Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-৩১-২০১৬

‘সবার বাবা আছে, আমার বাবা কোথায়?’

বোরহান উদ্দিন


‘সবার বাবা আছে, আমার বাবা কোথায়?’

ঢাকা, ৩১ আগষ্ট- ‘সবার বাবা আছে, আমার বাবা নেই, আমার বাবা কোথায়?’ আন্তর্জাতিক গুম দিবসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এভাবেই উপস্থিত সবার কাছে বাবার খোঁজ চান ছোট্ট শিশু আফতাব রহমান। কিন্তু কারো কাছে কোনো উত্তর নেই। কারণ উপস্থিত কেউ জানে না কোথায় আফতাবের বাবা সেলিম শাহেদ।

বিএনপির নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে রাজধানী থেকে নিখোঁজ হন ছাত্রদল নেতা সেলিম শাহেদ। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই।

শুধু আফতাবই নয়, অনুষ্ঠানে আগত গুম হওয়া ব্যক্তিদের কারো বাবা, কারো স্ত্রী, কারো ভাই, কারো বোন স্বজনহারানোর কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে এমন নানা প্রশ্ন ‍ছুঁড়ে দিয়েছেন। তারা সবাই স্বজনদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। এজন্য তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েছেন।   

মঙ্গলবার বিকালে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে ‘অনন্ত অপেক্ষা’ শিরোনামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিএনপি। অনুষ্ঠানে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় বিস্তারিত তুলে ধরে একটি প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে এই সময়ে ৪৫৮ জন ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন।

গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা যখন কষ্টের অনুভূতি প্রকাশ করছিলেন তখন গোটা মিলনায়তনে বিরাজ করছিল পিনপন নীরবতা। আবেগাপ্লুত হয়ে কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন।

লাকসামের বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির পারভেজের স্ত্রী শাহজান আক্তার বলেন, ‘২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকায় আসার পথে আমার স্বামীসহ তিনজনকে র‌্যাব ধরে নিয়ে যায়। এরপর একজনকে থানায় হস্তান্তর করলেও তাদের দুজনের কোনো খোঁজ এখনো পাইনি। র‌্যাব-পুলিশ সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি, কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। আমরা সন্তানরা জানে না কোথায় আছে ওর বাবা, কেমন আছে। আদৌ ওদের বাবা ফিরে আসবে কি না তাও জানে না। এই কষ্টের অনুভূতিগুলো মুখে বলা যাবে না।’

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কী অপরাধ ছিল আমার স্বামীর। বিএনপির রাজনীতি করা,মানুষের উপকার করাই তাদের দোষ ছিল? আর কত মায়ের অশ্রু গড়ালে আপনাদের রাজনীতির খেলা বন্ধ হবে। আপনি কি আমাদের কান্না শুনছেন। দয়া করে আপনি আপনার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। সন্তানদের কাছে বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’

তেজগাঁওয়ের ছাত্রদল নেতা আদনান চৌধুরীর বাবা রুহুল আমিন চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমি ভালোবাসি,  এখনো ভালোবাসি। যে কারণে তারা আমার বাসায় এসে আদনানের খোঁজ করায় আমি নিজে তাদের সামনে হাজির করি। আমার ছেলে সৎ ও নিরাপরাধ ছিল। ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল জিজ্ঞাসাবাদ করে আদনানকে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। কিন্তু আজও  ছেলের কোনো খোঁজ পাইনি। খোঁজ করতে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলেছে।’

রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমার ছেলে লেখাপড়ার পাশাপাশি সমাজের কল্যাণে কাজ করা শুরু করেছিল। কিন্তু সরকার তার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। সরকার কত নিষ্ঠুর।’

আদনানের বাবা আরও বলেন, ‘কষ্টের কারণে এখন আর আমি কারো কাছে যাই না। আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে আছি। সবাই দোয়া করবেন যেন আমি আমার ছেলেকে ফিরে পাই।’

সুত্রাপুরের নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা খালেদ হাসান সোহেলের ছোট্ট ছেলে আরিয়ান আল্লাহর কাছে তার বাবাকে ফিরিয়ে দেয়ার আকুতি জানায়। বলে, ‘আল্লাহ আমার আব্বুকে ফিরিয়ে দাও। আব্বুর সাথে ঘুরতে যাবো। বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজ পড়বো।’

আর রাজধানীর বংশালের গুম হওয়া ছাত্রদল নেতা চঞ্চলের পাঁচ বছরের ছেলে আহাদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তার বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানায়। বলে, ‘হাসিনা আন্টি আমি আড়াই বছর ধরে বলছি আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও। আমি বাবার সাথে স্কুলে যাবো।’

ছাত্রদল নেতা সেলিম রেজা পিন্টুর বোন মুন্নী তার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত পুলিশ, র‌্যাব সরকার কারো কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। মানবাধিকার কমিশনে গিয়েছি তারা বলছে কোনো ক্লু পাচ্ছে না। যদি প্রধানমন্ত্রী আমার ভাইকে লুকিয়ে রাখে তাহলে কিভাবে আপনারা ক্লু পাবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমার ভাইকে আমি এখনো পাইনি। তাই আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করি না। আমার মা ভাইয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছে। তাকে পিন্টু জীবিত আছে এমন মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে রাখছি। বাবাও অসুস্থ। তবে বাবা বলেন, আমার বিশ্বাস পিন্টু একদিন ফিরে আসবে।’

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নাজমুল ইসলামের স্ত্রী উপজেলা চেয়ারম্যান সাবেরা নাজমুল বলেন, ‘গুমের ১৫ দিন পর আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়। প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছি কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। বর্তমান সরকার বলছে তারা ডিজিটাল। যেদিন নিখোঁজ হয় ওইদিন রাতে তার মোবাইল নম্বর ট্রাকিং করলে আমার স্বামীকে জীবন দিতে হতো না।’

তিনি বলেন, ‘তিন সন্তানকে এতিম করে ওর বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। স্বজন হারানো যে কত কষ্টের তা বোঝানো যাবে না। কারণ আমি এখন প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছি সমাজের সঙ্গে, রাজনীতির সঙ্গে। আমাকে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দেয়া হয়। আমার উপজেলার চেয়ারটি কেড়ে নেয়ার জন্য নানা ষড়যন্ত্র চলছে।’  

গুম হওয়ার পরিবারের অন্য সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ধৈর্যহারা হবে না। বেগম খালেদা জিয়ার ওপর আস্থা রাখুন। ইনশাল্লাহ দেশে একদিন গণতন্ত্র ফিরে আসবে।’

আর/১২:১৪/৩১ আগষ্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে