তিনেকের মধ্যেই আবার ঘুমিয়ে পড়লেন কবি। এবার ওনাদের সাথে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে এলাম। রাত প্রায় দুইটা বাজে। এইবার নীরা তো আমাকে আর ছাড়ছেন না, এতো রাতে তিনি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাবার জন্যে পীড়াপীড়ি শুরু করলেন। আমি তাকে যতই বলি একজনের সাথে আমি এসেছি সে আমাকে নামিয়ে দিয়ে কফি খেতে গেছে, তার সাথে না ফিরলে কেমন কথা হবে, নীরা ততই বলেন ‘তাকে ফোন করে চলে যেতে বল, আমি তোমাকে নামাচ্ছি।’

এত বিষম বিপদে পড়া গেল! অনেক বুঝিয়ে টুঝিয়ে তাকে তার গাড়ীর দিকে পাঠিয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম হাসপাতাল বিলডিং-এর বাইরের লবিতে। নিশুতি রাত দূরে তাকিয়ে আছি নীরার গাড়ী দূরে চলে গেছে ভেবে ফোন তুলে কেবল বলেছি ‘পিয়ারী আপা তোমরা নেমে এসো, নীরা চলে গেছে।’ ফোন না রাখতেই দেখি গাড়ী নিয়ে নীরা আবার আমার সামনে এসে হাজির। যেতে যেতে তার মনে হয়েছে আমি যেতে পারব কিনা। অসুবিধা হলে সে আমাকে নামিয়ে দেবে। কাঁপতে কাঁপতে আবার ফোন দিয়ে ওদেরকে গাড়ীতে ঢুকে যেতে বলেছি। নীরাকে গাড়ীর কাছে গিয়ে বুঝিয়ে বললাম এইতো আমি লাইনে আছি যার সাথে এসেছি সে এখুনি হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকছে, এক্ষুনি যাব। অবশেষে নীরার গাড়ীর আলো মিলিয়ে গেল দূরে। আমি পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাত সরছে না ফোন তুলে ওদের ডাকতে। অনেকক্ষণ পরে ওরা এলো। ধীরে ধীরে ওদের নিয়ে গেলাম নয়তলার অলিগলির বাঁধা পেরিয়ে সেই কাঁচে ঘেরা ঘুমন্ত কবির রুমে। কর্তব্যরত নার্স আমাকে বলল, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড? ইউ জাস্ট কেম!’ বোকা হাসি দিয়ে বললাম, ‘ইউ নো হি ইজ এ গ্রেট পোয়েট, পিপল কেম টু সি হিম ফ্রম হিজ কান্ট্রি। আই জাস্ট শো দেম দ্যা ওয়ে টু কাম হিয়ার’

শহীদ ভাইকে বিশ্বাস নেই রোগের যন্ত্রনায় ওষুধের ঘোরে যদি নীরাকে বলে দেয় আমি নিয়ে এসেছি ওদের তাহলে আমাকে আর এ শহরে থাকতে হবে না। সেই ভয়ে আমি রইলাম আড়ালে নার্সের রুমের দরজায়। রুনু ভেতরে ঢুকে খুব কান্নাকাটি করল। দুলাভাই দুলাভাই বলে পায়ের উপর পড়ে অনেক কান্না কাঁদল। মন কালো করে দাঁড়িয়ে রইল রুনুর বর। কবি বেশ আস্তে আস্তে দুচারটি কথা বললেন। তিনি তখনো দেখেননি পিয়ারী আপাকে। আমি পেছন থেকে একটু ঠেলে দিলাম তাকে। কবির ডান পাশে,তার হাত ছুঁয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন, বললেন ‘তুমি ভাল হয়ে যাবে।’ কবি কিছুক্ষণের জন্যে স্তব্ধ হয়ে রইলেন, তারপর ক্লোরফিলমাখা সবুজ পাতার মত ঝকঝকে গলায় বললেন, ‘তুমি কবে আসলে? লবিদ খবর দিয়েছে বুঝি! হাহ! ভালো তো হব। আর কিসের ভাল!’- অবাক হয়ে দেখছি কবি সুস্থ। কবি স্পষ্ট করে পরিস্কার কন্ঠে কথা বলছেন। যেন এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলেন, ফ্রেশ। কোনদিন কোন রোগ-বালাই কিছুই ছিল না তাঁর।

আরো কিছুক্ষণ আমরা সবাই নিরবে দাঁড়িয়ে রইলাম, পিয়ারী আপাকে মনে হল সে যেন কোন সুদূরের মেয়ে। যেন সে কবির চিরকালের প্রেমিকা। সে ছাড়া আর কেউ কবির প্রেয়সী ছিল না কোনো কালে। কেউ না। আমরা যখন ফিরে এলাম পুরোটা পথ নিঃশব্দে এলাম। তখনো গোলাপের গুচ্ছ হাতে মার্চপাষ্ট করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। নিশুতি রাতের আকাশে তখনো অনেক তারা।

এফ/২৩:০০/০১ সেপ্টেম্বর 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে